ডিক্যাব টকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার
ঢাকা-লন্ডন সম্পর্কে নতুন মাত্রা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সময়সাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০১
ঢাকা-লন্ডন সম্পর্কে নতুন মাত্রা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সময়সাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এখন আর শুধু উন্নয়ন সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধীরে ধীরে কৌশলগত ও বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোও সহজ নয়। এর জন্য সময়সাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোতে হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক।


মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ‘ডিক্যাব টক’-এ তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস বক্তব্য রাখেন।


অনুষ্ঠানের শুরুতে মূল বক্তব্যে সারাহ কুক বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং মানুষে-মানুষে সংযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক এখন রাজনৈতিক সংলাপ, অর্থনৈতিক সংস্কার, জলবায়ু নেতৃত্ব, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে দ্বিপাক্ষিক ও বৈশ্বিক বিষয় আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।


অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। অর্থায়ন, ফ্যাশন, শিক্ষা ও জ্বালানি খাতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো কাজ করছে। ‘ডেভেলপিং কান্ট্রিস ট্রেডিং স্কিম’-এর আওতায় বাংলাদেশ এখন ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তিন বছরের রূপান্তর সময় শেষ হলেও তৈরি পোশাকসহ ৯২ শতাংশ পণ্য এই সুবিধার আওতায় থাকবে। ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে। একই সময়ে ইউকে এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এভিয়েশন খাতে ২ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ রেখেছে। অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদারে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে যুক্তরাজ্য।


প্রশ্নোত্তর পর্বে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সারাহ কুক বলেন, এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া, যা শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। গত দুই বছর ধরে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে বাংলাদেশি ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। লন্ডনে অনুষ্ঠেয় ‘ইলিসিট ফিন্যান্স সামিট’-এ বাংলাদেশকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই সামিটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


এক প্রশ্নের জবাবে জুলাই সনদ ও সংস্কারকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। বিতর্ক, আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উত্তম স্থান হচ্ছে সংসদ। এসব বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মন্তব্য করার বিষয় নয়। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সংস্কার উদ্যোগকে সমর্থন করে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে কাজ করে নির্বাচন প্রক্রিয়া, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেও তিনি জানান।


তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়। তবে বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় উঠে আসে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও। ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল ও খাদ্য নিরাপত্তায় বড় প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যার ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। যুক্তরাজ্য কূটনৈতিকভাবে এসব সংকট নিরসনে কাজ করছে।


রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্য ৪৫৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সহায়তা দিয়েছে এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাজ করছে।


জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বন্যার পূর্বাভাস উন্নয়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সুন্দরবনে সহনশীলতা বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে বলে জানান সারাহ কুক। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ হস্তান্তরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সামরিক নেতৃত্বের প্রশিক্ষণেও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।


ভবিষ্যৎ সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে সহযোগিতা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, সরকারি পর্যায়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক আধুনিকায়ন এবং পেশাদার সামরিক শিক্ষায় দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।


ঢাকাকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এয়ারবাস-বোয়িং প্রসঙ্গে সরাসরি মন্তব্য না করলেও বলেন, মিশ্র বহরের কৌশল বিমান খাতের জন্য উপকারী হতে পারে।


মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘মিডিয়া ফ্রিডম কোয়ালিশন’-এর গ্লোবাল কো-চেয়ার হিসেবে তারা কাজ করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।


অপর এক প্রশ্নের জবাবে সারাহ বলেন, বিগত শাসনামলের নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করতে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানায় যুক্তরাজ্য। তিনি জানান, ভিসা জালিয়াতি ও অবৈধ অভিবাসন রোধে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে তারা, যাতে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ হয়।


সারাহ কুক বলেন, বাংলাদেশ তার রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আর এই যাত্রায় যুক্তরাজ্য একটি নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com