
রংপুরের তীব্র গরম যেন এ বছর আমের মৌসুমকে এগিয়ে দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙ্গা আম সংগ্রহ শুরু হলেও আবহাওয়ার কারণে ৫-৬ দিন আগেই বাগানে বাগানে শুরু হয়ে যায় আম পাড়া। এরই মধ্যে রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১২টি স্থানে বসেছে মৌসুমি আমের হাট। এসব হাটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও জমজমাট বাজারটি মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জে।
ভোরের আলো ফুটতেই পদাগঞ্জ বাজারে শুরু হয় আমের বেচাকেনা। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে কৃষক, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের ভিড়। ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান ও মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন বাগান থেকে আনা হচ্ছে হাঁড়িভাঙ্গা আম। স্থানীয়দের ভাষায়, পুরো এলাকা এখন যেন আমের উৎসবে মেতে উঠেছে।
বাজারে পাকা আমের চেয়ে কাঁচা বা আধাপাকা পরিপক্ব আমের চাহিদা বেশি। শুধু চাহিদাই নয়, কাঁচা আমের দামও পাকা আমের তুলনায় প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেশি। ফলে বাজারের বেশিরভাগ লেনদেন হচ্ছে কাঁচা আম ঘিরেই।
উত্তরাঞ্চলের আমের রাজত্বে এখন যেন একক আধিপত্য বিস্তার করেছে হাঁড়িভাঙ্গা। কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে দেশের বড় শহরের ফলের দোকান পর্যন্ত সর্বত্র এর চাহিদা। মৌসুমের শুরুতেই বাজারের এমন প্রাণচাঞ্চল্য দেখে আশাবাদী চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ফলের দোকান, অস্থায়ী হাট কিংবা পাইকারি বাজার সবখানেই এখন একচ্ছত্র আধিপত্য হাঁড়িভাঙ্গার। শুধু রংপুর অঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং প্রবাসীদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে এই আম। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি আম পাঠানো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে ২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে শুধু রংপুর জেলাতেই চাষ হয়েছে ১ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ রয়েছে মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলায়। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৮০০ টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১৫০ কোটিরও বেশি টাকা।
পদাগঞ্জ বাজারের আম ব্যবসায়ী হযরত আলী বলেন, “এখন প্রতিদিন এই বাজারে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টন আমের কেনাবেচা হচ্ছে। সোমবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজার শুরু হলেও গরমের কারণে কয়েকদিন আগেই আম উঠতে শুরু করে। প্রায় এক মাস এই বাজার জমজমাট থাকবে। এখান থেকে অনেক পাইকার আম কিনে দেশের বিভিন্ন জেলার খুচরা বাজারে সরবরাহ করছেন।”
একই বাজারের ব্যবসায়ী আহাদ আলী জানান, বাজারে আসা প্রায় ৮০ শতাংশ আমই কাঁচা বা পরিপক্ব অবস্থার। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা কাঁচা আম কিনতে বেশি আগ্রহী। কারণ কাঁচা আম কয়েকদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো সহজ হয়। তাই কাঁচা আমের দামও পাকা আমের চেয়ে বেশি। তবে বাজারে যে আম বিক্রি হচ্ছে, সবই পরিপক্ব।”
মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি আদার আলী জানান, গত আট বছর ধরে তিনি এক হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ করছেন। প্রতিবছর ১৪ থেকে ১৫ টন আম উৎপাদন হয় তার বাগানে। এ বছর ফলের আকার ভালো হওয়ায় তিনি প্রতি কেজি আম ৩০ থেকে ৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে পারছেন। কালবৈশাখীর কারণে কিছু ক্ষতি হয়েছে, তবে ফলের মান ভালো। হাঁড়িভাঙ্গা আম চাষ করেই আমরা স্বাবলম্বী হয়েছি।”
একই গ্রামের আরেক চাষি সুরুজ আলী জানান, এক সপ্তাহ আগেও তিনি প্রতি কেজি আম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে সেই দাম কমে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় নেমে এসেছে। বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যায়। এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। ঝড়ে ক্ষতি না হলে উৎপাদন আরও ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেশি হতে পারত। তবে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লালমনিরহাট থেকে পদাগঞ্জ বাজারে আসা ব্যবসায়ী আরসাদ হোসেন বলেন, তিনি প্রতিদিন চাষিদের কাছ থেকে আম কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন। পরিবহন ও অন্যান্য খরচসহ প্রতি কেজিতে তার খরচ পড়ছে ৩২ থেকে ৩৫ টাকা। পরে সেই আম খুচরা বাজারে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এখন ক্রেতারা মূলত হাঁড়িভাঙ্গা আমই খুঁজছেন। অন্য জাতের আমের চাহিদা তুলনামূলক কম। এই মৌসুমটাই আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।”
পদাগঞ্জ বাজারে আম কিনতে আসা রংপুরের কাপড় ব্যবসায়ী অতুল সেন ৪০০ কেজি হাঁড়িভাঙ্গা আম কিনেছেন। এর মধ্যে ৮০ কেজি নিজের পরিবারের জন্য রেখে বাকি ৩২০ কেজি ঢাকায় থাকা আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠিয়েছেন।
তিনি বলেন, “খোলা বাজারে যেখানে ৫০ টাকা কেজি, সেখানে এখানে ৩২ টাকায় পেয়েছি। স্বাদ ও দাম—দুই দিক থেকেই আমি সন্তুষ্ট।”
রংপুর নগরীর সাংবাদিক আশিকুর রহমান বলেন, “হাঁড়িভাঙ্গা আম দেখতে আকর্ষণীয়, খেতেও অত্যন্ত সুস্বাদু। এটি আঁশহীন, মাংসল এবং ওজনে ভারী। খোসা সহজে নষ্ট হয় না বলেই পরিবহনেও সুবিধা হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই হাঁড়িভাঙ্গা এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় আম।”
তিনি আরও জানান, পদাগঞ্জ বাজার থেকে তিনি ৯০ কেজি আম কিনেছেন। এর একটি অংশ পরিবারের জন্য রেখে বাকিটা আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাঠাবেন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “১৫ জুন থেকে হার্ভেস্টের নির্দেশনা থাকলেও তীব্র গরমের কারণে ৫-৬ দিন আগেই আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে।”
তিনি জানান, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী গ্রামেই হাঁড়িভাঙ্গা আমের উৎপত্তি। বর্তমানে এটি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার অন্তত ৮০টি গ্রামের মানুষ এই আম চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের শহর ও গ্রামের প্রায় সব বাজারেই হাঁড়িভাঙ্গা আমের বেচাকেনা হচ্ছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই আম কিনছেন। এ সময় উত্তরাঞ্চলের মানুষের আতিথেয়তার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে হাঁড়িভাঙ্গা আম।”
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]