
(প্রথম পর্বের পর)-পাগলের মতো এয়ারলাইন্স কর্মকর্তাদের সাথে চিৎকার চেঁচামিচি করি। কেন তারা এত কম সময় হাতে আছে জেনেও আমাকে টিকিট ইস্যু করল? কেন ৫ মাস আগে টিকিট করা সত্ত্বেও আমার এত ভোগান্তি হচ্ছে। এ-ফ্লাইট ও-ফ্লাইট করে বারবার কেন আমাকে স্ট্যান্ডবাই রাখলো? এয়ারপোর্ট পরিবর্তন করাল। আমার কি অপরাধ? এমন বেকায়দায় কেন যাত্রীদের ফেললো? এখন যদি আমি যেতে না পারি তার দায়ভার কে নিবে? এসব নিয়ে যখন আমি প্রচণ্ড প্রতিবাদ করছিলাম, পাশ থেকে দেখি অনেক যাত্রী আমার সমর্থনে ইকো করছে।
হট্টগোল দেখে এয়ারপোর্ট পুলিশ ছুটে আসে। ডিপোর্ট হওয়ার ভয় তখন তোয়াক্কাই করিনি। যদিও কেউ কেউ বলাবলি করছিল। ওসব ভাবার সময় কই? কেবলই ছেলের মুখ ভেসে আসছিলো। ওর নাম ঘোষণার সময় হাজারো বাবা-মায়ের মাঝে ও আমাকে খুঁজে বেড়াবে। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মন খারাপ করে নিজের ছবি নিজেই তুলে ফেইসবুকে পোস্ট করে আমাকে অভিশম্পাত দিবে। এসব মনে করে কেউ যদি আমাকে আবার ‘অতি-বাবা’ খেতাব দেয়, দিক। আই ডোন্ট কেয়ার। যে কাজে এসেছি, তা যদি না হয়, তাহলে আর ডিপোর্টের ভয় পেয়ে কি হবে।
অনেকটা বেসামাল ও ডেস্পারেট হয়েই পুলিশের কাছে ঘটনার আদি-পান্ত ব্যাখ্যা করি। যাত্রীদের অনেকেই তখন আমার সামনে দাঁড়ানো ছিল। তারাও তাঁদের অভিযোগ জানায়। এক পর্যায়ে এয়ারলাইন্স এর সিনিয়র এক কর্মকর্তা আমাকে ডেকে ফ্রন্ট ডেস্কে নিয়ে যায়। কীভাবে সমস্যাটির সমাধান করবে তার উপায় খুঁজতে থাকে। সামনে রাখা ডেস্কটপে প্রায় ১ ঘণ্টা ঘাঁটাঘাঁটি করে আস্তে করে আমাকে বলে, ‘উই আর সরি ফর এভ্রিথিং। ইটস বিকস অফ ওয়েদার কগজেশন। নাউ উই হেভ এন অল্টারনেটিভ ফর ইউ। হুইচ ইস টুমোরাও মর্নিং সিক্স ও ক্লোক উই হেভ এ ফ্লাইট ফ্রম এলজিএ টু শিকাগো অ্যান্ড শিকাগো টু আলবাকারকি”। আমি মিলিয়ে দেখলাম, ভোর ছয়টায় ফ্লাইট ধরতে পারলে ট্রানজিট টাইমসহ স্থানীয় সময় ব্যবধানে দুপুড় ১২টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছা যাবে। হয়তো ফর্মাল প্রোগ্রামটি পাওয়া যাবে না। কারণ সেটি সকাল ৯ টায় শুরু হলে দুপুর ১টায় শেষ হয়ে যাবে। গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রামে আমার জন্য সংরক্ষিত আসনটি শূন্যই থেকে যাবে।
অফিসার বললেন, ‘ইফ ইউ এগ্রি, দেন ইউ ক্যান অ্যারেঞ্জ’। মন খারাপ সত্ত্বেও আমি অগত্যা রাজি হই। বন্ধু মিশন (আমার বাল্যবন্ধু)-কে ফোন করে আমাকে পিক করার জন্য অনুরোধ করি। ও আর অয়ন (ওর ছেলে) এসে আমাকে নিয়ে ওদের বাসায় চলে যায়। আমি ক্লান্ত। অবসন্ন। বিমর্ষ। বাসায় আসতে আসতে প্রায় রাত ১টা বেজে যায়। ততক্ষণে আমাদের স্মার্ট বয় অয়ন (বিঘান্টম ইউনিভার্সিটিতে আর্কিটেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করছে) সেই রাতের নিউজপেপারের একটি লিংক শেয়ার করে। তাতে জানতে পারি, ঘটনা সত্য। প্রায় ৫০০ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কারণ হিসেবে ওয়েদারের কথা যেমনি আছে তেমনি আছে রাজনীতি।
আমেরিকান এয়ারলাইন্সের কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে লোকবল কমে যাওয়ায় ঘটেছে এমন বিপত্তি। ওপেন সিক্রেট, লোকবল ছাঁটাই নাকি ট্রাম্প সাহেবের কারসাজি?
