দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাতরোগ
চিকিৎসা খরচ মেটাতে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৫১
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাতরোগ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অঅ-অ+

বাংলাদেশে বাতরোগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলায় এর চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। একদিকে চিকিৎসার পেছনে ধারাবাহিক খরচ, অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের অনেক পরিবারই ‘ক্রমাগত দারিদ্র্যের’ মুখে পড়ছে। অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকির তালিকায় বাতরোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো উপেক্ষিত।


শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’-এ বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।


সম্মেলনে উপস্থাপিত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০১৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল (এমএসকে) গবেষণা অনুযায়ী দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ৩০.৪ শতাংশ বাতরোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২৪.৮ শতাংশ মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন এবং ২৪.৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময় কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।


এর আগে আঞ্চলিক কোপকর্ড (COPCORD) সার্ভেতেও ২৬.৩ শতাংশ মানুষের হাড় ও পেশির ব্যথায় ভোগার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া এশীয় জনমিতি ও আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের (IOF) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ১৬.৭ শতাংশ (প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ মানুষ) এবং ২০২৬ সাল নাগাদ ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব নারীদের ৪০ শতাংশই (প্রায় ৬৫.৬ লাখ) এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাতে তারা আরও জানান, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক ব্যাধিতে (এনসিডি) ঘটে। কিন্তু অসংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব সৃষ্টিকারী এই বাতরোগ এখনো উপেক্ষিত।


পাশাপাশি প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলজিস্টের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত।
অনুষ্ঠানে বাত ব্যাথাসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নীরা ফেরদৌস।


তিনি জানান, বাতের চিকিৎসা ব্যয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া—এই দ্বিগুণ আর্থিক বোঝা পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে বছরে ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসে ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।


দেশে বাতরোগের প্রকোপ ও করণীয় নিয়ে পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে বহু বাতের রোগী স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, যা কর্মক্ষম মানুষের কাজের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


তিনি বলেন, রোগীদের অসচেতনতা, চিকিৎসা ব্যয়ের সামর্থ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সুসংগঠিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতাই বাত রোগের সুচিকিৎসার প্রধান বাধা।


ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এই রোগকেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব জানিয়ে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা দেন। একইসঙ্গে তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, যথাসময়ে ভ্যাকসিন নেওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের প্রতি জোর দেন এবং এসব রোগীর চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান।


পিএনআরএফআর ট্রাস্টের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে এই ট্রাস্টের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫৫০ জন। ট্রাস্ট থেকে এ পর্যন্ত দুস্থ রোগীদের ওষুধ, পরীক্ষা ও স্কলারশিপ বাবদ ১ কোটি টাকারও বেশি মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রোগীদের সুবিধার্থে ‘সাপোর্ট সেন্টার বুথ’ স্থাপন এবং বিশেষ ‘সার্ভিস কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া ভবিষ্যতে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রিউমাটোলজি ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথাও ব্যক্ত করেন এই বাতরোগ বিশেষজ্ঞ।


দিনব্যাপী রোগী সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের (বিএমইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের কাউন্সিলর ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হোসেন, বিসিবির মেডিকেল কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম, মেজর জেনারেল কাজী ইফতেখার-উল-আলম, পিএনআরএফআর-এর সেক্রটারি জেনারেল ড. পিযুষ কান্তি বিশ্বাস, অতিরিক্ত সচিব মো. আমিনুর ইসলাম, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জেলা ও দায়রা জজ ড. আমিনুল ইসলাম, পিএনআরএফআরের সাবেক কোষাধ্যক্ষ আব্দুস সোবহান প্রমুখ।


অনুষ্ঠানে পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ডেপুটি সেক্রেটারি ডা. বর্ষা ইসলাম, বোরহান উদ্দিন, মো. এনামুল করিম, সামিউল হক, জোবায়ের আহমেদ, মো. নূরুল ইসলাম খোকন, এম এফ ইসলাম মিলন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


সারাদেশ থেকে আট শতাধিক বাত ব্যথার রোগী এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com