বিতর্কের ছায়া পেরিয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভোট দেখবে কি ত্রয়োদশ সংসদ
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৬
বিতর্কের ছায়া পেরিয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভোট দেখবে কি ত্রয়োদশ সংসদ
আবেদ হোসাইন
প্রিন্ট অ-অ+

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র তিনটি নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠেনি। বাকি সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে বিতর্ক, অনিয়ম, বর্জন কিংবা একতরফা ভোটের অভিযোগে কলঙ্কিত। ১৯৭৩ - ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন—বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস যেন বারবার ফিরে এসেছে আস্থার সংকটে। সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচন, দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা ভোট, আবার নির্দলীয় ব্যবস্থাতেও অবিশ্বাস্য ফল। সব মিলিয়ে ভোট মানেই অনিশ্চয়তা, প্রশ্ন আর সন্দেহ। এমন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কি পারবে বাংলাদেশের ভোটের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখতে।


২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। এবার জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের জন্য মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি হলো দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, যারা পৃথকভাবে বহুদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।


১৯৭৩: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন:
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি ছিল বিতর্কিত এবং পরবর্তী সময়ে এটি শেখ মুজিবুর রহমানের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনের একটি পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হয়।


মোট ১৪টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করে। দলটি মোট ভোটের ৭৩ শতাংশ পায় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে।


১৯৭৯: বহুদলীয় নির্বাচন
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়াউর রহমানের সরকার ১৯৭৩ সালের পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। এই নির্বাচনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অংশ নিয়ে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে।
তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন পায় এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে।


১৯৮৬ ও ১৯৮৮: বিতর্কিত নির্বাচন:
১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন এবং ওই বছরের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করেন, যেখানে বিএনপি ৬৫ শতাংশ ভোট পায়।
তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের মার্চে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। এভাবে এরশাদ চার বছর দেশ শাসনের পর ১৯৮৬ সালের মে মাসে নির্বাচন আয়োজন করেন।


১৯৮৮ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫৯টি আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনও ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ বলে অভিযোগ ওঠে। এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়।


১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করে। এই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়।


১৯৯৬: শেখ হাসিনার প্রথম বিজয়
মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। দেশব্যাপী হরতাল ও আন্দোলনের মুখে মাত্র ১২ দিনের মধ্যে বিএনপি সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।


১২ জুন ১৯৯৬ অনুষ্ঠিত পুনর্নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫ শতাংশ। নির্বাচন ব্যাপকভাবে অবাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে, বিএনপি পায় ১১৬টি আসন। শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।


২০০১: বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন:
২০০১ সালের ১লা অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ব্যাপক বিজয় অর্জন করে। দলটি ১৯৩টি আসন পায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পায় মাত্র ৬২টি আসন।


২০০৬: নির্বাচন সংকট ও ব্যর্থ ভোট
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র বিরোধ শুরু হয়।
বিএনপি এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার উদ্যোগ নিলে দাঙ্গা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন।


রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।


২০০৮: শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন
অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮০ শতাংশ—বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নির্বাচন ব্যাপকভাবে সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৩০টি আসন জিতে নেয়। বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি আসন।


২০১৪: বিরোধী বয়কট ও দমন-পীড়ন
২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে এসে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করতে সংবিধান সংশোধন করেন। বিএনপি ২০১১ সালের সংসদ অধিবেশন বয়কট করে। সংসদে সংবিধান সংশোধন আইন ২৯১–১ ভোটে সংশোধনী পাস হয়।


২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয় এবং বিরোধী নেতাদের ওপর ব্যাপক সহিংসতা চালানো হয়। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। ফলে আওয়ামী লীগ ২৩৪টি আসন জিতে আবার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচন দেশি-বিদেশি মহলে ব্যাপকভাবে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়।


২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবারের মতো ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
বিএনপি ও বিরোধীরা ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলে। জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের নেতাদের ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়।


২০২৪: শেখ হাসিনার পতনের প্রেক্ষাপট
৭ জানুয়ারি ২০২৪ নির্বাচন বিএনপি বয়কট করে এবং জামায়াত নিষিদ্ধ থাকায় শেখ হাসিনা পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতায় থাকেন।
পরবর্তীতে জুলাই মাসে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে সরকার পতনের আন্দোলনে মোড় নেয়। সরকারি দমন-পীড়নে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। অবশেষে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান নেন। ৮ আগস্ট ডা. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com