ঘুম হয়নি বাকী সময়টুকু। ভোর ৪টায় আমি উবারে মিশনের বাসা (এলমার্ষ্ট) থেকে এলজিএতে এসে দেখতে পাই ছয়টার ফ্লাইটেও আমাকে ষ্ট্যান্ডবাই করে রাখা হয়েছে। আগে আগে গিয়ে ডেস্কে কমপ্লেইন করতেই এর পরের ফ্লাইটে আমাকে ব্যবস্থা করে দেয়। আফসোস! ছয়টার ফ্লাইটটিতে যদি যেতে পারতাম, তাহলেও অন্তত আমি মূল অনুষ্ঠানের কিছু ধরতে পারতাম। ঠিক ৭টায় ফ্লাইট ছেড়ে ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে শিকাগো পৌঁছাই। সেখানে ১ ঘণ্টার ট্রানজিট। কোথাও যাইনি। নাস্তা না খেয়ে গেইটেই বসে থাকি। শিকাগো থেকে আলবাকারকি পৌঁছালে ছেলের বন্ধু এসে গাড়ি দিয়ে সোজা ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর ক্যাম্পাসে নিয়ে যায়। তারপর বাকী সময়টুকু ছেলে ও তার বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ আনন্দে কাটাই। দীর্ঘ এ ভোগান্তি থেকে আমার যা লার্নিং হলো-
১। পৃথিবীর সব জায়গায় রাজনীতি। ওয়েদার-টোয়েদার কিচ্ছু না।
২। একদম টায়-টায় রওয়ানা না দিয়ে দূরদেশের প্রোগ্রামে কয়েকদিন আগে যাওয়াই শ্রেয়।
৩। কোন কিছুই যখন আপনার নিয়ন্ত্রণে নাই, তখন আর অতিরিক্ত আবেগ দেখাইয়া লাভ কি? নীরবে সহ্য করাটাই শ্রেয়।
৪। যেহেতু সমস্যাটি এয়ারলাইন্সের, তাই হাল ছাড়া যাবে না। ওরা যেভাবে হোক, যেমন করে হোক ব্যবস্থা করে দিবেই।
৫। দেশ-বিদেশ যেখানেই হোক, হক কথা বলতেই হবে। সব সময় প্রফেসর-সুলভ আচরণ করলে যে কেউ আপনাকে মসজিদের মোয়াজ্জিন কিংবা ইমাম ভেবে পুরাই পেয়ে বসবে। তাতে কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না।
৬। আমেরিকার মত দেশে সব সময় দিনের ফার্স্ট ফ্লাইট চুজ করলে ভালো। প্রতি ঘণ্টায় যেহেতু ফ্লাইট থাকে, তাই পরবর্তী ফ্লাইটে একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবেই।
৭। সিস্টেম সবই এক। বাংলাদেশ বিমানে এমন শিডিউল বিপর্যয় ঘটলে হাউ-কাউ করি। গালাগাল করি। অথচ আমেরিকান এয়ারলাইন্সে কারো তেমন কোনো প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। সবাই ভদ্র-মার্জিত ভাষায় সংশ্লিষ্টদের সাহায্য প্রার্থনা করে।
৮। এসব মোড়লদের ডোমিষ্টিক ফ্লাইটে একখান বেলা বিস্কুট দূরে থাক, এক গ্লাস পানিও খেতে দেয় না। অথচ আমাদের ইউএস বাংলা, নভো কিংবা বাংলাদেশ বিমানে নিদেনপক্ষে একখান তাজা স্যান্ডউইচ, একটা ম্যাংগো চকলেট সাথে এক বোতল পানি ফ্রি দেয়।
৯। ওদের কোন সিট নম্বর থাকে না। জোন বলা থাকে। সে অনুযায়ী যে যেখানে খুশী বসতে পারে। শুধু বিজনেস ক্লাস বাদে। আর আমাদের দেশে! ওরে বাপরে! সিট না দিলে তুঘলকি কাণ্ড ঘটে যাবে।
১০। প্রচণ্ড ধৈর্য থাকা চাই। এতগুলো ঘটনা আমার সাথে কেন ঘটলো? যখন ভাবি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, এর মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহ নিশ্চয় কোনো ভালো কিছু লিখে রেখেছেন। হয়তো কোন বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন। তখন সব অভিমান ক্ষোভ ছাপিয়ে কেবল এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটটির ঐ ২৪২ জন যাত্রীর ভস্মীভূত কয়লা সদৃশ চেহারা চোখে ভাসে। আর ভাসে ঐ ফ্লাইটের ১১-এ সিটের যাত্রী রমেশের অলৌকিক বেঁচে যাওয়ার দৃশ্য।
আমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী সেই বিমানটি গত ১২ জুন ২০২৫ তারিখে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই দুর্ঘটানার শিকার হয়।যে রাতে একটার পর একটা ফ্লাইট ধরিয়ে দেয়ার নামে আমাকে স্ট্যান্ডবাই রাখা হলো, ফ্লাইট না পেয়ে বাধ্য হয়ে অন্য এয়ারপোর্টে যেতে হলো। সেখান থেকেও যখন ফ্লাইট মিললো না, তখন পরদিন সকালে এসে আবার ব্যর্থ হতে হলো। এরপর যখন ফ্লাইটটি পেলাম। হয়তো সেটিই আমার জন্য সৃষ্টিকর্তা নিরাপদ করে রেখেছেন। আমি জানতাম না। শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, সব বিলম্ব, সব অস্থিরতার মধ্যেও হয়তো সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য এক অদৃশ্য নিরাপত্তা রেখা তৈরি করে রাখেন। আমরা শুধু দেরিটুকু দেখি, অদেখা বিপদগুলো দেখি না। যাহোক, জীবনে এমন ভোগান্তিতে যেন আমার পরের প্রজন্মের কাউকে পড়তে না হয়; আর পড়লেও যেনো আমার এই কাহিনি তাদেরকে খানিকটা উদ্দীপনা জোগায়, সে কারণেই অভিজ্ঞতাটি শেয়ার করলাম।
লেখক : প্রফেসর ড. মো. নাসিরউদ্দীন মিতুল (সাবেক ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]