ভোটের পর প্রতিশ্রুতি কোথায় হারিয়ে যায়?
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৮
ভোটের পর প্রতিশ্রুতি কোথায় হারিয়ে যায়?
সাইদুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

নির্বাচনের সময় রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতির অভাব হয় না। কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, সুশাসন সবকিছুরই আশ্বাস শোনা যায়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশির ভাগই বাস্তব জীবনে আর চোখে পড়ে না। তখন প্রশ্ন ওঠে এইপ্রতিশ্রুতিগুলোর দায় আসলে কার?


গণতন্ত্রে ভোট দেওয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা সাময়িকভাবে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা জনপ্রতিনিধির হাতে তুলে দেন। এর বিনিময়ে প্রত্যাশা একটাই জনগণের স্বার্থে কাজ করা এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতি
দায়বদ্ধ থাকা।


এই দায়িত্ব শুধু ভোটের দিনেই শেষ নয়। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও দেশজুড়ে ১১৯ মিলিয়নের বেশি নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী ভোটদানের হারপ্রায় ৪১.৮% ছিল যা অনেক পরিচালনা পর্যবেক্ষক ও নাগরিকদের কাছে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসাবেই শেষ হয়েছে।


প্রতিশ্রুতি কি শুধু ভোট পাওয়ার কৌশল?
নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে শত শত প্রতিশ্রুতি থাকে; কিন্তু বাস্তবে কতটুকু বা স্তবায়িত হয়? এই প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে গবেষণার বিষয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখিয়েছে, নির্বাচনী প্রতিশ্রæতির বাস্তবায়ন নির্ভর করে সরকার কোন ক্ষমতায় এসেছে কি না এবং কতটা নীতিগত প্রস্তুতি ছিল।


বাংলাদেশে স্বাধীন অনুসন্ধানকারীরা দীর্ঘদিন বলতে আসছেন দলগুলোর ইশতেহার ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশাল ফাঁক আছে। Transparency International Bangladesh এর একটিরিভিউতে দেখা গেছে, আয়নাগর সম্পাদকীয়, তথ্য প্রকাশ, সংসদ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি প্রায়ই বাস্তবায়িত হয়নি, এবং অনেক ক্ষেত্রে বিরুদ্ধমুখী আইন ও পলিসি গৃহীত হয়েছে।


বাংলাদেশে অনেক প্রতিশ্রুতি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন জনপ্রতিনিধি চাইলেই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারেন। কিন্তু আইনি কাঠামো, বাজেট সীমাবদ্ধতা, কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার বিভাজন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জনপ্রতিনিধিদের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা জানা সত্তে¡ও
অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া সেটিই দায়বোধহীন আচরণ।


ভোটার কি পাঁচ বছরের জন্য নীরব দর্শক?
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো ভোটই শেষ কথা। ভোটের পর বেশিরভাগ নাগরিক হয়তো বিশ্রাম নেন, কিন্তু প্রশ্ন করেন না। ভোট দেওয়ার পর জনপ্রতিনিধির কাজের হিসাব চাওয়ার প্রবণতা খুব কম। ফলে প্রতিশ্রুতি ভাঙলে বড় কোনো চাপ তৈরি হয় না। এই নীরবতাই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।


এটা শুধু বাংলাদেশে নয়; অনেক দেশেই ভোটাররা নির্বাচনের পর বেশিদিন সক্রিয় থাকেন না। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল শক্তি ওই সক্রিয় নাগরিক পর্যবেক্ষণ না হলে সরকার ও প্রতিনিধিদের এসো যাওয়াই অবান্তর হয়ে পড়ে।


প্রতিশ্রুতি যাচাই: সত্য মিথ্যার বাইরের প্রশ্ন
কোনো নেতা কী বলেছেন, তা সত্য না মিথ্যা এটি যাচাই করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু একটি প্রতিশ্রুতি কতটা এগোল, আদৌ শুরু হলো কি না, নাকি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ রইল এটি বোঝা অনেক বেশি জটিল। প্রতিশ্রুতি একটি চলমান প্রক্রিয়া।


আজ যে প্রকল্প ‘পরিকল্পনায়’, কয়েক মাস পর সেটি ‘স্থগিত’ বা ‘বাতিল’ও হতে পারে। তাই কেবল “সত্য” বা “মিথ্যা” বললে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। দরকার ধারাবাহিক, সময়ভিত্তিক ও প্রমাণভিত্তিক নজরদারি।


এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও সময়ভিত্তিক ডাটা সেট বা পদ্ধতি যেমন Election Manifesto Project ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে প্রচুর দলীয় প্রতিশ্রæতির বাস্তবায়ন হার বিশ্লেষণ করা হয়।


প্রযুক্তি কি নাগরিককে শক্তিশালী করতে পারে?
এই জায়গায় তথ্য ও প্রযুক্তির ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আধুনিক ডাটা নির্ভর টুল যেমন ডায়নামিক ট্র‍্যাকিং সিস্টেম নাগরিকদের জানতে সাহায্য করে কোন? প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি আংশিক, আর কোনটি কেবল কাগজেই রয়ে গেছে। এতে নাগরিকরা আবেগের জায়গা থেকে নয়, তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে প্রযুক্তি স্বয়ংই সমাধান নয়। সচেতন নাগরিক, তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষ গণমাধ্যম এসব একসাথে কাজ করলে তবেই জবাবদিহিতার চক্র শক্তিশালী হয়।


ভুয়া তথ্য: গণতন্ত্রের নীরব শত্রু
নির্বাচনের সময় ভুয়া সংবাদ, বিকৃত ছবি বা ভুয়া কার্ড ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করেই মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয় খবর যাচাই না করে শেয়ার করা মানে অজান্তেই অপপ্রচারের অংশ হওয়া।


নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যেমন সতর্ক করেছে প্রচারণার সময় ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য ও ঘওউ সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং আইনি নিয়ম মেনে চলতে হবে।
এটা শুধু আইনি কর্তব্য নয় এটি গণতন্ত্রকে রক্ষা করার সরাসরি উপায়।


গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্ন করার সংস্কৃতির ওপর। ভোট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার আওতায় রাখা এসবই সচেতন নাগরিকত্বের অংশ।


প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে প্রশ্ন না করলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো আমরা কি কেবল ভোটার হয়ে থাকতে চাই, নাকি দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠতে প্রস্তুত?


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com