
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের কলাতলী, হোটেল-মোটেল জোন এবং আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা একাধিক স্পা সেন্টারকে ঘিরে দিন দিন বাড়ছে জনঅসন্তোষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, শরীর ম্যাসাজের নামে পরিচালিত এসব স্পা সেন্টারের আড়ালে চলছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দেহব্যবসা, পর্যটক ব্ল্যাকমেইলিং, ছিনতাই, অর্থ আদায় এবং সামাজিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ বিস্তার। বিশেষ করে মসজিদের সামনে, ঘনবসতিপূর্ণ পারিবারিক আবাসিক এলাকায় এবং অভিজাত হোটেল-গেস্ট হাউসগুলোতে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দা, মুসল্লি ও সচেতন মহল।
সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কলাতলী এলাকার বিকাশ বিল্ডিংয়ের পেছনে একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় স্থানীয় একটি মসজিদের সামনে গড়ে ওঠা একটি কথিত অবৈধ স্পা সেন্টার। এলাকাবাসীর দাবি, কয়েক মাস আগে “স্পা সেন্টার” নামে চালু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে সাধারণ সৌন্দর্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, স্পা সেন্টারটি চালুর পর থেকেই এলাকায় বহিরাগত লোকজনের আনাগোনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী অচেনা নারী-পুরুষের যাতায়াত স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
একজন ক্ষুব্ধ বাসিন্দা বলেন, এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ পারিবারিক এলাকা। আমাদের সন্তানরা এখানে বড় হচ্ছে। মসজিদের সামনে এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ চাই।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানায়, একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা শুধু অনৈতিক নয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রশাসনের কতিপয় অসাধু ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব স্পা সেন্টার মাসিক রুম ভাড়া নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। নামমাত্র বৈধতার আড়ালে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে চলছে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, ফুল বডি ম্যাসাজের নামে ঘণ্টাপ্রতি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। প্রতিটি স্পা সেন্টারে রাখাইনসহ ১০ থেকে ১৫ জন তরুণী রাখা হয়, যাদের মধ্য থেকে পছন্দমতো কাউকে বেছে নিয়ে সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এসব কেন্দ্র খোলা থাকে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস এবং সামাজিক নৈতিকতা বিপর্যস্ত করতে “স্পা” এখন নতুন এক ব্যবসায়িক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। শরীর ম্যাসাজের নামে যৌন উত্তেজনামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ধনাঢ্য পরিবারের যুবক, কিছু পর্যটক এবং বিভিন্ন এনজিওতে কর্মরত কর্মকর্তারা এসব কেন্দ্রের প্রধান গ্রাহক বলেও স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়রা আরও জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণীদের এনে এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু শিক্ষার্থীকে টাকার প্রলোভনে এসব কাজে জড়ানো হচ্ছে। বাইরে থেকে নারীরা পরিচালনায় থাকলেও এর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী রাঘববোয়ালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হোটেল-মোটেল জোনের অলিগলিতে স্পা সেন্টারের বিজ্ঞাপনসম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রকাশ্যে ঝুলছে। পর্যটনকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের লক্ষ্য করে গড়ে উঠেছে এই ব্যবসা। অথচ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী, স্বাস্থ্যগত অনুমোদন কিংবা যথাযথ লাইসেন্স।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, কলাতলীর আলোচিত এই স্পা সেন্টারের পরিচালনার সঙ্গে ‘রাকিবুল’ নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি কে, কীভাবে এবং কার সহযোগিতায় এমন একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন তা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, প্রভাবশালী কোনো মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এমন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি এখন শুধু একটি স্পা সেন্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর পেছনে প্রশাসনিক উদাসীনতা কিংবা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, সেটিও তদন্তের দাবি তুলেছে।
কক্সবাজারের পর্যটন জোন কলাতলীর বিভিন্ন স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, স্পার আড়ালে পতিতাবৃত্তি, পর্যটকদের ব্ল্যাকমেইলিং, অর্থ আদায়, এমনকি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানের পরও থামছে না এসব কর্মকাণ্ড।
এ বিষয়ে কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, স্পার আড়ালে নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নারী-পুরুষের সংঘবদ্ধ চক্র অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে পর্যটন শিল্পকে কলঙ্কিত করছে। উঠতি তরুণীদের দিয়ে বডি ম্যাসাজের নামে ভয়াবহ দেহব্যবসা চলছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই, শুধু পৌরসভার একটি ট্রেড লাইসেন্সই তাদের মূল ভরসা। আবার অনেকেই বিউটি পার্লারের লাইসেন্স নিয়ে গোপনে স্পা সেন্টার পরিচালনা করছেন।
কক্সবাজার পৌর প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান (উপসচিব) বলেন, কতটি বিউটি পার্লার হিসেবে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নই। সেটি দেখে বলতে হবে। তবে যদি বিউটি পার্লারের লাইসেন্স নিয়ে স্পা সেবা দেওয়া হয়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর স্পার লাইসেন্স নিয়ে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের (অতিরিক্ত দায়িত্বে) পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। লাইসেন্সের বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ দেখে থাকে।
পৌরসভার একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে স্পা সেন্টার হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হলেও বর্তমানে অনেকে বিউটি পার্লার হিসেবে লাইসেন্স নিয়ে একই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে আইন প্রয়োগ জটিল হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সমাজসেবকরা বলছেন, আজ যদি মসজিদের সামনে এমন কার্যক্রম চলতে দেওয়া হয়, কাল পুরো সমাজ তার খেসারত দেবে। প্রশাসনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
স্থানীয় অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, শিশু-কিশোরদের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ওপর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এসব অবৈধ স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সুনাম, সামাজিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তারা বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন। এখন সবার মুখে একটাই প্রশ্ন-কলাতলীর আলোচিত স্পা সেন্টারের নেপথ্যের রাকিবুল আসলে কে, আর কার শক্তিতে এতদিন ধরে চলছে এই বিতর্কিত সাম্রাজ্য?
বিবার্তা/ফরহাদ/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]