জাতীয় শিক্ষা দিবস এবং ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৮:২৮
জাতীয় শিক্ষা দিবস এবং ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা
মেহেদী কাউসার ফরাজী
মেহেদী কাউসার ফরাজী
প্রিন্ট অ-অ+

১৭ সেপ্টেম্বর, জাতীয় শিক্ষা দিবস। বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন এই দিবসটি পালন করলেও দিনটি বাংলাদেশের অন্যান্য দিবসের মতো গণমানুষের মাঝে ততটা পরিচিত নয়। অথচ বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের আকাশে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একটি আলোকোজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, একটি পরাধীন জাতির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ও সফলতার নাম।


কী ঘটেছিলো সেদিন? কেনই বা ১৭ সেপ্টেম্বর আমাদের শিক্ষা দিবস? আমাদের বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু জানে এ সম্পর্কে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি আদৌ এ দিবসটি সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ানো হয়? কিংবা আমাদের নবীন শিক্ষকবৃন্দই বা কতটুকু ওয়াকিফহাল?


এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রায় ছয় দশক পূর্বে, যখন বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ব-দ্বীপটি ছিলো পরাধীন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকের শোষণ-বঞ্চনার কবলে পড়ে আমাদের জাতীয় জীবন হয়ে উঠেছিলো দুর্বিষহ। মহান ভাষা আন্দোলনের ধাক্কা কাটিয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতিসত্বার টুঁটি চেপে ধরতে সর্বাত্মক শক্তিতে লিপ্ত হয়েছিলো। বাঙালির রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার খর্ব করে দেশজুড়ে চালাচ্ছিলো ভয়ংকর স্বৈরাচারী সামরিক শাসন।


সেই ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষায়ও করায়ত্ব করার মাধ্যমে শোষণের লক্ষ্যে ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী আয়ূব খান একটি নীলনকশার শিক্ষা কমিশন গঠন করে। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ও তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষাসচিব ড. এস এম শরীফের সভাপতিত্বে ১০ সদস্যবিশিষ্ট এই কুখ্যাত কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তাদের রিপোর্ট পেশ করে। দীর্ঘদিন পর ১৯৬২ সালে চূড়ান্ত রিপোর্ট ছাপিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়।


সম্পূর্ণ গণবিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের এই রিপোর্টের অনেক সুপারিশ বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূলে আঘাত হেনেছিল। রিপোর্টের মূল কয়েকটি সুপারিশ ও অভিমতের মধ্যে ছিল-


· শিক্ষা নাগরিকের জন্মগত অধিকার নয়। শিক্ষা একটি উত্তম ব্যয়বহুল বিনিয়োগ।


· অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অবাস্তব এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।


· ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক।


· ডিগ্রি কোর্স হবে তিন বছর মেয়াদি।


· সমগ্র পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বোধগম্যতার জন্য উর্দুকে জনগণের ভাষায় পরিণত করা। কোরআনের ভাষা আরবি লিপিতে উর্দুর মতো বাংলাও লেখা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশে বলা হয়, বাংলা ও উর্দু লিপি সংস্কার করে রোমান হরফে বাংলা এবং উর্দু লেখা।


এছাড়াও ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত এই রিপোর্টে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, প্রশাসন, অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এতে আইয়ুব খানের ধর্মান্ধ, পুঁজিবাদী, রক্ষণশীল, সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাসংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করে এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে।


শরীফ কমিশনের শিক্ষাসংকোচন নীতিকাঠামোতে শিক্ষাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয় - প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর। ৫ বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও ৩ বছরে উচ্চতর ডিগ্রী কোর্স এবং ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়। উচ্চশিক্ষা ধনিকশ্রেণীর জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এজন্য পাস নম্বর ধরা হয় শতকরা ৫০ দ্বিতীয় বিভাগ শতকরা ৬০ এবং প্রথম বিভাগ শতকরা ৭০ নম্বর। এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্বশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ম নজর রাখার প্রস্তাব করে। শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রম করানোর জন্য ১৫ ঘন্টা কাজের বিধান রাখা হয়েছিল।


রিপোর্টে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে বণর্না করে বলা হয়, ''শিক্ষা সম্পর্কে জনসাধারণের চিরাচরিত ধারণা অবশ্যই বদলাতে হবে। সস্তায় শিক্ষা লাভ করা যায় বলিয়া তাহাদের যে ভুল ধারণা রয়েছ, তা শীঘ্রই ত্যাগ করিতে হবে। যেমন দাম তেমন জিনিস – এই অর্থনৈতিক সত্যকে অন্যান্য ব্যাপারে যেমন শিক্ষার ব্যাপারেও তেমনি এড়ানো দুষ্কর''।


এ রিপোর্টে সাম্প্রদায়িক চেতনা, জাতীয় স্বার্থবিরোধী, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষাই শিক্ষার লক্ষ্য তা রিপোর্টের অংশে স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।


