
তীব্র গরমের মধ্যে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের জনজীবন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শিল্পও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। পর্যটক টানতে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিলেও কোনোভাবেই পর্যটকদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। অনেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই চেকআউট করে কক্সবাজার ছাড়ছেন।
পর্যটকদের অভিযোগ, ৮ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রুমে থাকা দায় হয়ে পড়ছে। রাতে ঘুমের মধ্যেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভ্রমণের আনন্দ পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে সৈকতপাড়ের একটি তারকামানের হোটেলে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ হয়ে যায় লিফট। আতঙ্কে পড়েন পর্যটকরা। বন্ধ হয়ে যায় বৈদ্যুতিক পাখা ও অন্যান্য সেবা। রুম থেকে বের হয়ে এসে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তর্কে জড়ান অনেকে। পরে জেনারেটর চালু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও কিছুক্ষণ পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকার মতিঝিল থেকে আসা পর্যটক সেলিম বলেন, আমরা এখানে একটু অবসর উপভোগ করতে আসি। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিং পুরো মুডটাই নষ্ট করে দেয়। ঢাকায় এমন সমস্যা হয় না। এখানে ব্যাকআপ থাকলেও সময়মতো চালু না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে।
সাভার থেকে আসা পর্যটক রিয়াজুল বলেন, একদিন ইনানীতে ছিলাম, ওখানে ভয়াবহ লোডশেডিং। পরে শহরে এসেও একই অবস্থা। ৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ ছিল না। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত কক্সবাজার ছাড়ছি।
বর্তমানে কক্সবাজারের বেশিরভাগ হোটেল-মোটেল প্রায় ফাঁকা। সৈকতেও পর্যটকের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। হোটেল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিসকাউন্ট দিয়েও পর্যটক ধরে রাখা যাচ্ছে না।
হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের ম্যানেজার আব্দুল হান্নান বলেন, ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট দেওয়ার পরও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক পর্যটক পরিকল্পনা পরিবর্তন করছেন। যারা দুই-তিন দিনের জন্য আসেন, তারা আগেভাগেই চেকআউট করে চলে যাচ্ছেন।
হোটেল প্রসাদ প্যারাডাইসের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা মেহেদী জানান, প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত তেল খরচ হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ লিটার তেল লাগে। এতে দৈনিক ১৪০ থেকে ১৫০ লিটারেরও বেশি জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে।
মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, সব হোটেলে জেনারেটর দিয়ে এসি পর্যন্ত চালানো সম্ভব নয়। একটি মাঝারি মানের হোটেলেও প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত ফুয়েল খরচ হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানির দাম ও সংকটের কারণে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবনেও। পর্যটক না থাকায় খালি পড়ে আছে ট্যুরিস্ট জিপ, অলস সময় পার করছেন ইজিবাইক চালকরা। বার্মিজ পণ্যের দোকান, ডাব বিক্রেতা, বালিয়াড়ির হকার—সবাই লোকসানের মুখে।
লাবনী পয়েন্টের ছাতা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. মোরশেদ বলেন, আগে দিনে ৫০-৬০ হাজার টাকার বিক্রি হতো, এখন তা নেমে প্রায় ১০ হাজার টাকায় এসেছে। সন্ধ্যায় মূল বিক্রি হলেও তখনই বিদ্যুৎ থাকে না।
শুধু পর্যটন এলাকা নয়, কক্সবাজার শহরসহ উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া সব উপজেলায় একই চিত্র। সাধারণ মানুষও পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
বার্মিজ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী সাজেদুল করিম বলেন, দিনের ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে দোকানের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্রেতারাও বিরক্ত হয়ে চলে যায়।
উখিয়ার ব্যবসায়ী মশিউর রহমান বলেন, আধা ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিদিন ১০ বারের বেশি বিদ্যুৎ চলে যায়। রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতেও পারছি না।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাঈমা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু প্রস্তুতি নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
একজন চিকিৎসক জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জরুরি চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অনলাইনভিত্তিক পেশায় যুক্ত ফ্রিল্যান্সার কায়সারুল হাসান বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ায় কাজ জমে যাচ্ছে। সময়মতো কাজ দিতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, এই লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিদিন কক্সবাজারের পর্যটন খাতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদা বেশি থাকায় সাময়িক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গণি বলেন, হোটেল-মোটেল জোনে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও আমরা গড়ে ৩০ থেকে ৪৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ পাচ্ছি। কখনও সর্বোচ্চ ৫০ মেগাওয়াটও পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আজকের চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৫০ মেগাওয়াট প্রয়োজন হলেও আমরা পাচ্ছি প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট। ফলে ১৫ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
জেলাজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় বলেও জানান তিনি। প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধান দ্রুত সমাধান না হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবনে আরও বড় সংকট তৈরি হবে। দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বিবার্তা/ফরহাদ/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]