
যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সাথে ব্যস্ত থাকার কথা পড়া-লেখায়, সেই বয়সে ধরেছে সংসারের হাল। বাবা-মাকে হারিয়ে ভ্যান চালিয়ে শিশু দুই ভাই-বোন ও বৃদ্ধ দাদা- দাদীকে নিয়ে চলছে ১০ বছর বয়সী শিশু হাসানের জীবিকানির্বাহের চাকা।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়ীয়া ইউনিয়নের গরুড়া মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের শিশু হাসান আলী ৫ সদস্যকে নিয়ে চলছে তার টানাপোড়নের সংসার জীবন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাবা হাবিবুর রহমান হবি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে গত রোজার ঈদের দিন মারাযান। অসুস্থ বাবা ও ৩ শিশু সন্তানকে ফেলে বাবার চিকিৎসার জন্য জমানো প্রায় ৩ লাখ টাকা ও ৫ বছর বয়সী ছোটবোনের গলার স্বর্ণের হার নিয়ে এক যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যান মা রোজিনাখাতুন। এরপর নেমে আসে হাসানের জীবনে অন্ধকার। বদলে যায় তার জীবনের গল্প। বই-খাতা ফেলে চড়ে বসে ভ্যানের পীঠে। দিনভর ভ্যানের চাকা ঘুরিয়ে যা আয় হয় তাই দিয়ে ছোটবোন উম্মে হাবিবা, ১২ বছর বয়সী মানষিক ভারসাম্যহীন বড়ভাই জুনায়েদ হোসেন, বৃদ্ধ দাদা মসলেম উদ্দিন ও বৃদ্ধা দাদী শপাজান খাতুনকে নিয়ে চলে শিশু হাসানের পরিবার। যা পৌরনিক গল্পকেও হার মানিয়েছে।
শিশু হাসানের দাদা-দাদীরা জানান, হাসানের পিতা হাবিবুর রহমান হবির চিকিৎসার জন্য কষ্টে জমানো প্রায় ৩ লাখ টাকা ও ছোট মেয়ের একটি স্বর্নের হার নিয়ে হাসানের মা অন্যত্র পালিয়ে বিয়ে করে। ভারতে চিকিৎসার জন্যতিলে তিলে জমা করেছিল হবি। হাসানের মায়ের এমন নিষ্ঠুর আচরণ ও অমানবিক সিদ্ধান্তে ৩টিশিশুর জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।
মাকে হারানোর বেদনা কাটতে না কাটতেই বাবার মৃত্যু এযেন মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় ৩ ভাইবোনের। মাত্র ১০ বছর বয়সে হাসান আলী পরিবারের ভার নিজ কাঁধে তুলে নেয়। বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে শিশু হাসান এখন পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছে। সারাদিন পরিশ্রম করে সে কখনো ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, কোনো দিন সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে। যা দিয়ে কোনো মতে চলে ৩ ভাইবোন ও দাদা-দাদীকে নিয়ে হাসানেরজীবন সংগ্রামের সংসার।
প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা ছোট ৩ শিশুর কষ্ট দেখে তারাও ব্যথিত। তারা বলেন, অল্প বয়সের একটি শিশুকে ভ্যান চালাতে দেখা আমাদেরও কষ্ট লাগে। যে বয়সে তার হাতে বই-খাতা কলম থাকার কথা, স্কুলের আঙিনায় সহপাঠীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই তাকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে কঠিন বাস্তবতারমুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে, ধরতে হয়েছে সংসারের হাল।
হাসানের জীবন সংগ্রামের বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানআশরাফুজ্জামান মুকুল সরকার গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও কষ্টদায়ক। এত অল্প বয়সে একটি শিশুকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমরা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির খোঁজখবর নিচ্ছি এবং যথাসম্ভব সহায়তার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের মানবিক সহায়তার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বানজানাচ্ছি।
হাসানের পরিবারের খোঁজখবর নিতে গতকাল দুপুরে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ হাসানের বাড়িতে ছুটে যান। এসময় তিনি বলেন, প্রশাসন ইতোমধ্যে পরিবারটিকে খাদ্য সহায়তা প্রদান শুরু করেছে। পাশাপাশিদীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শিশুদের সরকারি শিশু সদনে স্থানান্তর করা হবে অথবা দাদা দায়িত্ব নিতে সক্ষম হলে তাকে সরকারি সহায়তায় একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
সরকার বা বিত্তবানদের নেক দৃষ্টি বদলে দিতে পারে হাসান আলীর জীবন চাকার গল্প। আবারও উঠতে পারে এতিম ৩ শিশুর হাতে বই- খাতা-কলম। ছুটে যেতে পারে কোলাহলপূর্ণ স্কুলের বারান্দায়। আরএরজন্য প্রয়োজন একটু সহনুভূতি।
বিবার্তা/শরীফুল/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]