লন্ডন থেকে ঢাকা: এক ঐতিহাসিক ভিভিআইপি ফ্লাইটে দুই পুরোনো বন্ধু
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৯
লন্ডন থেকে ঢাকা: এক ঐতিহাসিক ভিভিআইপি ফ্লাইটে দুই পুরোনো বন্ধু
ড. এ. বি. এম. কামরুল হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শশাঙ্ক এস. ব্যানার্জির মধ্যে ছিল এক পুরোনো, নীরব বন্ধন-যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল আনুষ্ঠানিকতার আলোতে নয়, বরং গোপনীয়তা, ঝুঁকি এবং তখনও লেখা না হওয়া ইতিহাসের প্রতি যৌথ বিশ্বাসের ভিতরে। কলকাতায় জন্ম নেওয়া, বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় কূটনীতিক ব্যানার্জি। ষাটের দশকের শুরুতে ঢাকায় ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে টানা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বছর দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেই, পূর্ব পাকিস্তানের ছায়াঘেরা বাস্তবতায়, প্রথমবারের মতো নিয়তি এই দুই মানুষকে একসূত্রে বেঁধে দেয়।


এই বন্ধুত্বের শুরু ১৯৬২ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাতে। তখন ব্যানার্জি থাকতেন চক্রবর্তী ভিলায়, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার অফিসের পাশে। মধ্যরাতের পর হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তিনি চমকে জেগে ওঠেন। আগেই ওপর থেকে নির্দেশ ছিল-পাকিস্তানের একটি প্রদেশে কাজ করতে হলে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। বিভ্রান্ত ও সতর্ক অবস্থায় তিনি দরজা খুললেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ভদ্র একটি ছেলে-বয়স সবে চৌদ্দ। সে ইত্তেফাক-এর সম্পাদক মানিক মিয়ার পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছে: সম্ভব হলে অবিলম্বে তাঁকে আসতে অনুরোধ করা হয়েছে।


কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যানার্জি ইত্তেফাক ভবনে পৌঁছান। মানিক মিয়া তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর পাশে বসা এক দীর্ঘদেহী, প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে-এক মুহূর্তেই যিনি পরিচিত মুখ। তিনি পল্টন ময়দানে জনসমুদ্রের সামনে তাঁর ভাষণ শুনেছেন, প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে তাঁর ছবি দেখেছেন। কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-ভবিষ্যতের জাতির পিতা।


সেই রাতে মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু ব্যানার্জির হাতে একটি চিঠি তুলে দেন, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উদ্দেশে লেখা। চিঠিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয় এবং ভারতের সমর্থন কামনা করা হয়। মধ্যরাত পেরিয়ে বৈঠকটি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। এরপর আরও দু' টি বৈঠক হয়-সমানভাবে গোপন, সমানভাবে ঐতিহাসিক। ব্যানার্জি পরে তাঁর গ্রন্থ India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation and Pakistan (২০১১)-এ এই মুহূর্তগুলোর কথা প্রকাশ করেন।


প্রায় নয় বছর কেটে যায়। ইতিহাস এগিয়ে চলে রক্তক্ষয়ী গতিতে। এরপর আসে ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি। হিথ্রো বিমানবন্দরে, পাকিস্তানের কারাগার থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া এবং স্বাধীন স্বদেশে ফেরার প্রস্তুতিতে থাকা বঙ্গবন্ধু হঠাৎ একটি পরিচিত মুখ দেখেন। তিনি ব্যানার্জিকে আলিঙ্গন করে উষ্ণ কণ্ঠে বলেন, "ব্যানার্জি, তুমিও এখানে?" তখন ব্যানার্জি লন্ডনে ভারতীয় মিশনে কর্মরত।


প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে নির্দেশ দেন-লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকাগামী ভিভিআইপি ফ্লাইটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যানার্জিকেই যেতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী দুর্গা দাস ধর, আর. এন. কাও এবং পররাষ্ট্র সচিব টি. এন. কৌলের সঙ্গে পরামর্শের পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীকে জানানো হয়েছিল, ব্যানার্জি কেবল একজন কর্মকর্তা নন-তিনি এক বিশ্বস্ত পুরোনো বন্ধু, ইতিহাসের এই যাত্রার জন্য একেবারে উপযুক্ত সঙ্গী। তিনি ব্যানার্জিকে ফ্লাইটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কী বিষয়ে আলোচনা করতে হবে, সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দেন-যে দায়িত্বকে ব্যানার্জি পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিশন বলে উল্লেখ করেন।


বঙ্গবন্ধু ও ব্যানার্জি ছাড়া সেই ঐতিহাসিক ফ্লাইটে ছিলেন মাত্র আরও কয়েকজন লন্ডনের ভারতীয় হাইকমিশনের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারি এবং ড. কামাল হোসেন। ব্যানার্জি পরে এক ইউটিউব ব্লগে স্মরণ করেন, ইন্দিরা গান্ধী কখনো শেখ মুজিবকে অন্য কোনো নামে ডাকতেন না-না "শেখ সাহেব", না "মুজিবুর রহমান"। তাঁর কাছে তিনি ছিলেন কেবলই বঙ্গবন্ধু।



প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, বঙ্গবন্ধু একটি বিশেষ এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে দেশে ফিরবেন। মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে প্রায় আধাঘণ্টার টেলিফোন কথোপকথনে এ পরিকল্পনা আলোচনা হয়। পরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইন্দিরা গান্ধী একটি রয়‍্যাল এয়ার ফোর্স সামরিক বিমানের ব্যবস্থা করেন এবং নীরবে বঙ্গবন্ধুকে পরিবর্তনের কথা জানান।


