'গ্লাস বয়' রাসেলদের করুণ কাহিনী (পর্ব-১)
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২১, ১০:২৫
'গ্লাস বয়' রাসেলদের করুণ কাহিনী (পর্ব-১)
নাঈম কামাল
প্রিন্ট অ-অ+

শাহবাগে রাস্তার পাশে বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) রাতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে প্লাস্টিকের বস্তা বিছিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো মো. রাসেল হোসেন। রাসেলের বয়স ১৪ বছর। বাড়ি কুমিল্লার লাকসামে। ৬ বছর বয়স থেকেই সে ঢাকায় থাকে। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। কোথায় থাকে তাও জানে না সে। মায়ের কথা বলতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় রাসেল। চোখ দিয়ে তখন অনবরত পানি ঝরছিলো তার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখের পানি আটকানোরে ব্যার্থ চেষ্টা করছিলো বার বার। কিন্তু চাইলেও চোখের পানি আটকে রাখতে পারেনি।


নিজেকে কোনরকম সামলে নিয়ে রাসেল বলে, আমার এক বড় বোন আছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সেও আর আমার খোঁজ রাখে না। কোথায় থাকে তাও জানি না। আমার এক খালা থাকেন মিরপুরে। একবার গিয়েছিলাম সেখানে, কিন্তু তারা আমাকে থাকার জায়গা দেয়নি। তাই আর যাইনি সেখানে। একবার আমার এলাকার একজনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে দাদা বাড়ি পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমার দাদা আমাকে বলে যার বাবা-মা কেউ নেই তার আবার দাদা বাড়ি কিসের? পরে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়, আমি আবার চলে আসি ঢাকায়।


এখন রাস্তায় রাস্তায় টোকাইয়ের কাজ করি। যা পাই তা বিক্রি করে কিছু খাওয়ার চেষ্টা করি। আজ সকালে হোটেল থেকে নুডলস কিনে খেয়েছি, দুপুরে কিছু খেতে পারিনি। দুদিন ধরে জ্বর, শরীর খারাপ থাকায় কাজেও বের হতে পারিনি। রাতে দোকান-পাট বন্ধ হয়ে গেলে টোকাইয়ের কাজে বের হবো। কিভাবে চলে জানতে চাইলে সে জানায়, যা পাই বিক্রি করে যে টাকা পাবো তা দিয়ে কিছু কিনে খাবো, না হলে খালি পেটেই থাকতে হবে আজ রাতে। সে বলে, আমগো অভ্যেস হয়ে গেছে। কতদিন না খাইয়া পইরা থাকি। খাওন চাইলে কেউ দেয় না, মারে।


টোকাইয়ের কাজ না করে অন্যকোন কাজ কেন করছে না জানতে চাইলে রাসেল বলে, লকডাউনের আগে একটি হোটেলে ‌‌'গ্লাস বয়'র কাজ করতাম। কিন্তু লকডাউনের কারণে হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কোন কাজ খুঁজে পাইনি। ভেবেছিলাম রিকশা চালাবো কিন্তু আমার তো বয়স কম। রিকশা চালালে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে তাই রিকশাও চালাতে পারি না। পেট চালাতে এখন টোকাইয়ের কাজ করি। রাতের বেলায় কখনো মন্ত্রীপাড়ায়, কখনো রমনা পার্কে ঘুমাই। যখন বৃষ্টি হয় তখন আর ঘুমাতে পারি না। সারারাত জেগে থাকতে হয়।



এদিকে কাঠালবাগান এলাকায় মায়ের সাথে কংক্রিটের কাজে সহায়তা করছিলো ৬ বছর বয়সী পথশিশু ইসমাইল হোসেন। সাথে ছিলো সমবয়সী আরো এক শিশু। দুজনের পরনেই ছিলো ময়লাযুক্ত হাফ প্যান্ট ও টি-শার্ট। বিকেল পাঁচটার দিকে কথা হয় ছোট্ট ইসমাইলের সাথে। সে জানায়, সকালে সে একটা পরটা খেয়েছে। দুপুরে কিছুই খেতে পারেনি। মায়ের কাজ শেষ হলে যে টাকা পাবে তা দিয়ে রাতের খাবার খাবে তারা।


