জিএম কাদেরের ওভারট্রাম চুন্নু, সিনিয়দের মুখে কুলুপ
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৫০
জিএম কাদেরের ওভারট্রাম চুন্নু, সিনিয়দের মুখে কুলুপ
জাহিদ বিপ্লব
প্রিন্ট অ-অ+

জাতীয় পার্টির মহাসচিব কে হবেন নিয়ে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব করায় আপাতত স্বস্তিতে আছে দলটি। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মারা যাওয়ার পর থেকেই কে দলটির মহাসচিব হবেন তা নিয়ে চলছিলো অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ। বাবলু'র মৃত্যুতে ঘোষিত তিন দিনের শোক শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদ নিয়ে শুরু হয় টানাহ্যাঁচড়া।


দলে অপেক্ষাকৃত এক তরুণ নেতাকে পার্টি মহাসচিব করা হবে এ সংবাদে জাপার বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্য বিরোধিতায় তরুণ নেতা শামীম হায়দারকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও পরিস্থিতি মোকাবেলায় জিএম কাদের ওভারট্রাম করে মজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব পদে নিয়োগ দেয়। এতে পার্টি সিনিয়র নেতাদের মুখে কুলুপ দেয়ার সামিল বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। পার্টির চেয়ারম্যানের কৌশলী খেলায় কপোকাত দলটির সিনিয়র নেতারা আর স্বস্তিতে জাতীয় পার্টি নেতাকর্মীরা।


মহাসচিব নিয়োগকে কেন্দ্র করে ফুসে ওঠেছিলেন দলটির সিনিয়র নেতারা। সৃষ্ট বিভেদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মহাসচিব পদে দলের কো-চেয়ারম্যান ও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুকে বেছে নেয়ায় পরিবেশ এখন স্বাভাবিক।


জানা যায়, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মসিউর রহমান রাঙ্গা, মজিবুল হক চুন্নু, অতিরিক্ত মহাসচিব সাহিদুর রহমান টেপা ও শামীম হায়দার পাটোয়ারী মহাসচিব হওয়ার নামের তালিকায় ছিলেন।


শুরুতে চুন্নু মহাসচিব পদে জোরালো প্রার্থী না থাকলেও সিনিয়র নেতাদের একাট্টা ও জিএম কাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারাসহ চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি বলয় তৈরীতে যারা ভূমিকা রেখেছিলো তাদের মধ্যে কেউ কেউ দলটির মহাসচিব হতে দৌড়-ঝাপ করেছিলেন। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশের জন্য যারা দায়ী তাদেরকে দল বা নিজের জন্য বিশ্বস্ত মনে করেননি জিএম কাদের। তাই মহাসচিব পদে দলে আরো সিনিয়র ও অভিজ্ঞ নেতা থাকা সত্বেও আসতে পারেননি এই পদে।


করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু গত ২ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করলে জাপার মহাসচিব পদটি শূন্য হয়। তার মৃত্যুর শোকের মধ্যেই নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় দলটিতে। তৎপর হয়ে ওঠেন মহাসচিব হতে আগ্রহীরা। এরমধ্যেই খবর রটে যায় দলের তরুণ এমপি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জিএম কাদের। এমন খবরে ঊষ্মা প্রকাশ করেন দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা।


দলের কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদের কলাবাগানের অফিসে গত ৪ অক্টোবর বিকালে দীর্ঘ বৈঠক করেন ওই জ্যেষ্ঠ নেতারা। বৈঠকে ফিরোজ রশীদ ছাড়াও দলের আরো তিনজন কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ও মুজিবুল হক চুন্নু, প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব সাহিদুর রহমান টেপা, প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের জাপার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আলম রুবেল উপস্থিত ছিলেন।


সূত্র জানায়, বৈঠকে মহাসচিব নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে জিএম কাদেরের কড়া সমালোচনা করা হয়। কেউ কেউ অতি উৎসাহী হয়ে গণমাধ্যমে ফোন করে চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। পরেরদিন তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এতে ক্ষুদ্ধ হোন জিএম কাদের। এসকল নেতারা আলাদা বৈঠক না করে পার্টির চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠক করলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো বলে মনে করেন পার্টির নেতাকর্মীরা।


