
চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। বাসে ওঠার পর বুলেট বৈরাগী ঘুমিয়ে পড়ায় একপর্যায়ে বাসটি কখন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড অতিক্রম করে তা টের পাননি তিনি। এমনকি তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা কোটবাড়ি বিশ্বরোডও পার হয়ে যায় বাসটি। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে কুমিল্লায় নামার কথা বললে বাসের হেলপার তাকে মহাসড়কের জাগুরঝুলি এলাকায় নামিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তার আর বাসায় ফেরা হয়নি তার।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। চাঞ্চল্যকর এ খুনের ঘটনা পুলিশের পাশাপাশি তদন্ত শুরু করেছে র্যাব, ডিবি, সিআইডি ও পিবিআই। এরইমধ্যে রোববার (২৬ এপ্রিল) রাতে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
তারা হলেন-মো. সোহাগ, ইসমাইল হোসেন জনি, ইমরান হোসেন হৃদয়, রাহাত হোসেন জুয়েল এবং সুজন। কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ৪১তম বিসিএস নন–ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন।
জানা যায়, গাড়িতে ওঠার পর বুলেট বৈরাগী ঘুমিয়ে পড়ায় একপর্যায়ে বাসটি কখন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড অতিক্রম করে তা টের পাননি তিনি। এমনকি তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা কোটবাড়ি বিশ্বরোডও পার হয়ে যায় বাসটি। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে কুমিল্লায় নামার কথা বললে বাসের হেলপার তাকে মহাসড়কের জাগুরঝুলি এলাকায় নামিয়ে দেন।
রাত ১টা ২৫ মিনিটে স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন বুলেট বৈরাগী। স্ত্রী ঊর্মি হীরাকে তিনি বলেন, 'ঘুমিয়ে পড়ো, আমার আসতে দেরি হবে।' এরপর পরিবারের সঙ্গে কথা হয়নি তার। বাসেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।
ঘুমিয়ে পড়ার একপর্যায়ে বাসটি কখন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড অতিক্রম করে তা টের পাননি তিনি। এমনকি তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা কোটবাড়ি বিশ্বরোডও পার হয়ে যায় বাসটি। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে কুমিল্লায় নামার কথা বললে বাসের হেলপার তাকে মহাসড়কের জাগুরঝুলি এলাকায় নামিয়ে দেন।
আধাকিলোমিটার সামনে গেলে তিনি নামতে পারতেন আলেখারচর বিশ্বরোডে। কাছাকাছি আরও নিরাপদ জায়গা থাকতে ঘুমের ঘোরে থাকা এবং বাস চালনার দায়িত্বে থাকাদের নির্বুদ্ধিতায় তাকে নেমে যেতে হয় অনিরাপদ স্থানে। আর এই অনিরাপদ স্থানে নেমেই বিপদ ডেকে আনেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। শেষমেশ তাকে জীবনও দিতে হয়।
বুলেট বৈরাগীর মামা কার্তিক বলেন, স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলার পর পরিবারের আর কারো সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি তার। ঘুমের মধ্যেই বাসটি পদুয়ার বাজার ওভারপাস হয়ে সামনের দিকে চলে আসে। এতেই সে ভুল স্থানে নেমে যায়। তার হাতে দুটি কাটা দাগ ছিল। ধস্তাধস্তির সময় ছোরা দিয়ে হয়তো আঘাত করা হয়েছে। যা হয়ে গেছে, তাকে আর ফেরত পারব না। তবে আমরা হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।
সূত্র থেকে জানা যায়, কুমিল্লা বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে বুলেট বৈরাগী যোগ দেন গত ৮ মাস আগে। সীমান্তে চাকরি হওয়ায় কুমিল্লার অনেক স্থান সম্পর্কে তার ধারণা ছিল না। যে স্থানে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয় ওই স্থান থেকেও তিনি সরাসরি কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে প্রবেশ করতে পারতেন। তবে রাত ৯টার পর শহরে প্রবেশের জন্য তেমন গাড়ি থাকে না। এরপর থেকেই এটি অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
বাসে মাত্র আধামিনিটের পথ অগ্রসর হলে বুলেট বৈরাগী আলেখারচর বিশ্বরোড নেমে যেতে পারতেন। ওই স্থান থেকেও তিনি সহজে শহরে প্রবেশ করতে পারতেন।
এদিকে সোমবার (২৭ এপ্রিল) কারওয়ান বাজারের র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, বুলেট বৈরাগী বাস থেকে নামার পর উল্টোপথের জাঙ্গালিয়ার গাড়ি খোঁজ করেন। সেখানে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ওঁৎ পেতে থাকা পেশাদার ছিনতাইকারীরা বুলেট কোথায় যাবেন জানতে চান। তিনি বলেন, জাঙ্গালিয়ায় যাবেন। এসময় তারা তাকে গাড়িতে তোলেন।
তিনি আরও বলেন, ওই খুনের সঙ্গে জড়িত পাঁচ সদস্যের একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। যাত্রী সেজে ফাঁদ পাতেন তারা। জড়িত সবাই কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা। তারা হলো- ইমরান হোসেন হৃদয় (৩৭), মোহাম্মদ সোহাগ (৩০), ইসমাইল হোসেন জনি (২৫), মোহাম্মদ সুজন (৩২) ও রাহাতুল রহমান জুয়েল (২৭)।
তিনি জানান, হত্যার সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যরা বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, ব্যাগ ও অল্প কিছু টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে চলন্ত সিএনজি অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের কারণে মারা যান তিনি।
কুমিল্লা বিবিরবাজার স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, বুলেটের বাড়ি গোপালগঞ্জে। বিবিরবাজারে যোগদানের পর তিনি পরিবার নিয়ে কুমিল্লার রাজাগঞ্জ পানপট্টিতে বাসা ভাড়া নেন। পানপট্টি থেকে বন্দরের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার।
বিবিরবাজার স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জামাল আহমেদ বলেন, বুলেটের ব্যবহার ছিল অসাধারণ। তিনি দেশের সম্পদ ছিলেন। দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন তিনি। তার মৃত্যু আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো।
বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশ। শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় চট্টগ্রামমুখী লেনে আইরিশ হোটেলের পাশে তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]