শিক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তীব্র প্রতিবাদ
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত
প্রকাশ : ৩০ মে ২০২৬, ১৫:৪২
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কর্তৃক “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা” করে প্রদত্ত বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। একইসঙ্গে এ বক্তব্যকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে।


শনিবার (৩০ মে) শিক্ষক সমিতি থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তিনি নিজের জ্ঞানের দৈন্যতা, বুদ্ধির জড়তা এবং সংকীর্ণ ও কূপমণ্ডূক মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।


বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে শতবর্ষ যাবৎ অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে চলেছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন এশিয়া র‌্যাংকিং অনুযায়ী এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে রয়েছে ৫৬টি বিশেষায়িত এবং সক্রিয় গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র। এছাড়া প্রতিটি বিভাগের রয়েছে বিশেষায়িত বহু গবেষণাগার, যা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছে।


শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে যেমন একদিকে এ সকল গবেষণা কেন্দ্র, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও ব্যুরো ক্রিয়াশীল রয়েছে, তেমনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও গবেষকবৃন্দ বিশ্বের শীর্ষ র‌্যাংকিংপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বিশ্বের নামকরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপ্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশ করছেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু মাত্র শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র নয়; বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশে নেতৃত্বদানকারী প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণ অনন্য ভূমিকা পালন করেন। এ দেশের সকল সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।


সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত অত্যন্ত স্বল্প বাজেট নিয়ে ৩০–৪০ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকবৃন্দ শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে যেমন আগ্রহী করে গড়ে তুলছেন, ঠিক তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন একটি প্রগতিশীল ও আধুনিক প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।


স্বল্প বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং ভৌত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণের কোনো একক মানদণ্ড নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বোচ্চ বাজেট প্রদানে ব্যর্থতা সরকারের; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের নয়। সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত স্বল্প বাজেট, স্বল্প বেতন কাঠামো, অপ্রতুল গবেষণা বরাদ্দ এবং সীমিত ভৌত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজও যে মেধার চর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং উদ্ভাবন, দক্ষতা ও উৎকর্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।


শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শুধুমাত্র বিবেচনাহীন ও অপরিণামদর্শী নয়; সেটি যুগপৎভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যাবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি তাঁর এ বক্তব্যকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ধ্বংসের একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত বলে মনে করে।


শিক্ষা কোনো পণ্য বা বাণিজ্য নয়; এটি সকলের অধিকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণে প্রত্যাশিত গবেষণা, উদ্ভাবন, সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক জাগরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য প্রত্যাহার এবং জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার জোর দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যকারী ব্যক্তিকে দেশের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদ থেকে অপসারণের আহ্বান জানাচ্ছে।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com