
টিকিটে লেখা ফ্লাইট টাইম বিকেল ৪টা। দুপুর ২টায় এয়ারপোর্টে এসে শুনি ফ্লাইট ডিলেয় আছে ২ ঘণ্টা। অর্থাৎ ৬’টায় ছাড়বে। কারণ যেটা বললো, তা কানে নিইনি। মাত্রতো ২ ঘণ্টা! এ আর এমন কি? বসে থাকলাম। সাথে শুধু কেরী-অন। তাই হাঁটাহাঁটিতে অসুবিধা নেই। তা ছাড়া আলিশান এয়ারপোর্ট। শুয়ে-বসে, কফি খেয়ে কাটালেও দু'ঘণ্টা তেমন ব্যাপার না। অতঃপর ৫টার দিকে অনলাইন বোর্ডিং করতে এসেদেখি ফ্লাইট আরও দু'ঘণ্টা দেরি অর্থাৎ ৮টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতক্ষণে আমার কিছুটা ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। বোর্ডিং এর লাইনে অপেক্ষমাণ লোকজনের মুখ ফ্যাকাশে। আলাপ করতেই বললো, ‘ওকে লেটস ওয়েট আপ-টু এইট ও’ক্লোক’। ফ্রি ওয়াই-ফাই কানেক্ট করে নানান রকমের অ্যালগরিদমে ডুবে সময় পার করতে লাগলাম।
৮টায় যেহেতু ফ্লাইট তাই ৭টার সময় আবার অনলাইনে বোর্ডিং করার চেষ্টা করি। এবার চোখ আবার ছানাবড়া। স্ক্রিনে যা দেখলাম তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! এটা কি করে সম্ভব! আমার যে সর্বনাশ হয়ে যাবে! কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে পারবো না।
ভেবেছিলাম, ৪/৫ ঘণ্টার ডিলেয় হলেও ডালাস ডিডব্লিওএফ এয়ারপোর্টে নেমে হাতে সময় থাকবে সামান্য কিছু। তাতে করে তড়িঘড়ি করে ভোররাতে নিউ মেক্সিকোর আলবাকারকি এয়ারপোর্টে পৌঁছানো যাবে। অংশ নেয়া যাবে বহুল প্রতীক্ষিত আমার দীর্ঘ লালিত স্বপ্নের অনুষ্ঠানে।
পরের দিন ১৭ই মে ২০২৫। সকাল ৯টায় আমার ছেলে সামিনের গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম।
চোখে-মুখে কি যে একটা অভিব্যক্তি এতদিন আমি লালন করেছি! কত যে কল্পনার জাল বুনেছি! ঘুম ঘুম চোখে কতবার যে একটার পর একটা ছবিতে ক্লিক করেছি! মনে মনে কত হাজার বার ওর গাউন-হ্যাট আর সার্টিফিকেট ছুঁয়ে দেখেছি! নাম ঘোষণার সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে শীষ বাজিয়ে ওকে কীভাবে অভিনন্দন জানাবো, কতবার যে তা প্র্যাকটিস করেছি! এসবের ইয়াত্তা নেই! বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় অর্জন আমার কাছে আর কিহতে পারে! ফ্লাইট ক্যানসেল! এখন কি হবে? চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম।
নিউ মেক্সিকো থেকে ছেলের ফোন আসে। বাবা কতদুর? ওকে শুধু ফ্লাইট ডিলেয় হওয়ার কথা বলেছি। ক্যানসেল বললে ওর অবস্থা কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই সরাসরি কিছু না বলে নিজেই উপায় বাতলাতে থাকি। নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। সোজা কাউন্টারের দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট গিয়ে খুলে বললাম। কেন আমার যাওয়াটা জরুরি এবং এখন কি করণীয়? কিছুটা ইমোশনাললি তাকে এক্সপ্লেইন করার পর ভদ্রলোক আমাকে বিবেচনায় নিয়ে রুট চেঞ্জ করে বোর্ডিং করে দিলেন। তিনি আমাকে বুঝিয়ে বললেন, আবহাওয়া খারাপ। ডালাসগামী সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সে কারনে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের প্রায় ৫০০ ফ্লাইটের মারাত্মক শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে।
আমার অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি আমার পূর্বের রুট (অর্থাৎ নিউইয়র্কের এলজিএ টু ডালাস। ডালাস টু আলবাকারকি) পরিবর্তন করে নতুন রুট দিলেন। এলজিএ টু শিকাগো। শিকাগো টু আলবাকারকি। বোর্ডিং পাসে আরও লেখা ছিল ‘you have been placed on the standby list’। সময় তখন সন্ধ্যা ৮টা। ফ্লাইট টাইম দেখাচ্ছে ১০টা ৫৯ মিনিটে। ভেবেছিলাম বিপত্তি মিটে গেছে। আশা নিয়ে দ্রুত সিকিউরিটি চেক ও ইমিগ্রেশন সেরে ফেলি। সিকিউরিটির জন্য নিয়মানুযায়ী জুতা, জ্যাকেট, বেল্ট, ঘড়ি, ল্যাপটপ সব খুলে শশব্যস্ত হয়ে ইমিগ্রেশন সেরে নির্ধারিত গেইট-১১ তে হাজির হই। কিন্তু হায় আল্লাহ। একি কাণ্ড!