গণমাধ্যমে সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যের জবাবে জিএম কাদেরও সরাসরি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন, নিয়মের বাইরে অথবা দলের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলে ক্ষমা নয়, প্রয়োজনে বের করে দেয়া হবে। জিএম কাদেরের এহেন কড়া জবাবে হঠাৎ করেই ইউটার্ণ করতে শুরু করেন পার্টির সিনিয়র নেতারা। ৫ অক্টোবর রাতেই জিএম কাদেরের উত্তরা বাসভবনে যান মসিউর রহমান রাঙ্গা। গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে ফোন দিয়ে নিজের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে থাকেন সিনিয়র নেতারা। অবস্থা বেগতিক দেখে নিজে মহাসচিব প্রার্থী নয় বলেও কেউ কেউ জানান জিএম কাদেরকে।


জাপার বনানী কার্যালয় থেকে জানা যায়, ৬ অক্টোবর জাতীয় পার্টি বনানী কার্যালয়ে চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সাথে দেখা করতে আসেন কো-চেয়ারম্যান মজিবুল হক চুন্নু। তিনি চেয়ারম্যানকে সরাসরি জানান, আমি মহাসচিব পদপ্রার্থী। জবাবে জিএম কাদের বলেন- আপনি মহাসচিব প্রার্থী তা আমি জানতাম না। আপনারা কে কে মহাসচিব পদে আসতে চান, তা আমাকে সরাসরি জানালে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।


পরে বিষয়টি নিয়ে পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ বিশস্ত কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করেন জিএম কাদের। অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অভিজ্ঞতার আলোকে ৬ অক্টোবরই মজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন জিএম কাদের। ৮ অক্টোবর জিয়াউদ্দীন বাবলু'র স্মরণ সভা শেষে ৯ অক্টোবর চুন্নুকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদে নিয়োগ দেয়া হয়।


১০ অক্টোবর জাপার বনানী কার্যালয়ে নবনিযুক্ত মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নুকে নেতাকর্মীরা তাৎক্ষণিক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা, লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, রেজাউল ইসলাম ভূইয়া, এটিইউ তাজ রহমান উপস্থিত থাকলেও আসেননি দলটির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। এরমধ্যে সাহিদুর রহমান টেপা, লিয়াকত হোসেন খোকা ও রেজাউল ইসলাম ভূইয়াও মহাসচিব হতে আগ্রহী ছিলেন। পরে চুন্নু নিজে সিনিয়র নেতাদের ফোন দিয়ে দল গোছাতে সাহায্য চাইলে আস্তে আস্তে সিনিয়র নেতাদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে।


১১ অক্টোবর জাতীয় পার্টির কাকরাইল কার্যালয়ে নবনিযুক্ত মহাসচিবকে সম্বর্ধনা দেন আরেক মহাসচিব প্রার্থী ও জাপার কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি। ১২ অক্টোবর বনানীতে চুন্নুকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান দলটির ১৬ বছর মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা বর্তমান কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার।


জাপা ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও দলটির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি বিবার্তাকে জানান, চুন্নু সাহেব মহাসচিব হওয়ায় আমরা সকলেই খুশী। তার ক্লিন ইমেজ এবং সততা সম্পর্কে দেশবাসী অবগত। জাতীয় চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নু'র দিকনির্দেশনায় আমরা দলকে তৃণমূলে আরো সুসংগঠিত করতে পারবো।


বাবলা বলেন, রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবেই। আমি মনে করি এবং বিশ্বাস করি তিনি মহাসচিব নিযুক্ত হওয়ায় সারাদেশে নেতাকর্মীরা খুশী এবং উজ্জীবিত।


নতুন মহাসচিব সম্পর্কে সাবেক মন্ত্রী ও জাপার কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বিবার্তাকে বলেন, মজিবুল হক আমার রণাঙ্গনের সাথী। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, দুইবার পাঁচশ থেকে ১ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তার মতো একজন পরিক্ষিত বন্ধুর কাছে জাতীয় পার্টি ও নেতাকর্মীরা নিরাপদে থাকবে এবং তৃণমূল আরো শক্তিশালী হবে।


জাপার নবনিযুক্ত মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নু প্রসঙ্গে দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বিবার্তাকে বলেন, মজিবুল হক চুন্নু জাতীয় পার্টির সূচনালগ্ন থেকেই এ দলটির সাথে জড়িত। তিনি একজন অভিজ্ঞসম্পন্ন লোক। ভালো বক্তা। সংসদেও ভালো বলেন। ৫ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।


জিএম কাদের বলেন, আমি বিশ্বাস করি চুন্নু সাহেব তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাছাড়া মজিবুল হক চুন্নু'র ক্লিন ইমেজ রয়েছে। কর্মীদের কাছেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আশা করি, সকলের সহযোগিতা ও প্রচেষ্টায় জাতীয় পার্টিকে আরো শক্তিশালী করতে পারবো।


বিবার্তা/বিপ্লব/গমেজ/শাহিন/এমও

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com