কলঙ্কিত সেই রিপোর্টে গণমানুষের শিক্ষার অধিকার চূড়ান্তভাবে খর্ব করা হয়। এসব সুপারিশ প্রদানের মাধ্যমে কুখ্যাত শরীফ কমিশন তথা পশ্চিমা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা চেয়েছিলো তৎকালীন পূর্ব বাংলার সদ্যজাগ্রত অগ্রসরমান ছাত্রসমাজকে দাবিয়ে রাখতে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শরীফ কমিশনের অনেকগুলো সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য হলেও তৎকালীন শিক্ষায় অনগ্রসর পূর্ব বাংলায় তাদের সেই নীলনকশার রিপোর্ট বহাল থাকলে পূর্ব বাংলার সাধারণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জন ও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য নিজেদেরকে যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা দুঃস্বপ্নে পরিণত হতো।


শরীফ কমিশনের এসব গণবিরোধী এবং চরম প্রতিক্রিয়াশীল সুপারিশ বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের মধ্যে তীব্র ঘৃণার সঞ্চার করে। ছাত্রসমাজ শরীফ কমিশন বাতিলের দাবি উত্থাপন করলে তা সামগ্রিকভাবে জনগণের বিপুল সমর্থন পায়। আইয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে ছাত্ররা একুশে উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালন করার মাধ্যমে সরকারের সাম্প্রদায়িক ও বাঙালি-বিরোধী মনোভাবকে অগ্রাহ্য করে।


ইতোপূর্বে ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিংহ ও খোকা রায়ের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে আইয়ুব খাঁর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসেই আন্দোলনের সূচনার পরিকল্পনা করেন তারা। কিন্তু ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কর্ণধার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে গ্রেফতার করা হয়। সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি ও চার বছরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলনের সূচনা করে। ছাত্রলীগের ডাকে ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়।


২ ফেব্রুয়ারি রাজপথে ছাত্রদের মিছিল সামরিক আইন ভঙ্গ করে। ৪-৫ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র প্রতিবাদ সমবেশে উপস্থিত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে সুসজ্জিত একটি মিছিল নাজিমুদ্দিন রোড দিয়ে পুরান ঢাকায় প্রবেশ করে। এই মিছিলকে প্রতিহত করার জন্য সরকার পুলিশের সাথে সেনাবাহিনী নিয়োগ করে এবং কার্জন হলের মোড়ে ফিল্ড কামান বসানো হয়। ওই দিন আইয়ুব খানের ছবি পোড়ানো হয়।


৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পর ছাত্ররা হল ত্যাগ করছে না দেখে পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদের জোর করে বের করে দেয়। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে পুলিশবেষ্টনির মাঝে আটকা পরেছিল আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। এদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা আগেই জারি হয়েছিল। যা বহুদিন পর্যন্ত বহাল ছিল। এভাবে সারা দেশে আইয়ুব বিরোধী, শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর কেন্দ্রীয়ভাবে আন্দোলন চাঙ্গা হতে থাকে।


১৯৬২ সালের ৮ জুন পাকিস্তানে ৪৪ মাস স্থায়ী সামরিক আইন প্রত্যাহার হয়। বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও একটি সংবিধান জারি, পরোক্ষ ভোটে (ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের ভোটে) জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে আইউব খানের বেসামরিক শাসন সুদৃঢ় করা হয়। ১৯৬২ সালের ২৫ জুন এক বিবৃতিতে আইয়ুব ঘোষিত শাসনব্যবস্থা প্রত্যাখান করে নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দাবি জানিয়ে নেতৃবৃন্দ সারাদেশে জনসভা করেন। যাতে জনমনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। ৬২’র দ্বিতীয়ার্ধে সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন আবার বেগবান হয়ে ওঠে।প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ১০ আগস্ট ঢাকা কলেজের ক্যান্টিনে বিভিন্ন কলেজ প্রতিনিধিদের নিয়ে একসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট ও ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।


প্রথমে কলেজ-ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৫ আগস্ট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্র সমাবেশের ভেতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে।বরাবরের মতোই সেই দুঃস্বপ্নের সময়ে বাংলার দিশেহারা লাখো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের সারথি হয়ে রাজপথে নামে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনটিইতোপূর্বে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে সফলতা অর্জন করে গণমানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়। ফলে, কুখ্যাত শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রলীগ হয়ে উঠে ছাত্র-জনতার দুর্দিনের কান্ডারী।ছাত্রলীগ ও অন্যান্য বামপন্থীছাত্রনেতৃবৃন্দ আন্দোলনের বিস্তৃতি এবং তীব্রতা উপলব্ধি করে এই আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে আনার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছান। এবার তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’।


সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। পূর্ব বাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ কর্মসূচী চলতে থাকে। আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবিত তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স এবং উচ্চ মাধ্যমিক ইংরেজির অতিরিক্ত বোঝা বাতিল করার বিষয়টি।


একের পর এক ধর্মঘট সমাবেশের কর্মসূচি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, তেমনি ক্রমেই এই আন্দোলনের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, আন্দোলনটিকে ‘গণ-আন্দোলনে’ রূপান্তরিত করে। ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি বাতিল করে। তবে তার পরিবর্তে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।১০ সেপ্টেম্বর সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। সরকারের প্রত্যাশা ছিল সোহরাওয়ার্দী মুক্ত হলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এই আশা-দুরাশায় পরিণত হয়।


১৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে অভূতপূর্ব হরতাল ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। রাজপথে নেমে আসে রাজধানী ঢাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার মানুষ সমাবেশে উপস্থিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল বের হয়ে যায়। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে এ গুজব শুনে মিছিল দ্রুত নবাবপুরের দিকে ধাবিত হয়। হাইকোর্টে পুলিশের সাথে সংঘাতে না গিয়ে মিছিল আব্দুল গনি রোড ধরে যেতে থাকে। পুলিশ তখন পিছন থেকে মিছিলে হামলা চালায়। লাঠি চার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ও গুলি চালায়। পুলিশের সাথে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ বাঁধে ঢাকা কোর্টের সামনে। এখানেও পুলিশ ও ইপিআর গুলি চালায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন বাবুল এবং বাস কন্ডাক্টর মোস্তফা। গৃহভৃত্য ওয়াজিউল্লাহ গুরুতর আহত হয় এবং তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যত ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রধান হয়ে ওঠে।ওই দিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে মিছিলের উপর পুলিশ হামলা চালায়। টঙ্গিতে ছাত্র-শ্রমিক মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে সুন্দর আলী নামে এক শ্রমিককে।


১৭ সেপ্টেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্রসমাজ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়। ছাত্রসমাজ ও আন্দোলনকারী জনগণের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর গোলাম ফারুকের সাথে আলোচনায় বসেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম পল্টন ময়দানে জনসভা আহ্বান করে। ঐ জনসভা থেকে সরকারের প্রতি ‘চরমপত্র’ দেওয়া হয়।


ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে গভর্নর গোলাম ফারুকের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ছাত্রসমাজের এই ‘চরমপত্র’ দেওয়ার তিন দিন পর, সরকার শরীফ কমিশন রিপোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে। ডিগ্রি কোর্সের ছাত্রদের, যাদের দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল এবং তৃতীয় বর্ষে উঠেছিল তাদের বিনা পরীক্ষায় সবাইকে পাস ঘোষণা করা হয়। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মুক্তি দেওয়া হয়।


অবশেষে বিজয়ের ভেতর দিয়ে বাষট্টির গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৬৩ সাল থেকে ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রতিবছর ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ফি-বছর ১৭ সেপ্টেম্বর আজও বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।


বাষট্টির সেই অগ্নিঝরা রাজপথের সংগ্রামী অগ্রযাত্রা অব্যহত রেখে ছেষট্টির ছয়দফা, ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান ও সত্তুরের নির্বাচন ইত্যাদি ধারাবাহিক আন্দোলন পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ স্বমহিমায় ভাস্বর। বাংলার ছাত্রসমাজের প্রাণের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বার বার।


অথচ, মিডিয়া সন্ত্রাসীরা ষড়যন্ত্র করে অনুপ্রবেশকারী দুষ্কৃতিকারীদের অপকর্মের দায়ভার ছাত্রলীগের ঘাড়ে চাপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজকে হেয় প্রতিপন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টায় লিপ্ত ছিলো। এসব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেবর্তমানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র দিকনির্দেশনায় এবং নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী’র নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশে দেশজুড়ে ছাত্রলীগের ইতিবাচক কাজের জোয়ার দেখে সেসব মিডিয়াও আজ ছাত্রলীগের ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশন করছে। এতে একদিকে মেধাবী ছাত্রলীগ কর্মীরা ইতিবাচক কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।


অন্যদিকে, অনুপ্রবেশকারীরা গা ঢাকা দিচ্ছে। দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনে মেধাবী রাজনীতিবিমুখ শিক্ষার্থীরা দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে, নতুন প্রজন্মের মেধাবী ও দক্ষ নেতৃত্ব তৈরীর সুযোগ তৈরী হয়েছে।


বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী পরিবারের সন্তান নয় এবং অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত নয় -এমন কাউকে তাঁর হাতে নেতা বানাবেন না। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী আগে থেকেই ইতিবাচক ও মানবিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন। তিনি বহুবার গণমাধ্যমের কাছে ছাত্রলীগ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা বলেছেন, ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে তিনি ছাত্রলীগকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, যেন অভিভাবকরা গর্বভরে বলতে পারেন তাদের সন্তান ছাত্রলীগ করে।


আমরা, যারা নতুন প্রজন্মের ছাত্রলীগ কর্মী -তারাও ছাত্রলীগকে সর্বদা ইতিবাচক অবস্থানে দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ব্যানারে দেশ ও জাতির কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও জননেত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে কাজ করার সুযোগ চাই আমরা।


গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের ধারক-বাহক হিসেবে ইতিবাচক ও শুভ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষা-শান্তি-প্রগতির মশাল হাতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক চিরকাল।


জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।


লেখক: শিক্ষার্থী, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারত শাখা ছাত্রলীগ নেতা।


বিবার্তা/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com