
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক গভীর দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। একদিকে প্রাথমিক শিক্ষায় ৯৮ শতাংশের বেশি ভর্তির হার আমাদের সাফল্যের গল্প শোনায়, অন্যদিকে সেই সংখ্যার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ গুণগত বিপর্যয়। ২০২২ সালের ন্যাশনাল লার্নিং অ্যাসেসমেন্ট (NSA) রিপোর্ট জানাচ্ছে—দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবইয়ের
সহজ অংশও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল আয়োজন কি কেবল ‘অশিক্ষিত শিক্ষিত’ তৈরির জন্য?
এই ‘পরিমাণ বনাম গুণমান’-এর বৈপরীত্য আমাদের বহুল আলোচিত জনমিতিক লভ্যাংশকে (Demographic Dividend) সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি
কাঠামোগত, পদ্ধতিগত এবং রাজনৈতিক।
কাঠামোগত সংকট: বরাদ্দ কম, বাস্তবায়ন আরও কম ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষায় জিডিপির ৪–৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। বাস্তবে বাংলাদেশ সেখানে আটকে আছে ১.৫–১.৮ শতাংশে। ফলাফল হিসেবে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এর প্রায় ৬০ শতাংশই এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।ভৌত অবকাঠামোর চিত্রও উদ্বেগজনক। দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই। শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত গড়ে ৫৩:১, যেখানে আন্তর্জাতিক মান ৩০:১। এই বাস্তবতায় মানসম্মত শিক্ষা প্রত্যাশা করা নীতিনির্ধারণী রোমান্টিসিজম ছাড়া কিছু নয়।
শিক্ষাক্রম সংস্কার: ঘোড়ার আগে গাড়ি ২০২১ সালে সক্ষমতা-ভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু করা নিঃসন্দেহে সাহসী উদ্যোগ। কিন্তু অবকাঠামো ও শিক্ষক প্রস্তুতি ছাড়া এই সংস্কার কার্যত বৈষম্য বাড়াচ্ছে। ইউনিসেফ ও এটুআই-এর তথ্য বলছে, কোভিড-পরবর্তী সময়েও ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট সংযোগ নেই এবং ৭৩ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার স্মার্টফোন কিনতে পারে না।এই বাস্তবতায় ২০২৭ সালের নতুন কারিকুলাম দ্রুত বাস্তবায়নের তোড়জোড় যেন ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া’। এতে শহর–গ্রামের শিক্ষা বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
নিয়োগ ও শাসনব্যবস্থা: সংস্কারের পথে কায়েমী দেয়াল শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষক নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবে হয়। উচ্চশিক্ষায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—২০২৩ সালের তথ্যমতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যই ছিল প্রধান মানদণ্ড। শিক্ষা খাতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্কার কমিশন গঠনের পথে আমলাতান্ত্রিক জড়তা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব আজও বড় বাধা হয়ে আছে।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা: শিক্ষকই মূল বিনিয়োগ ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে—ইট-পাথরের চেয়ে শিক্ষকের মানই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ। ফিনল্যান্ডে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য মাস্টার্স ডিগ্রি বাধ্যতামূলক, আর সিঙ্গাপুর শিক্ষকদের ২১ শতকের দক্ষতায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়।বাংলাদেশেও শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো, মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে মেধাবীদের এই পেশায় টানা অসম্ভব।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা: বৈষম্যের নতুন সংস্করণ ২০২৫ সাল থেকে সীমিত পরিসরে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত এক ধরনেরপ্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তৈরি করছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এতে প্রায় ৪৯ হাজার বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুল কার্যত প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যাবে। এর ফলে কোচিং নির্ভরতা ও মানসিক চাপ বাড়বে—যা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
উত্তরণের পথ: এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে দেরি হয়ে যাবে কার্যকর শিক্ষা সংস্কারের জন্য এখন আর খণ্ডিত উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত—
১. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশে উন্নীত করা
২. পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য রেমিডিয়াল এডুকেশন ফ্রেমওয়ার্ক দ্রুত কার্যকর করা
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি করা
৪. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন শিক্ষক নিয়োগ কমিশন গঠন
৫. বৃত্তি পরীক্ষার বদলে ধারাবাহিক ও প্রক্রিয়া-ভিত্তিক মূল্যায়ন জোরদার করা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) সতর্ক করেছে—এখনই কার্যকর সংস্কার না হলে অদক্ষ
জনশক্তির কারণে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে ১ শতাংশেরও বেশি কমে যেতে পারে।
উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন এই নড়বড়ে প্রাথমিক শিক্ষার ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে না। শিক্ষা
সংস্কার কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একবিংশ শতাব্দীতে জাতি হিসেবে টিকে থাকার কৌশলগত
অপরিহার্যতা।
সংখ্যার মোহ ভেঙে গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত না করতে পারলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন
কেবল কাগজেই থেকে যাবে।
লেখক: সাইদুর রহমান (কলামিস্ট ও বিশ্লেষক)
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]