
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ গলে নদীর পানিপ্রবাহ বেড়েছে এবং তা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রামের চিলমারীর বিশাল অংশের চারণভূমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেই জমিগুলো একসময় ঘাসে পরিপূর্ণ ছিল এবং গরু-মহিষ চড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হতো, তা এখন পানির নিচে বা নদীতে হারিয়ে গেছে। এছাড়াও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে পলিমাটির বদলে বালুর পুরু আস্তরণ পড়ছে। বালুময় মাটিতে স্বাভাবিক ঘাস বা গবাদিপশুর খাওয়ার উপযোগী লতাপাতা জন্মাতে পারে না। ফলে একসময়ের উর্বর চারণভূমি এখন ধু-ধু বালুচরে পরিণত হচ্ছে। এতে মহিষ পালনের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিবছর কমছে মহিষের সংখ্যা। যা স্থানীয় দুধ ও মাংস উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট চারণভূমি সংরক্ষণ ও সমন্বিত পশুপালন পরিকল্পনা নেওয়া হলে মহিষ পালন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে খামারিদের জন্য উন্নত জাত, টিকা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগে চিলমারীতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মহিষ থাকলেও গত তিন বছরে এর সংখ্যা প্রায় ২০–২৫ শতাংশ কমেছে। মহিষ কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দুধ ও মাংসের সরবরাহও হ্রাস পাচ্ছে।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একসময় আমার বাড়িতেই ৮০ থেকে ৯০টি মহিষ ছিল। এখন চারণভূমির অভাবে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচটিতে। শুধু আমার পরিবার নয়, পুরো এলাকার চিত্রই একই।
কড়াই বরিশাল গ্রামের মহিষ পালক জেল হক জোদ্দার বলেন, আগে চরের মাঠে মহিষ ছেড়ে দিলেই সারাদিন চরে খেত। এখন চারপাশে আবাদ, বেড়িবাঁধ আর বসতি, মহিষ রাখার জায়গাই নেই, তাছাড়া ভুট্টা চাষে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে ঘাস মেরে ফেলা হচ্ছে। বাজারের খাবার কিনে খাওয়াতে গেলে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান হয়। তাই অনেকেই মহিষ পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
চিলমারীর চরাঞ্চলের মহিষ পালক জমির আলী বলেন, নদীভাঙনে আমার সব জমিজমা বিলীন হয়ে গেছে। চাষাবাদ করার মতো এক টুকরো জমিও আর অবশিষ্ট নেই। তাই জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে চরে চরে ঘুরে মহিষ পালন করি। এই মহিষের ওপরই নির্ভর করে আমার সংসার, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, কাপড়-চোপড়, চিকিৎসা আর দৈনন্দিন খরচ। যখন বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়, তখন একটি মহিষ বিক্রি করেই সেই চাহিদা মেটাই। মহিষ না থাকলে আমাদের মতো চরবাসীর বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
চিলমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাগরিকা কার্জ্জী বলেন, মহিষের দুধ গরুর দুধের তুলনায় বেশি পুষ্টিকর এবং মহিষের মাংসে কোলেস্টেরল কম থাকায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। তবে চারণভূমি সংকট মহিষ পালনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট চারণভূমি সংরক্ষণ ও সমন্বিত পশুপালন পরিকল্পনা নেওয়া হলে মহিষ পালন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
জলবায়ু কর্মী ও নদী তথ্য বিশ্লেষক জাহানুর রহমান বলেন, চিলমারীর মতো নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, অনিয়মিত বন্যা ও বালুচর সৃষ্টির ফলে একসময়কার উর্বর চারণভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে মহিষসহ পশুপালন সংকটে পড়ছে, কমছে দুধ ও মাংস উৎপাদন, আর চরবাসীর আয় ও জীবনযাত্রা দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত অভিযোজন জরুরি। চরাঞ্চলে নির্দিষ্ট চারণভূমি সংরক্ষণ, নদীতীরবর্তী এলাকায় ঘাস ও পশুখাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো, বালুময় জমিতে সহনশীল ঘাস চাষ এবং সমবায়ভিত্তিক পশুপালন চালু করতে হবে। পাশাপাশি ভাসমান বা আধা-ভাসমান খামার, বিকল্প জীবিকামুখী কার্যক্রম এবং সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা গেলে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও পশুপালন ও গ্রামীণ অর্থনীতি টেকসই করা সম্ভব।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক চারণভূমি রক্ষা করা না গেলে শুধু চিলমারী নয়, পুরো জেলার মহিষ পালনই ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে চরভিত্তিক সমন্বিত পশুপালন মডেল চালুর চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে খামারিদের জন্য উন্নত জাত, টিকা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা জোরদার করা হচ্ছে। মহিষ পালনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। পরিকল্পিত চারণভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে মহিষ পালন আবার লাভজনক খাতে পরিণত হবে।
বিবার্তা/রাফি/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]