একুশের শালীনতা ও আজকের শব্দবোমা
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৮
একুশের শালীনতা ও আজকের শব্দবোমা
মো. নাসির উদ্দীন মিতুল
প্রিন্ট অ-অ+

মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশের দিন। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি ধর্ম নয়; এর ভিত্তি হচ্ছে ভাষা ও সংস্কৃতি। এমন উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বিকাশ ঘটে তা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখণ্ড সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা রাখে।


বাঙালি নৃতাত্ত্বিকভাবে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী। জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’ ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে। এই সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন এক শক্তি অর্জন করে। বাংলা ভাষার আধুনিক সাহিত্যিক রূপ নির্মাণে ভূমিকা রাখেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের সাহিত্য বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়। একইভাবে শিল্পকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান প্রমুখ ভূমিকা পালন করেন। এরা সকলেই বাংলা ভাষার একটি স্বতন্ত্র বাঙালি নান্দনিকতা তৈরি করে দেন। কাজেই, জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রচিন্তার বহু আগেই।


এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলা ভাষাকে সাংস্কৃতিক শক্তি থেকে রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দিতে মূলত তিনটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়েছে। প্রথম ধাপে, ভাষার সাংস্কৃতিক শক্তি নির্মাণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের সাহিত্য ও সংগীতে বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে মানবিকতা, আত্মমর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িকতার ভাষা।


দ্বিতীয় ধাপে, ভাষাকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনেন চিন্তাবিদরা। তারমধ্যে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যুক্তি দেন, এই ভূখণ্ডের মানুষের ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া উচিত। আবুল মনসুর আহমদ ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।


তৃতীয় ধাপে, ভাষা পায় রাজনৈতিক রূপ। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী বাংলা ভাষাকে গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। আর শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে রূপ দেন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনে। যেখানে ভাষাই জাতিসত্তার ভিত্তি। ফলে বাংলা ভাষা কেবল সংস্কৃতির বাহন হয়েই থাকেনি; তা হয়ে ওঠে ভূখণ্ড সৃষ্টির হাতিয়ার।


বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি তিনটি। ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতা। একুশ এই তিনটির মিলনবিন্দু। ভাষা আন্দোলনের আগে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় থাকলেও রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ছিল অস্পষ্ট। একুশ সেই অস্পষ্টতাকে স্পষ্ট করে দেয়। ভাষা হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদার প্রতীক, সাংস্কৃতিক ঐক্যের মাধ্যম ও রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি। ভাষা আন্দোলনের পরই বাঙালি তার নিজস্ব নববর্ষ, সাহিত্যচর্চা, সংগীত ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে ধারণ করতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানি প্রয়াস উলটো বাঙালিকে আরও দৃঢ়ভাবে তার সাংস্কৃতিক শেকড়ে ফিরিয়ে নেয়। ফলে ভাষা হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের বীজ।


আজকের বাংলাদেশ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, দলীয় মেরূকরণ, সামাজিক অবিশ্বাস; সব মিলিয়ে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। এখানেই একুশের চেতনা প্রাসঙ্গিক। কারণ ভাষা ও সংস্কৃতি হলো ধর্ম, দল ও শ্রেণি বৈষম্যের ঊর্ধ্বে। যেখানে রাজনীতি বিভাজন তৈরি করে, সংস্কৃতি সেখানে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাউল গান মানুষকে মানবধর্ম শেখায়; রবীন্দ্রসংগীত মানবিকতা শেখায় ও নজরুলগীতি বিদ্রোহ ও সাম্যের কথা বলে। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা আগে মানুষ, তারপর দল বা মতের অনুসারী। একুশের চেতনা তাই আমাদের শেখায় ‘ভাষা বিভাজন নয়, সংযোগের মাধ্যম’।


বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশ আজ প্রতিবাদের যে ভাষা ব্যবহার করছে ক্রমেই তা শালীনতা হারাচ্ছে। আন্দোলনের মাঠে এখন যুক্তির চেয়ে গালি জোরালো। প্রতিবাদের চেয়ে অপমান দৃশ্যমান। প্রতিপক্ষকে পরাজিত নয়, অবমাননা করাই যেন লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। এটা কেবল তরুণদের ব্যর্থতা নয়; বরং আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।


মনে রাখতে হবে, অশ্রাভ্য ভাষা অতি দ্রুত জনদৃষ্টি আকর্ষণ করে সত্যি, কিন্তু দিনশেষে তা আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বাজে শব্দচয়ন যেহেতু ভাষাকে দুর্বল করে, তাই শিক্ষিত সমাজে এটি মোটেও কাম্য নয়। অথচ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে জনসম্মুখে বক্তব্যের মাধ্যমে তা একরকম জাতীয়করণ করা হয়েছে। এসব বক্তব্য আবার দ্রুত ভাইরাল করে একটি শ্রেণি তা সামাজিকীকরণ করার প্রয়াস চালিয়েছে। ভাইরাল সংস্কৃতি প্রতিবাদকে নাটকীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে অশ্রাব্য ভাষাকে উৎসাহিত করছে। তবে দিনশেষে তা সবই বুমেরাং হয়েছে। কারণ আমাদের সংবেদনশীল, আবেগমিশ্রিত এবং ভালোবাসার এই ‘বাংলা ভাষা’ এগুলো ধারণ করা দূরে থাক, চরম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সমসাময়িক তরুণ নেতৃত্ব, দেশী বিদেশি ইউটিউবারদের বক্তব্য ও কন্টেন্টের বিপরীতে আমরা এর বাস্তব প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করেছি।


জেন জি’র একাংশ মনে করছে শব্দবোমা এক ধরনের শক্তিধর অস্ত্র। সামাজিক মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। দ্রুত ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি কটূক্তিকে উসকে দিয়েছে। বিপদটাও ঘটেছে এখানেই। ভাষা মানবিকতা হারালে আন্দোলন নৈতিকতা হারায়। প্রতিপক্ষ শত্রু হয়ে ওঠে। সংলাপের পথ রুদ্ধ হয়। জনমনে আজ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আমরা কি অসভ্য প্রতিবাদ চাই নাকি শালীন প্রতিবাদের মাধ্যমে ‘জেন জি’ এগিয়ে নিয়ে যাব?


একুশের প্রকৃত চেতনাই হলো শালীনতা, মানবিকতা, সহনশীলতা ও সংস্কৃতিমনস্কতা। যে জাতি ভাষাকে সম্মান করতে শিখেনি, সে জাতি মানুষকেও সম্মান করবে কিভাবে? একুশ আমাদের শিখিয়েছে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি জাতির আত্মা। আজ যখন বিভাজন বাড়ছে, তখন প্রয়োজন ভাষার সৌন্দর্যে ফিরে যাওয়া। সংস্কৃতির উদারতায় ফিরে যাওয়া। একুশের মানবিকতায় ফিরে যাওয়া। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভাষা আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। ভাষাই আমাদের ঐক্য ফিরিয়ে দিতে পারে।


লেখক: প্রফেসর ড. মো. নাসির উদ্দীন মিতুল (সাবেক ডিন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com