
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় রাজনৈতিক অনুকম্পার বদলে পেশাদার কূটনীতিকদের মেধা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে কূটনৈতিক নথি নির্ধারিত সময়সীমা মেনে প্রকাশ, প্রবাসীদের সুরক্ষায় স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং দেশের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অ্যাসোসিয়েশন অব ফরমার অ্যাম্বাসেডরস অব বাংলাদেশ (এওএফএ) আয়োজিত দুই সাবেক রাষ্ট্রদূতের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তাদের বক্তব্যে এসব পরামর্শ উঠে আসে।
বক্তারা পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। তারা অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, প্রবাসীদের সুরক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাবেক কূটনীতিকদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
এওএফএ সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আল-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও বর্ষীয়ান কূটনীতিক ফারুক সোবহান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির সাবেক রেক্টর ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফী বিনতে শামস। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মোহাম্মদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান।
প্রথম পর্বে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহমুদ হাসানের স্মৃতিকথা গ্রন্থ ‘সেরেনডিপিটি ইন ডিপ্লোমেসি, বিটুইন প্রোটোকল অ্যান্ড পলিটিক্স-এ মেমোয়ার’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটির ওপর আলোচনা করেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেমায়েতউদ্দিন এবং গবেষক ও বিশ্লেষক সাজ্জাদুর রহমান। দ্বিতীয় পর্বে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম ফজলুল করিমের নতুন গবেষণাগ্রন্থ ‘ইন সার্চ অব এ রোল মডেল’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটির পরিচিতি তুলে ধরেন সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রদূত শাহেদ আখতার। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এ.এফ.এম. গাউসুল আজম সরকার ও মো. শামীম আহসান।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় অ্যাডহক সিদ্ধান্তের বদলে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন এবং সুসংগঠিত প্রোটোকল নীতি প্রণয়নের পরামর্শ দেন ফারুক সোবহান। তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করারও তাগিদ দেন। পাশাপাশি সাবেক কূটনীতিকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে স্মৃতিকথা লেখার আহ্বান জানান।
ফারুক সোবহান স্মৃতিচারণ করে বলেন, পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তাকে একই সঙ্গে ভারতের ‘র’, পাকিস্তানের আইএসআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ’র এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করে ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়েছিল। রসিকতা করে তিনি বলেন, ওই সময় তাকে চীনা এজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করতে তারা ভুলে গিয়েছিল।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তিনি এ চুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। আলোচনার সময় নির্দেশনা ছিল, ১৯৭৭ সালের চুক্তির চেয়ে নতুন চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ভালো হতে হবে। এজন্য ন্যূনতম ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানির নিশ্চয়তা ও একটি সালিশি ধারা রাখার নির্দেশনা ছিল।
তিনি জানান, চূড়ান্ত খসড়া আসার আগে তাকে আলোচনাকারী দলের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সচিব মহিউদ্দিনকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঢাকায় খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে কোনো গ্যারান্টি বা সালিশি ধারা নেই। বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হলে তিনি দিল্লি গিয়ে বিষয়টি সমাধানের কথা বলেন। দিল্লিতে ফারুক সোবহান গ্যারান্টি ও সালিশি ধারা না থাকার বিষয়টি তুললে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্র কুমার গুজরাল শেষ মুহূর্তে সমস্যা তৈরির জন্য আমলাদের দায়ী করেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে শেষ পর্যন্ত ওই দুই ধারা ছাড়াই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
কূটনীতিকদের অভিজ্ঞতার লিখিত দলিল সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে হেমায়েতউদ্দিন বলেন, মাহমুদ হাসানের বইটিতে ১৯৮৩ সালে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ন্যাম শীর্ষ সম্মেলন, কাবুলে তার কঠিন পোস্টিং, মেক্সিকো ও মিয়ানমারে দায়িত্ব পালন, মোর্শেদ খান রিপোর্ট এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নানা নেপথ্য প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ স্থান পেয়েছে। তিনি মাহমুদ হাসানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং তার ডায়েরিতে সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডার বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের মতো জটিল জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।
সাজ্জাদুর রহমান রাজনৈতিক অনুকম্পার বদলে ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের মেধা ও যোগ্যতার ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দেন। ইতিহাস সংরক্ষণ ও কৌশলগত ভুল এড়াতে আইনি সময়সীমা মেনে কূটনৈতিক নথি প্রকাশের ব্যবস্থা করার কথা বলেন। তিনি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা এবং পেশাদার কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
মাহমুদ হাসান বলেন, কূটনীতি মানে মানবিক সম্পর্ক রক্ষা করা, সঠিক সময়ে কথা বলা বা নীরব থাকা এবং জাতীয় স্বার্থকে ঊর্ধ্বে রাখা।
মো. শামীম আহসান বলেন, সংঘাত নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করাই কূটনীতিকদের মূল দায়িত্ব। তার মতে, ফজলুল করিম কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবীকে (সাঃ) দেখেছেন এবং নিজের দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বইটিতে বিশ্বশান্তি ও সহাবস্থানের পথ দেখিয়েছেন।
গাউসুল আজম সরকার বলেন, পশ্চিমে ক্রমবর্ধমান ইসলামফোবিয়া, বর্ণবাদ এবং ইসলামের অপব্যাখ্যার জবাবে ফজলুল করিম বইটি লিখেছেন।
ফজলুল করিম জানান, সৌদি আরব ও জর্ডানে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে বইটি রচনার মানসিক ভিত্তি তৈরি হয়। জ্যারেড ডায়মন্ড, অমর্ত্য সেন, জওহরলাল নেহরু ও পিটার ফ্রাঙ্কোপানের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের বক্তব্য ও চিন্তার আলোকে বইটিতে বিভিন্ন যুক্তি ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে।
বিবার্তা/মন্টি/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]