কূটনীতির গোলকধাঁধায় বাংলাদেশ
ইউনূসের রাজত্বে অভ্যন্তরীণ অরাজকতা
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২০
ইউনূসের রাজত্বে অভ্যন্তরীণ অরাজকতা
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় ২০২৫ সাল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য হয়ে ওঠে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। বিদায়ী বছরটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর অধ্যায়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্ন দেখিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। একদিকে বিশ্বমঞ্চে ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নজিরবিহীন অবনতি, এই দ্বন্দ্বেই কেটেছে বছরটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশজুড়ে মব সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বারংবার হামলা ও অগ্নিসংযোগ, সংবাদপত্রে হামলা ও সাংবাদিক নিপীড়নের মতো কলঙ্কজনক ঘটনা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের কূটনৈতিক মানচিত্র হয়ে উঠেছে ধূসর ও অনিশ্চিত।


ঢাকা-দিল্লির আস্থার অবনতি: ২০২৫ সালের কূটনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায় ছিল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি। বিগত দেড় দশকের তথাকথিত ‘সোনালি অধ্যায়’ বিদায়ী বছরে এসে রূপ নেয় নজিরবিহীন তিক্ততায়। পালটাপালটি কূটনৈতিক তলব এবং রেকর্ড ছয়বার হাইকমিশনার তলবের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা দিল্লি যাওয়ার পরই দুদেশের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। বিদায়ী বছরের শুরুতে বছরের শুরুতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে ঘিরে উত্তেজনার সূচনা হয়। এরপর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি ও ময়মনসিংহে শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। ভারতের শিলিগুড়ি ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশনে হামলা ও ভাঙচুরের জবাবে ঢাকা কঠোর অবস্থান নেয়। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যায় দুই দেশের ভিসা সেবা। সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক শুরু করে ভারত। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বছরের শেষ দিকে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। বিদায়ী বছরে ভারতের স্পষ্ট বার্তা, নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী নয়।


চীন-পাকিস্তানমুখী ঝোঁক : ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক যখন তলানিতে, তখন বাংলাদেশ ২০২৫ সাল জুড়েই চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখিয়েছে। গত মার্চে ড. ইউনূসের চীন সফর ছিল ভূ-রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বড় বিনিয়োগ না এলেও বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে বেইজিং ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। চীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সফরের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাববলয় জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
একই সঙ্গে দীর্ঘ দেড় দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও বরফ গলতে শুরু করে। এপ্রিলে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। তবে ভারতের সঙ্গে বৈরিতা রেখে চীনের উদ্যোগে ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ-চীন’ ত্রিদেশীয় জোটে সক্রিয়তার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


পশ্চিমা চাপ ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর: জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকার কূটনীতিতে একধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং শুল্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে ওঠে। পরে ২৫টি বোয়িং বিমান ও কৃষিপণ্য কেনার শর্তে কিছু শুল্ক ছাড় মিললেও সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করলেও বড় কোনো বিনিয়োগ বা জিএসপি সুবিধার অতিরিক্ত ছাড় দেয়নি।


মব সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত ইমেজ : ২০২৫ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে সবচেয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও মব সহিংসতায়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিশ্বমাধ্যমে বাংলাদেশের অসহিষ্ণু রাজনীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ এর নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রকাশ্যে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাগুলো জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ আন্তর্জাতিক মহলকে স্তম্ভিত করে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার ২০২৫ সালের এক স্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে। এসব কারণেই জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশনের ঢাকা দপ্তর খোলা নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়।


নিষিদ্ধ রাজনীতি ও সাংবিধানিক মোড় : এপ্রিলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দেশি-বিদেশি অঙ্গনে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হয়। পশ্চিমা বিশ্ব একে গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি বললেও জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রেক্ষাপটে অনেকে এটিকে অনিবার্য বলে দেখেছে। একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপিত হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।


রোহিঙ্গা প্রশ্নে স্থবিরতা ও সমন্বয়হীনতা : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ২০২৫ সাল ছিল কার্যত এক বন্ধ্যা বছর। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সংলাপ বা আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং রাখাইনে মানবিক করিডোর ইস্যুতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সরকারের কূটনৈতিক সমন্বয়হীনতাকেই প্রকাশ করেছে।


তালেবান সফরের ধোঁয়াশা : ২১ ডিসেম্বর আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মোল্লা নূর আহমদ নূরের গোপন ঢাকা সফর নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ-আফগানিস্তান চেম্বার অব কমার্স। তবে সফরটি সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নিরাপত্তা সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক তথ্য না থাকায় উদ্বেগ বেড়েছে।


বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের রক্তের অঙ্গীকার : বছরের শেষ প্রান্তে বিশ্বশান্তি রক্ষার ময়দান থেকেও আসে বেদনাদায়ক খবর। ১৩ ডিসেম্বর সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য। আহত হন আরও নয়জন। ২০ ডিসেম্বর মরদেহ দেশে আনা হলে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় জাতি জানায় শেষ শ্রদ্ধা। বিশ্ব শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া ফেললেও শান্তি ও মানবতার পক্ষে দেশের অঙ্গীকারকে নতুন করে তুলে ধরে।


সীমাবদ্ধতায় ম্লান অর্জন : বছরের শেষে জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের খসড়া চূড়ান্ত হওয়া ছিল বড় অর্জন। এটি বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পার্টনারশিপ অ্যান্ড কোঅপারেশন এগ্রিমেন্ট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে বড় বিনিয়োগ বা অতিরিক্ত জিএসপি সুবিধা মেলেনি। ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ থেকে ঋণ সহায়তা পাওয়া এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু করাকে সাফল্য ধরা হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা ও সাংবাদিক নিপীড়নের কাছে তা ম্লান হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু না হওয়াও কূটনৈতিক দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে।


সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরের কূটনৈতিক বার্তা একটাই, দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ছাড়া কেবল আন্তর্জাতিক ইমেজ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। এদিকে, ভারত নির্ভরতা কাটাতে গিয়ে নতুন শক্তির আজ্ঞাবহ হওয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। বছরের শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। বিদেশি প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের উপস্থিতি স্পষ্ট করে, বিশ্ব এখন বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত, স্থিতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপেক্ষায়। এই বাস্তবতায় সহিংসতা বন্ধ, ভারতের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং নির্ধারিত সময়ে জাতীয় নির্বাচন না হলে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com