আমার মত কয়েকশ যাত্রীর এখানে আহাজারি চলছে। সবাই স্ক্রিনে অপলক তাকিয়ে আছে। স্ট্যান্ডবাই লিস্ট থেকে দু’একজনের নাম আপগ্রেট লিস্টে আসতে থাকে।
উল্লেখ্য, যারা রেগুলার অর্থাৎ ঐ নির্ধারিত রুটের ফ্লাইটে অগ্রিম টিকিট কেটে তালিকাভুক্ত যাত্রী হয়েছেন; শুধু তারাই এ ফ্লাইটে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে স্ট্যান্ডবাই লিস্ট থেকে আপগ্রেট লিস্টে আসা প্যাসেঞ্জার এর সংখ্যা নিতান্তই দু’একজন। আমি স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি “মি. এমডি” (আমার নামের প্রথম অংশ) সিরিয়াল ৪২।
হতাশ হয়ে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ডেস্ক অফিসারের সঙ্গে মিনিট খানেক কথা বলি। উনি যা বললেন, তাতে শান্ত থাকতে পারিনি। সামনের ২৪ ঘণ্টা তো নয়ই বরং ৪৮ ঘন্টায়ও নাকি আপগ্রেট লিস্টে আমার সিরিয়াল আসার সম্ভাবনা নেই।
পাশেই এক অল্প বয়সি মেয়েকে অঝোরে কাঁদতে দেখি। সম্ভবত আমেরিকান হবে। কান্নার কারণ জানার আগ্রহ নেই। আমার অবস্থা ওর চেয়েও খারাপ। হয়তো আমি ওর মতো এভাবে কাঁদতে পারছি না। ছেলের ফোন পেয়ে এবার আর নিজেকে স্থির রাখতে পারিনি। ওকে খুলে বলি। ছেলে আমার পরিস্থিতি কিছুটা অনুধাবন করে সান্ত্বনা দিতে লাগলো। গেইট-১১ বন্ধ করে দিয়ে ডিউটিরত কর্মকর্তারা আমাদেরকে গেইট-১৬-তে রেফার করলেন। সেখানকার ফ্লাইট ছাড়বে রাত ১২টায়। কিন্তু এখানে আমার সিরিয়াল আসার কোনো সম্ভাবনা নেই।
আমি বিকল্প ভাবতে থাকি। এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তার কাছে আবারও ধরনা দেই। উনি একটা কাগজে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটা হেলপ-লাইনের নম্বর ধরিয়ে দিয়ে আমাকে সেখানে ফোন করতে বলেন। ফোন করি। পিএবিএক্স কলে যা হয়। এখানে ওখানে দুনিয়ার হাইকোর্ট-জজকোর্ট দেখানোর পর একজনকে ভাগ্যক্রমে হোক আর দুর্ভাগ্যক্রমে হোক পেয়ে যাই। তিনি আমার আকুতি শুনে খুব দয়া পরশ হন। আমাকে লাইনে রেখে প্রায় ৪০ মিনিট কম্পিউটারে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের নানান রুট-ঘাট ঘেটে একটা উপায় বের করেন। এলজিএ থেকে নয়, রাতেই যদি আমাকে গন্তব্যে যেতে হয়, তাহলে এক্ষুনি জেএফকে তে যেতে হবে। নতুন রুট জেএফকে টু এলএ (লস এঞ্জেলস) এরপর এলএ টু আলবাকারকি। ফ্লাইট টাইম রাত ১১টা। এভাবেই আমাকে যেতে হবে। ভদ্রমহিলা তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে এলজিএ এয়ারপোর্ট থেকে জেএফকে এয়ারপোর্টে যেতে বলেন।