বাবা কোথায় জানতে চাইলে মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর জানায়, তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছে। বাবার কথা তার মনে নেই। বাবার মৃত্যুর পর কাজ করে মা তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। মায়ের কষ্টের কারণে বড় ভাই ৭ বছর বয়সী ইউনূসের সাথে সেও মাকে সহযোগিতা করে। পাশেই খেলাধূলা করছিলো, আরিফ, আপন, শরিফ, মোজাম্মেলসহ কয়েকজন পথশিশু। তাদের কারো বাবা নেই, কারো মা নেই, কারো বা আবার বাবা-মা কেউই নেই।



অন্যদিকে ঢাবির টিএসসি এলাকায় কথা হয় ৯ বছর বয়সী নূরজাহানের সাথে। অসুস্থ বাবা থাকেন চাঁদপুরে। মা ও নানির সাথে সে থাকে কামরাঙ্গির চরে। সেখান থেকে প্রতিদিন নানীর সাথে পায়ে হেঁটে আসে টিএসসিতে। নানী বিক্রি করে চা-পান। ছোট্ট এই শিশুর হাতে কয়েকটি পানির বোতল। এগুলোই হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে সে। সেখান থেকে যা আয় হয় সবগুলোই নানীর হাতে দিয়ে দেয়। কেন তুমি পানি বিক্রি করছো জানতে চাইলে সে জানায়, আমার ছোট ভাই অসুস্থ। মা তাকে দেখাশুনা করছে। তিনিও চা বিক্রি করতেন কিন্তু ভাইয়ের অসুখের কারণে আসতে পারছেন না। তাই আমি পানি বিক্রি করছি।


এছাড়া টিএসসি এলাকায় কথা হয়, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নূসরাত জাহানের সাথে। এক হাতে চায়ের ফ্লাক্স অন্য হাতে পানি নিয়ে এখান থেকে ওখানে চুটাছুটি করছিলো ১২ বছর বয়সী এ শিশু। কাছে এসেই বললো ভাইয়া চা খাবেন, একটা পানি দিবো? চা পান করতে করতে কথা হয় তার সাথে। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে সে। দু'বছর ধরে এখানে চা আর পানি বিক্রি করছে। মা বিক্রি করে চা-পান। ৮ বছর বয়সী ছোট ভাই বাঁধন বিক্রি করে চা আর ৪ বছর বয়সী ছোট বোন উর্মি ছোট ভাইয়ের সাথে হেঁটে হেটে চকলেট বিক্রি করে। লকডাউনের আগে বিকিকিনি ভালো হলেও এখন তেমন একটা হয় না। এখানে আগের মতো আর মানুষ আসে না, তাই তাদের বিকিকিনিও তেমন একটা নেই। তারপরেও চা-পানি বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনরকম সংসার চলে তাদের।



বাংলাদেশ পথশিশুদের নিয়ে কর্মরত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক-স্ক্যান'র সভাপতি জাহাঙ্গীর নাকির জানা, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। যাদের মধ্যে রাজধানীতেই রয়েছে সাড়ে চার লাখ।


তিনি বলেন, এটা অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যানের তথ্য। সঠিক পরিসংখ্যান এখন সময়ের দাবি। তবে তার আগে পথশিশুর সজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। পথশিশুর প্রকৃত সজ্ঞা অনুযায়ী জরিপ করলে এ সংখ্যার পরিবর্তন হতে পারে।


জাহাঙ্গীর নাকি বলেন, মহামারির মধ্যে গত মার্চে রাজধানীর মহাখালী, এয়ারপোর্ট, কমলাপুর, গাবতলী, সদরঘাটসহ আটটি এলাকায় পথশিশুদের জীবনমান নিয়ে ২৬-৩১ মার্চ পর্যন্ত একটি জরিপ চালায় স্ক্যান। জরিপে আমরা পথশিশুদের স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে ভয়াল এক অবস্থা দেখতে পাই। ওরা করোনাভাইরাস কী সেটা জানেই না। ওরা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। ওরা করোনাভাইরাসের ক্যারিয়ার হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।


