
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোতাসিম বিল্লাহর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তাঁর স্থায়ী বহিষ্কার ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুর হোসেনের কাছে স্মারকলিপিটি জমা দেন তাঁরা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত ২২ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে কটাক্ষ করে একটি পোস্ট দেন। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ধর্ম অবমাননার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে অবিলম্বে বহিষ্কার, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর মোতাসিম বিল্লাহ তাঁর ফেসবুক পোস্টে মূর্তিপূজা ও সৃষ্টিকর্তার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পোস্টে তিনি প্রতিমা বিসর্জনের পর কাঠের ব্যবহার উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন, যাঁদের মানুষ সৃষ্টিকর্তা, জীবন-মৃত্যুর দাতা, রক্ষাকর্তা ও রিজিকদাতা মনে করে, তাঁদের তৈরি প্রতিমা কীভাবে সৃষ্টিকর্তা হতে পারে।
পোস্টে তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে বলেন, তাঁর সৃষ্টিকর্তা ও জীবন-মৃত্যুর দাতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। একই সঙ্গে পবিত্র কোরআনের সত্যতা নিয়েও মন্তব্য করেন।
পোস্টটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার পর তিনি সেটি সরিয়ে নেন এবং ক্ষমা চেয়ে আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, অমুসলিম ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমাদের দেশের সম্মানিত নাগরিক। আমরা আপনাদের অন্তর থেকে সম্মান করি।
তিনি আরও লেখেন, তাঁদের ধর্মকে অবমাননা করার উদ্দেশ্যে পোস্টটি দেননি। নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সজিব বিশ্বাস বলেন, “বিজয়া দশমীকে কেন্দ্র করে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে যে ধরনের কটাক্ষ ও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। গত বছরও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্থায়ী বহিষ্কারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এবার সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে প্রক্টর বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করার দাবি জানিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তু দাস বলেন, “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ, এ দেশ আমাদের সবার। কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্বেষমূলক বা অবমাননাকর মন্তব্য কখনোই কাম্য নয়। মোতাসিম বিল্লাহর ফেসবুক পোস্টে সনাতন ধর্ম সম্পর্কে করা মন্তব্যগুলো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমি মনে করি। যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মীয় অবমাননা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর সাহস না পায়।”
অভিযোগের বিষয়ে মোতাসিম বিল্লাহ বলেন, “আমি সরল মনে ফেসবুকে পোস্টটি দিয়েছিলাম। যখনই বুঝতে পেরেছি, অমুসলিম ভাই ও বোনেরা কষ্ট পেয়েছেন, তখনই পোস্টটি ডিলিট করে ক্ষমা চেয়ে দুটি পোস্ট করেছি। আমি আসলে বিষয়টি নিয়ে অনুতপ্ত। আজকে স্মারকলিপি দেওয়ার কথাটা শুনে খারাপ লাগল। আমি ক্ষমা চাওয়ার পরও তাঁরা কেন ক্ষমা করছেন না, বুঝতে পারছি না।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুর হোসেন বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টটি ডিলিট করিয়েছি। প্রক্টর স্যারের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”
বিবার্তা/প্রসেনজিত/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]