ঘড়িতে সময় তখন রাত ১০ টা। হাতে আছে মাত্র ১ ঘণ্টা। আমি তাকে টিকিট কনফার্ম করে ই-মেইল করে দিতে অনুরোধ করেই বেরিয়ে পড়ি। তখনও আমি জানি না যে, এলজিএ এয়ারপোর্ট থেকে জেএফকে এয়ারপোর্টে যেতে ৩০ মিনিট-এর বেশী সময় লাগতে পারে। মধ্যখানে আরও অনেক ফরমালিটস আছে। যাই হোক, আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হবে এক্ষুনি। এক্সিট পেতেই অনেক সময় লেগে যাবে। উবার ধরার সময় নেই, ইনষ্ট্যান্ড ইয়োলো ক্যাব নিতে হবে। আমি উর্ধবশ্বাসে ছুটছি। নিরাপত্তা রক্ষীর সহায়তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা ইয়োলো ক্যাবে উঠে পড়ি।
হাতে সময় নেই। যে করেই হোক দ্রুততার সঙ্গে জেএফকে তে যেতে হবে। ছেলের গ্র্যাজুয়েশন। যে কারণে আমি এই সাতসমুদ্র তেরনদী পাড়ি দিয়ে আমেরিকা এসেছি।
আমাকে হাজির হতেই হবে। ওর মুখের হাসি আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও প্রিয়। কলেজ গ্র্যাজুয়েশনে যেতে পারিনি বলে ছেলে আমার আজও খোঁটা দিচ্ছে। তখন সে একাই সব সামলিয়েছে। আর এখন সব প্রস্তুতি থাকার পর, এমনকি আমেরিকায় এসে যদি প্রোগ্রামে অ্যাটেন্ড করতে না পারি, তাহলে নিজেকে ক্ষমা করবো কি করে? যে কাজে এসেছি, তাই যদি না হয় তাহলে এত কষ্ট, এত খরচ করে এসে কি লাভ?
আমি ছুটছি। আল্লাহকে ডাকছি। চোখ বন্ধ করে ট্যাক্সির গতি অনুভব করার চেষ্টা করছি। জ্যাম এড়িয়ে কীভাবে দ্রুত যাওয়া যায় ড্রাইভারের কাছে সেই অনুরোধ করি।
মুকেশ (ইন্ডিয়ান ড্রাইভার) চলনসই ইংরেজী বলতে পারে। সমস্যা অনুধাবন করে সে তীব্রগতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। হালকা ট্র্যাফিক, সিগন্যাল লাইট এসব মেনে সে যখন আমাকে ড্রপ দেয় তখন মিটারে ৭৪ ডলার দেখাচ্ছে। আমার কাছে ক্যাশ ছিল। আগেই রেডী করে রেখেছিলাম। জেএফকে’তে নেমেই সোজা এ্যামেরিকান এয়ারলাইন্সের কাউন্টারের দিকে পা বাড়াই।
লাইনে সামান্য কয়েকজন। প্রোটোকল ভেঙে পাগলের মত আমার ই-মেইল থেকে টিকিটের কনফারমেশন বের করে দেখাতেই ডেস্ক অফিসার জানালেন, নির্ধারিত ফ্লাইটের বোর্ডিং শেষ। গেইট বন্ধ। ফ্লাইটটি টেক-অফের জন্য রানওয়ের লাইনে অপেক্ষমাণ। এখন আর কোনো সুযোগ নেই ফ্লাইটে উঠার। আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। সিনক্রিয়েট শুরু করি। পরবর্তী চমকপ্রদ ঘটনা জানতে চোখ রাখুন ২য় পর্বে।
লেখক : প্রফেসর ড. মো. নাসিরউদ্দীন মিতুল (সাবেক ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]