পথশিশুদের নিয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাণিজ্য হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথশিশুদের জন্য বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে আসা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ হচ্ছে। পথশিশুদের জন্য সামান্য কাজও করছে না তারা। পথশিশুদের টাকায় তারা দামি গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ায় আর যাদের জন্য বিদেশ থেকে টাকা আসছে তারা দিন পার করছে অর্ধহারে-অনাহারে। করোনাকালে এই সকল শিশুদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। করোনার আগে তারা বিভিন্ন ভাঙারি সংগ্রহ করে বিক্রি করে পেট চালাতো। করোনার কারণে সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাদের জীবন হয়ে উঠেছে আরো কঠিন। কিন্তু তাদেরকে নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই।


বেসরকারি সংস্থাগুলোও তাদের নাম করে যাকাত-ফেৎরাসহ দান-অনুদান সংগ্রহ করে তা আত্মসাৎ করছে। এই সংস্থাগুলোকে মনিটরিং করার জন্য কোন সেক্টর নেই। ফলে যে যেভাবে পারছে পথশিশুদের নিয়ে খেলছে। আমরা বার বার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি, এখনো জানাচ্ছি সরকারি-বেসরকারি পথশিশুর পুনর্বাসনের জন্য ক্রস সেক্টর বডি দরকার। যার মাধ্যমে কার্যক্রমগুলো সঠিকভাবে পালন হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করা হবে। শুধু তাই নয় এনজিও ব্যুরোর শক্ত তদারকির পাশাপাশি শিশু অধিদফতর বাস্তবায়ন এবং পথশিশুদের জন্য পৃথক ডেস্ক থাকা আবশ্যক।


উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে সমাজসেবা অধিদফতরের এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের শতকরা ৪১ ভাগ পথশিশুর ঘুমানোর বিছানা নেই, প্রতিদিন গোসল করতে পারে না ৪০ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে, ৮৪ শতাংশ শিশুর শীতবস্ত্র নেই, ৫৪ শতাংশ শিশুর অসুস্থতায় দেখার কেউ নেই, ৭৫ শতাংশ পথশিশু অসুস্থতায় ডাক্তার দেখাতে পারে না।


শিশুদের মাদকাসক্তির চিত্রও ভয়াবহ। শিশু অধিকার ফোরামের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৮৫ ভাগ পথশিশু মাদকাসক্ত। তাদের ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ শিশু ধূমপান, ২৮ শতাংশ নানা ট্যাবলেট, ৮ শতাংশ শিশু ইনজেকশনে আসক্ত।


৮০ শতাংশ শিশু কাজ করে জীবন টিকিয়ে রাখতে; ২০ শতাংশ শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়, ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু সার্বিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।


এদিকে, ২০২০ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রমের উদ্যোগে একটি অনলাইন সভায় কিছু সুপারিশ আসে। অনলাইন সভার সুপারিশগুলো হলো-


১. করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় শিশুদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।


২. ২০২০ সালের ২৬ মার্চ লকডাউন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যেসব সেন্টার বা আবাসনে অবস্থানকারী শিশুদের অতিরিক্ত নতুন শিশু না নেয়ায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।


৩. বেসরকারি উদ্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে পথশিশুদের সামরিক অবস্থান ও খাদ্য সরবরাহের যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তা ক্রমান্বয়ে নিয়মিত প্রোগ্রামের রূপান্তরের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।


৪. সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পথশিশুদের সহায়তায় যেসব উত্তম চর্চা তাদের সুরক্ষা ও উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তা অন্যদের সাথে বিনিময় করতে হবে।


৫. ঢাকা শহরের পথশিশুদের বর্তমান বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা অর্জনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।


৬. কোভিড-১৯, নদী ভাঙ্গন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ভালনারেবিলিটি শনাক্তকরণের লক্ষ্যে একটি ব্যাপক জরিপ সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।


৭. সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এবং চলমান কর্মসূচির আলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গঠন করা জরুরি।


৮. পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় শিশুদের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয়।


৯. পথশিশু সুবিধাবঞ্চিত এবং অসহায় শিশু যাতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ, শারীরিক, যৌন, মাদক, হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে সকলে সতর্ক দৃষ্টি রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।


১০. পথে অবস্থানকারী শিশুরা যাতে তাদের পিতামাতা অভিভাবক বা পরিবারের ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।


বিবার্তা/বিআর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com