
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ২৫তম দিনে শেষ হয়েছে। গত ১২মার্চ জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশ শুরু হয়।
বৃহস্পতিবার (৩০এপ্রিল) রাত ৯টায় মিনিটে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রথম অধিবেশন শেষ হয়। সংসদে অধিবেশনে বিকালের অংশে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সকালে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সমাপনী ভাষণে তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কিছুক্ষণের মধ্যেই সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতির ঘোষণা পাঠ করার পূর্বে আমি আপনাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় প্রথমেই আমি পরম করুণাময় আল্লাহ্র নিকট শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। সংসদ পরিচালনায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের এই সহযোগিতা আমাকে সংসদ পরিচালনায় অনুপ্রাণিত করেছে এবং তা অব্যহত থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এ মহান সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহনের সুযোগ পেয়েছি। তাই এই অধিবেশন ছিল বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করি। মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখি। আমাদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করি। আমরা সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছি যেখানে অংশগ্রহণকারী সকল মাননীয় সংসদ সদস্য সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, খ্যাতনামা মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাঁর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদানের প্রতি বৈশ্বিক মহলের এ স্বীকৃতি আমাদের গর্বিত করেছে।
"জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে তাঁর এ অনন্য অর্জনে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় তাঁর নেতৃত্ব অব্যাহত থাকবে—এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।"
স্পিকার আরো বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের প্রাঞ্জল আলোচনা সংসদীয় কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ করেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আপনারা মূল্যবান মতামত দিয়েছেন, যা সংসদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে।
তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ থেকে। এবারের অধিবেশনে মোট বৈঠক দিবস ছিল ২৫ টি। অধ্যাদেশ ছিল ১৩৩ টি, অধ্যাদেশগুলোর বিপরীতে বিল পাশ হয়েছে ৯১ টি। অদ্যকার ২ টি বিলসহ মোট ৯৪টি বিল পাশ হয়েছে। আইন প্রণয়ন কার্যাবলী ছাড়াও এ অধিবেশনে ৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে।
"কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধিতে ১৬ টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২ টির উপর আলোচনা হয়েছে। ৬৮ বিধিতে ৯ টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১ টি নোটিশের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশের উপর আলোচনা হয়েছে এবং ৭১ ক বিধিতে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে ২০৭ বার।"
তিনি বলেন, ১৬৪ বিধিতে ১৪ টি নোটিশের মধ্যে ১ টি গৃহীত হয়েছে এবং উহা বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে প্রেরিত হয়েছে। ২৬৬ বিধিতে ৩ টি নোটিশ পাওয়া যায় উহার পরিপ্রেক্ষিতে ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে।
এ অধিবেশনে মাননীয় সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য সর্বমোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২৫০৯ টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায়। উক্ত নোটিশগুলোর মধ্যে মাননীয় মন্ত্রীগণ মোট ১৭৭৮ টি প্রশ্নের উত্তর এ সংসদে প্রদান করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথমবার স্পীকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ পরিচালনায় সরকার ও বিরোধী দলের সকল সদস্যের সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এ সংসদে মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবার সংসদ-সদস্য হয়েছেন। এরপরেও আপনাদের গঠনমূলক আলোচনা ও সহনশীল আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াসহ সংসদীয় অন্যান্য কার্যক্রমে আপনাদের সহনশীল আচরণ ও গঠনমূলক আলোচনা অভিভূত করেছে জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদান এবং দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনার জন্য সংসদ নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন জানাই। বিরোধীদলকে কার্যকরভাবে নেতৃত্ব প্রদান এবং সংসদীয় কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকার জন্য মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা জনাব ডা. শফিকুর রহমানকে ধন্যবাদ জানাই।
"কৃতজ্ঞতা জানাই মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, চীফ হুইপ ও হুইপবৃন্দ এবং সকল সংসদ সদস্যদের প্রতি। একইভাবে, বিরোধীদলীয় মাননীয় চীফ হুইপ ও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতিও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার সহকর্মী মাননীয় ডেপুটি স্পীকার ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দ, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীবৃন্দকে। আরও ধন্যবাদ জানাই পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিবর্গকে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, বিভিন্ন সংবাদসংস্থা, বাংলাদেশ বেতার, সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলসহ দেশের সকল গণমাধ্যমের সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিবৃন্দকে ধন্যবাদ জানাই।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ সমাপনী বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের চেতনায় ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’—এই প্রতিপাদ্য এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—রাষ্ট্র পরিচালনার এই মূলনীতি সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ কার্যকর করা, এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে, খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে যা প্রশংসনীয়। এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। পাশাপাশি বিরোধীদল ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে গঠনমূলক আলোচনা এবং নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের দাবি উপস্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে তা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনেকরি।
এছাড়া, ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা এবং আইনের শাসন সুসংহত করাও আমাদের অঙ্গীকার।আমরা নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে কাজ করছি। একই সঙ্গে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। দেশ ও জাতির অব্যাহত সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে এবং আপনাদের প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন ও আন্তরিক শুভ কামনা জানিয়ে আমি প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করছি।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]