
বহুল আলোচিত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তিন শিক্ষককে কারাদণ্ড দেয়ায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের দপ্তর সম্পাদক প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আজ (৯ এপ্রিল) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আপামর সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলাম এই রায়ের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ গভীর দুঃখ এবং হতাশার সাথে লক্ষ্য করলাম যে, আজ আবারও শিক্ষাঙ্গণ ক্ষতবিক্ষত করা হলো।
আমরা শিক্ষক, ছাত্ররা আমাদের সন্তানের মতো। বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় পা রাখা সেই তরুণ শুধু আমাদের সন্তানই নয়, আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ এবং উত্তরাধিকারী। সন্তানের অকালপ্রয়াণে আমরা শোকাহত। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার তাদের পরিবারের সদস্যকে হারানোর শোক সহ্য করে রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় ছিল। আজ আমরা গভীর হতাশার সাথে লক্ষ্য করলাম যে আমাদের সন্তান হত্যার বিচার হয়েছে বটে, কিন্তু ন্যায়বিচার কি হয়েছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ছাত্র সুরক্ষা, প্রশাসনিক এবং অ্যাকাডেমিক বিষয়াদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের প্রচেষ্টা থাকে বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার। কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য যদি কাউকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে হয় তাহলে তা অনভিপ্রেত এবং দুঃখজনক।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. মো. হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডলকে ১০ বছর ও বেরোবি'র সাবেক প্রক্টর ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলামকে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।
উল্লেখ্য যে, আবু সাঈদ হত্যার ঘটনাস্থল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখতিয়ারের বাইরে ঘটনাটি সংঘটিত হয়। তাই এই রায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা শিক্ষকবৃন্দের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু ছিল তা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। শুধু তাই নয়, অভিযুক্ত শিক্ষকবৃন্দের বাসা, অফিস এবং পরিবারের উপর হামলা এবং এর প্রতিকার না করাও রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতারই উদাহরণ। এই পুরো ঘটনায় শিক্ষকবৃন্দ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার এবং মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
২০১০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের (গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার) জন্য সক্রিয় করা হয়। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালকে সংশোধন করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে গণ্য করে এই ট্রাইব্যুনালে বিচার করার বিষয়টি এখনও বিতর্কিত। শুধু তাই নয়, এই মামলার সাক্ষ্যের বৈধতা নিয়েও জাতীয় দৈনিকে বিভিন্ন সংবাদ এসেছে (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৮/৪/২০২৬)। আবু সাঈদ হত্যা মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অস্বচ্ছ ও প্রহসনমূলক এবং এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ আমাদের সন্তান আবু সাঈদসহ সকল বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের জন্য সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। আরও প্রত্যাশা করে রাষ্ট্র যেন প্রতিহিংসাপরায়ণতা নয়, ন্যায়পরায়ণতা সকলের জন্য নিশ্চিত করে। সেই সাথে সরকারের কাছে আহ্বান জানায় যে, স্বচ্ছ, বৈধ এবং নিরপেক্ষভাবে এই ঘটনার বিচার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দের উপর যে হয়রানি এবং নির্যাতন চালানো হচ্ছে তার অবিলম্বে প্রতিকার নিশ্চিত করুক।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর সকল প্রকার দমন-পীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সকল প্রকার অমানবিক হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]