বাণিজ্যিকভাবে বনসাই সৃষ্টি করতে চায় উৎপল
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ১৫:৩২
বাণিজ্যিকভাবে বনসাই সৃষ্টি করতে চায় উৎপল
তৌফিক ওরিন
প্রিন্ট অ-অ+

বোরহান উদ্দিন উৎপল একজন বনসাইপ্রেমী মানুষ। যিনি নিতান্তই ভালোলাগা থেকে নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন একটি বনসাইযের বাগান। আর এই বাগানের সুবাদে পরিচিতি পেয়েছেন দেশব্যাপী।


সম্প্রতি বিবার্তা২৪ডটনেটের প্রতিবেদকের সাথে দীর্ঘ আলাপে বেরিয়ে আসে তাঁর জীবনের নানা ঘটনা। সেই গল্প জানাচ্ছেন তৌফিক ওরিন।


সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চৌরঙ্গি মোড় এলাকার বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন উৎপল। তার জন্ম গাছগাছালিঘেরা চৌরঙ্গির দাদা বাড়িতেই। ছোট বেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। ফলে তখন থেকেই গাছপালার প্রতি তার সীমাহীন আকর্ষণ। সেই আকর্ষণই পরবর্তী সময়ে শখে পরিণত হয়।


উৎপলের সাথে কথা বলতে গিয়ে তার সম্পর্কে অনেক বিষয় জানা যায়। পশু-পাখির প্রতিও রয়েছে উৎপলের গভীর অনুরাগ। অন্যান্য শখের মধ্যে রয়েছে ফটোগ্রাফি ও বাইক রাইডিং। একই সাথে এলাকায় ক্রীড়ামোদী হিসেবে পরিচিত। মাঝে মাঝে তিনি ফুটবল ম্যাচের রেফারির দায়িত্বও পালন করে থাকেন।



বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী উৎপল পড়ছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে। পরিবারে রয়েছেন বাবা, মা, বড় ভাই ও ভাবী। বাড়িতে সবার ছোট হওয়ায় উৎপল সকলের আদরের।


সবার আদরের সুযোগ নিয়ে উৎপল নিজ বসতবাড়ির ছাদে গড়ে তুলেছেন বিশাল বনসাই বাগান। বর্তমানে তার এ বাগানে স্থান পাচ্ছে প্রায় ৬০ প্রজাতির বনসাই।


উৎপলের বনসাই বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির বনসাইয়ের মধ্যে রয়েছে নানা প্রকারের বট। এছাড়া আছে পাকুড়, বকুল, তেঁতুল, নিম, হিজল, তমাল, সফেদা, লেবু, বেল, কদবেল, কুজ, ডালিম, গাব, ডুমুর, শ্বেতচন্দন, বাবলা, শ্যাওড়া, জারুল, কামিনী, ছাতিম, কৃষ্ণচূড়া, শিমুল, চটকা, দেবদারুসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বনসাই। আরও রয়েছে সুন্দরবনের গেওয়া, সুন্দরী, পশুর, কেওড়া প্রভৃতি গাছের বনসাই। তার রয়েছে পারিজা নামের এক অদ্ভুত বনসাই গাছ, যার উপর ও নিচের অংশের পাতার রং একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর সবুজ ও বাদামী রংয়ে পরিবর্তিত হয়।


২০০১ সালের কৃষিমেলায় একটি ইভেন্টে প্রথম পুরস্কার পেয়ে গাছ লাগানোর প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে তার এক দাদার কাছ থেকে বনসাই গাছ দেখে তা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেন উৎপল। এর পর শুরু হয় তার বনসাইয়ের চারা সংগ্রহের কাজ এবং একই সাথে বনসাই সৃষ্টির প্রচেষ্টা।