বিমানে ব্যানার্জি জানালার পাশে, তাঁর পাশে বঙ্গবন্ধু। কমলার রস পরিবেশন করা হয়। হাসির রোল ওঠে। মেঘের অনেক ওপরে, দুই পুরোনো বন্ধু কথা বলেন-সম্পন্ন কূটনীতি আর আসন্ন কূটনীতির কথা। হঠাৎ বঙ্গবন্ধু কাছে ঝুঁকে এসে দ্বিধাহীন কণ্ঠে ফিসফিস করে বললেন, "তোমার কাছে একটা অনুরোধ আছে।” তিনি চান, ব্যানার্জি যেন সঙ্গে সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীকে জানান-ভারত যেন ১৯৭২ সালের ৩১ মার্চের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, নির্ধারিত সময়ের অন্তত তিন মাস আগে। তিনি নিজেও রাষ্ট্রপতি ভবনে আসন্ন বৈঠকে বিষয়টি তুলবেন, তবে তার আগেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চান।


ব্যানার্জি বিস্মিত হয়ে জানতে চান, বঙ্গবন্ধু কীভাবে জানলেন যে ভারত ৩০ জুনের মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করেছে। বঙ্গবন্ধু শান্তভাবে জানান-এডওয়ার্ড হিথ তাঁকে বলেছেন। ব্রিটেনের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া নির্ভর করছে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের সময়ের ওপর। এটাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, কূটনীতি।


ব্যানার্জি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। দিল্লি বিমানবন্দরের কোলাহলের মধ্যে তিনি কীভাবে এ সংবেদনশীল বার্তা পৌঁছাবেন? ঠিক তখনই ভাগ্য সহায় হয়। অবতরণের পর আনুষ্ঠানিকতা চলাকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি. পি. ধর ব্যানার্জিকে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, বঙ্গবন্ধু কী ভাবছেন। ব্যানার্জি বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ ও এডওয়ার্ড হিথের অবস্থান-দুটিই জানান। ধর সঙ্গে সঙ্গেই ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বার্তা পাঠান এবং জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করেন।


রাষ্ট্রপতি ভবনে বঙ্গবন্ধুকে আপ্যায়ন করা হয় নতুন গুড়ের সন্দেশ, সিঙ্গাড়া এবং কলকাতার দার্জিলিং চা দিয়ে। আড়ালে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে উত্থাপিত হয়। ভারত সম্মত হয়-৩১ মার্চ ১৯৭২-এর মধ্যেই সেনা প্রত্যাহার করা হবে। ব্যানার্জি পরে লেখেন, "ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এত দ্রুত আগে কখনো নেওয়া হয়নি।"


বৈঠকের শেষে বঙ্গবন্ধু ব্যানার্জির হাত ধরে উষ্ণ কণ্ঠে বলেন, "তুমি ঠিক বলেছ। তোমাকে পুরস্কৃত করা উচিত।" বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তা করা সম্ভব হয়নি, তবে ২০১২ সালের ২০ অক্টোবর তাঁর কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যানার্জিকে সম্মানিত করেন।


ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকেও ব্যানার্জির জন্য ছিল কিছু গোপন অনুসন্ধানের প্রশ্ন-নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, মন্ত্রিসভা, শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা কী। ব্যানার্জি যখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন, বঙ্গবন্ধু সানন্দে সমর্থন জানান। সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার সময় হঠাৎ বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেন-এই ধারণা কি মিসেস গান্ধীর কাছ থেকেই এসেছে? ব্যানার্জি পরে একে মুজিবের "শিশুসুলভ কৌতূহল" বলে বর্ণনা করেন। তিনি সৎভাবেই উত্তর দেন-হ্যাঁ, প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এসেছিল, তবে সিদ্ধান্ত ছিল একান্তই বঙ্গবন্ধুর।


এরপর আসে রাজনীতির ঊর্ধ্বে এক মুহূর্ত। বিমানের মাঝপথে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ব্যানার্জিকেও দাঁড়াতে বললেন। অন্য যাত্রীরাও দাঁড়িয়ে পড়েন। রয়‍্যাল এয়ার ফোর্স বিমানের নীরব কেবিনে বঙ্গবন্ধু গাইতে শুরু করলেন- "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।"


প্রথমবার গাইবার সময় তা যেন মহড়া। দ্বিতীয়বার তাঁর কণ্ঠ আবেগে কেঁপে উঠল, চোখ ভিজে এলো। ব্যানার্জিও কণ্ঠ মেলালেন। গান শেষ হলে সবাই আবার বসে পড়েন।


বঙ্গবন্ধু ব্যানার্জির দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলেন, তিনি "আমার সোনার বাংলা"কে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করতে চান। ব্যানার্জির মতামত জানতে চান। ব্যানার্জি সম্মতি জানালে বঙ্গবন্ধু হাসলেন এবং বললেন, "ইতিহাস হয়তো এটা লিখবে না, কিন্তু তুমি আর আমি জানব-এই সিদ্ধান্তটা লন্ডন থেকে ঢাকাগামী এক রয়‍্যাল এয়ার ফোর্স ফ্লাইটে, দুই পুরোনো বন্ধুর মধ্যে নেওয়া হয়েছিল।"


লেখক: প্রবাসী বাংলাদেশি চিকিৎসক ও কলামিস্ট।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com