
বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে বেড়ে যাওয়া তিস্তা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলে কমেনি। দুর্ভোগে পড়েছে সেইসব নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দিরা।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুর ১২টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক শুন্য মিটার। যা বিপৎসীমার (স্বাভাবিক ৫২.১৫ মিটার) ১৫ সেন্টিমিটার নিচে।
তবে পানি কমতে শুরু করলেও নদী পাড়ের নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানির নিচে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। পানিবন্দি রয়েছে তিস্তা তীরবর্তী ১০ হাজার পরিবার।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা গোবর্ধন এলাকায় তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। এতে পাঠদানে বিঘ্নতা ঘটছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজানের পানির প্রবাহ কমে আসায় তিস্তার পানিও ধীরে ধীরে কমছে। ধীরে ধীরে নিম্নাঞ্চলের পানিবন্দিরাও মুক্তি পাচ্ছে। তবে সন্ধ্যার মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে বন্যা দুর্গত এলাকা। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নদী পাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এর আগে রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। রাতভর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নদীর তীড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং টানা বৃষ্টির কারণে চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
সোমবার সকাল ৬টায় তা বিপৎসীমার সমানে নেমে আসে এবং সকাল ৯টায় আরও কমে গিয়ে বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। এতে পরিস্থিতি আরও কিছুটা উন্নত হয়।
আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার আব্দুর রশিদ বলেন, সারা আইত নিন্দ হয় নাই ভাই। বিছানার নিচত পানি। ছাওয়া পোয়া নিয়ে বিছানায় বসে আইত কাটাইছি। দুপুর থেকে একটু কমতেছে পানি। হামার কষ্ট কায়ো দেখে না বাহে। সরকারি লোকরা আসি সড়ক থাকি দেখি চলি যায়।
একই এলাকার জোনাব আলী বলেন, পানি বাড়লে গবাদিপশু নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গবাদিপশু নিয়ে উঁচু সড়কে রাত কাটাইছি। গরুগুলোকে খাওয়াতেও পারছি না, চারদিকে পানি আর পানি।
ডাউয়াবাড়ী চর এলাকার কৃষক মনছুর আলী বলেন, "রাতে পানি বাড়তে দেখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে এসেছি। সকাল থেকে পানি কমেছে, তবে এখনো বাড়িতে ফিরিনি।"
তিস্তাপাড়ের লোকজন জানান, পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় তিস্তা পাড়ের অনেক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি উঠেছে। ফলে এসব বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে চরাঞ্চলের অনেক রাস্তা ঘাট। নৌকা আর ভেলা হয়েছে চরাঞ্চলের মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। বন্যা দুর্গতদের মাঝে বিশুদ্ধ পানি আর শুকনো খাবারের সংকট দেখা দিলেও প্রসাশনের তৎপরতা দেখা যায়নি তিস্তাপাড়ে। বিগত বন্যায় স্বাস্থ্যকর্মীরা অস্থায়ী ক্যাম্প করলেও চলতি বন্যায় তাদের দেখা যায়নি। ফলে বন্যাদুর্গত এলাকায় নানান রোগে আক্রান্তের শঙ্কা রয়েছে।
জেলার ৫টি উপজেলার তিস্তা তীর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। পানিতে তলিয়ে গেছে টিউবয়েল ও টয়লেট। এসব এলাকার শিশু বৃদ্ধ আর প্রতিবন্ধীরা পড়েছেন বড় বিপাকে। চারদিকে পানির কারণে বাড়ির নারীরা শৌচকাজে পড়েছেন চরম বিপাকে। পুরুষরা বাহিরে উঁচু এলাকায় যেতে পারলেও নারীরা পড়েন দুর্ভোগে।
এদিকে তিস্তার পানির চাপে কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কাইম রুদ্রেশ্বর- ইশোরকোল গ্রামীণ সড়কের একটি অংশ ধসে গেছে। এতে ওই এলাকার অন্তত তিন হাজার মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস বলেন, বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। তালিকা পেলে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়নি।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ২২০ মেট্রিক টন চাল নগদ সাড়ে ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিছু বিতরণর কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এসএম
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]