সাতক্ষীরার পুরাতন স্টেডিয়াম থেকে উৎপল সর্বপ্রথম বনসাই সংগ্রহ করেন। তারপর থেকে নিজ উদ্যোগে এলাকার পুরাতন বিল্ডিংয়ের ছাদ ও দেয়াল থেকে প্রথমে বট ও পাকুড় গাছের চারা সংগ্রহ করে শুরু করেন বনসাই তৈরির কাজ। এরপর ধীরে ধীরে নানা প্রজাতির গাছের বনসাইয়ের সমাহার ঘটতে থাকে তার বাগানে।


উৎপল জানান, হিজল, তমাল, শ্বেতচন্দন, জারুল, বকুলসহ অনেক প্রজাতির গাছ বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে, যে কারণে এ সব গাছের বনসাই তৈরি করে সেগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছি।


এছাড়া গাছের প্রতি তার একটি আলাদা ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করে।


তিনি জানান, যে সব গাছের বাকল মোটা ও দীর্ঘদিন বাঁচে এসব প্রজাতির গাছই বনসাই তৈরির উপযোগী। বনসাই তৈরির জন্য ১ কেজি মোটা বালি, ১ কেজি মাটি ও ২ কেজি গোবর সার মিশিয়ে একটি টবে বা মাটির পাত্রে ভরতে হয়। এরপর পরিমাণমতো খৈলের পানি দিতে হয়। এ জন্য প্রতি মাসে উৎপলের গড়ে খরচ হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।



উৎপল জানান, তার দিনের একটা বড় অংশই কাটে বনসাই তৈরি ও পরিচর্চার কাজে। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি এ কাজে তিনি মানসিক তৃপ্তি পেয়ে থাকেন। তবে জেলা শহর সাতক্ষীরায় বনসাইয়ের চাহিদা না থাকলেও ঢাকাসহ বড় বড় শহরে বনসাইয়ের ব্যাপক বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। অনেকেই মোটা অংকের টাকা দিয়ে বাসা-বাড়ি ও অফিসের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বনসাই সংগ্রহ করে থাকেন।


তিনি জানান, বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বনসাইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হননি। বরং নিতান্তই ভাল লাগা এবং হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ধরে রাখার জন্য এ কাজ করে যাচ্ছেন। তবে তিনি স্বপ্ন দেখেন, একটি সফল প্রদর্শনীর মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে।


ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বনসাই সৃষ্টির কথাও জানান উৎপল। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এখনো আমি সফল হইনি। তবে সফল হওয়ার প্রবল ইচ্ছা আমার আছে। আমি আমার সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি। এ কাজে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে অনুপ্রাণিত করে আমার পরিবার।’



তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমি প্রায় ৬০ প্রজাতির বনসাই উৎপাদন করেছি এবং দেশের বাইরে থেকে কয়েক প্রজাতির বনসাই সংগ্রহ করেছি।’


দেশের বাইরে থেকে কি ধরনের গাছ এনেছেন জানতে চাইলে উৎপল বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি এনেছি বটগাছ। সেগুলোর বেশিরভাগ সাইকাস জাতের কালারিং বটগাছ। এছাড়া পারিজা নামের গাছটি ভারত থেকে সংগ্রহ করেছি। এছাড়া সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ড থেকে সংগৃহিত কামিনী গাছ।’


প্রাচীন চীনা শব্দ ‘পেনজাই’থেকে জাপানী ‘বনসাই’ শব্দের উৎপত্তি। বনসাই শব্দের অর্থ ট্রের মধ্যে ফলানো। এর অর্থ বামনবৃক্ষ। দুই হাজার বছর আগে চীন দেশে প্রথম বনসাই তৈরি হয়, যা পর্যায়ক্রমে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। শক্ত কাণ্ড রয়েছে এমন গাছকে নান্দনিকভাবে খর্বাকৃতি করার শিল্পকে বনসাই বলা হয়। গাছের গড়ন নির্ণয় থেকে শুরু করে তাতে পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং যে পাত্রে বা টবে তা চাষ করা হয় তা নির্ধারণ এবং প্রতিস্থাপন সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বনসাই ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়তি অক্সিজেন তৈরিতে সহায়তা করে।


বিবার্তা/ওরিন/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com