এখনই কেন এবং কাদের কোটা সংষ্কার প্রয়োজন!
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৮, ১৭:০৭
এখনই কেন এবং কাদের কোটা সংষ্কার প্রয়োজন!
খন্দকার হাবীব আহসান
প্রিন্ট অ-অ+

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাগরিক স্বীয় ক্ষমতা বলে যতটা সুবিধা ভোগ করেন তা একদিকে নাগরিকের অবশ্য প্রাপ্য, অন্যদিকে ভোগ্য সম্পদ সৃষ্টিও নাগরিকের কর্তব্য।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা নাগরিকের থাকায় কর্তব্য শুধু রাষ্ট্রের আছে-নাগরিকের নেই এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে নাগরিকের চাহিদার প্রাচুর্যতার তুলনায় প্রাপ্তির স্বল্পতা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সম্পদের স্বল্পতার এই দায় রাষ্ট্রের নয়, জনগণের। উন্নত রাষ্ট্রগুলো সেই রাষ্ট্র নিজে উন্নত তৈরি হয়েছে তা নয়, জনগণই তৈরি করেছে রাষ্ট্রকে উন্নতরুপে। সেখানে বেকারত্বের দায় যতটা না রাষ্ট্রের তার চেয়ে বেশি ব্যক্তির।


উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে নিজেদের অধিকার প্রাপ্তির চাহিদাগুলো উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিকের মতো করলেও, রাষ্ট্রের জন্য নিজের কর্তব্যের কথা ভাবনার বাইরে রেখেই মানসিকতায় মধ্যযুগের বর্বরতা-সাম্প্রদায়িকতা লালন করলে, ওই সকল নাগরিক কোনো রাষ্ট্রের জন্যই সম্পদ নয় বোঝা।


অনুন্নত বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে নাগরিকের এ ধরনের একগুঁয়ে চাহিদার অধিকাংশই ব্যক্তি চাহিদা নয় বৃহৎ রাজনৈতিক চাহিদা যা রাষ্ট্র ক্ষমতাকেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংষ্কার আন্দোলন হলো এমন কয়েকটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল কর্তৃক মদদকৃত, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন। যার নেতৃত্বে তাদের এজেন্টরা। আন্দোলনকারীরা যে মানসিকতায় মধ্যযুগীয় বর্বরতা-সাম্প্রদায়িকতা লালনকারী তা প্রথমেই প্রমাণ দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বাসভবন ভাংচুর-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার সরঞ্জাম ভাংচুর করে।


আমদের উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আধিক্য ও সরকারি চাকরির স্বল্পতার দরুণ সৃষ্ট বেকারদের আবেগ কাজে লাগিয়ে আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছে কিছু সাধরণ শিক্ষার্থীকে। যেখানে বেকারত্বের আবেগ থাকা ইতিবাচক কিছু নয় বরং সেই নাগরিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিও তার একটি উল্লেখযোগ্য ও উন্নতির পথ হতে পারে।


কোটা সংষ্কার আন্দোলন শুরু হওয়া, আন্দোলন চাঙ্গা করা, কমিটি দেয়া, গুজব ছড়ানো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বাসভবন ভাংচুর-চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রার সরঞ্জাম ভাংচুর, মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা, আন্দোলনের কথিত নেতৃবৃন্দ কর্তৃক আন্দোলন ক্রমাগত চলমান রাখার প্রচেষ্টা, নেতৃত্বে থাকা সে সকল শিক্ষার্থীদের জামাত-বিএনপি বা শিবির-ছাত্রদল অবশেষে বামদলগুলোর সাথে যোগসাজশ উন্মোচিত হওয়া, ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থী কর্তৃক কোটা সংষ্কার আন্দোলনকারীরা প্রতিহত হওয়া - এসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, কোটা সংষ্কারই কি আমাদের একমাত্র চাহিদা যা রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই মুহূর্তেই আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে? পরে আর কখনও সুযোগ নাই? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকুক কিন্তু এতটা ব্যস্ততা কিসের এবং কাদের? যেখানে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই কোটা ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়ে কথা বলেছেন এবং এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য মন্ত্রী পরিষদ সচিবকে আহবায়ক করে কমিটি দিয়ে ১৫ কার্যদিবস সময়ও বেধে দিয়েছেন।


এখন ভাবতে হচ্ছে অধিকার আদায়ের এই চাহিদার শুরুটা কোথায়? কাদের হাত ধরে শুরুটা হয়েছে? বর্তমানে এই চাহিদা কাদের?


এই সকল প্রশ্ন কারও আজানা থাকার কথা না। কোটা সংষ্কার আন্দোলন সর্বপ্রথম শিবিরের হাত ধরে শুরু হয়েছিলো এবং বর্তমানে এই আন্দোলন যারা চালাতে চাচ্ছে তাদের সাথে শিবিরসহ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা সংগঠনগুলোরও যোগসাজশ মিলেছে। সঙ্গত কারণে আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না কোটা সংষ্কারই কেন একমাত্র চাহিদা যা রাষ্ট্রের কাছ থেকে এখনই বুঝে নিতে তারা এতটা উদগ্রীব। কারণ, নির্বাচনকে সামনে রেখে জামাতের মত সাম্প্রদায়িক-মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী দলের সহিংসতা-বিশৃঙ্খলা করার একমাত্র পথ বেকারদের এই আবেগ, যার সুফল ভোগের চক্রান্তে লিপ্ত বিএনপির ও কয়েকটি বাম ঘরনার রাজনৈতিক দল।


সরকারি চাকরিতে কোটা সংষ্কার আন্দোলনে মূল বিষয় দেখানো হয়েছে বিসিএসের বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা কমিয়ে আনা। সেক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে নানা বিদ্রুপও করেছে তারা। অবিরত অবমাননা করেছে বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধকে। কিন্তু বাস্তবতায় কোটা কমিয়ে শূণ্যতে আনলেও প্রতি বিসিএসে কতজন বেশি সুযোগ পাবেন এবং সেই সংখ্যাকে আন্দোলনকারীদের সাথে তুলনা করলে কত ভাগ দাঁড়ায় ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। আর এমনটাও বাস্তবতা না যে দেশে বিসিএসই একমাত্র মাধ্যম যা দিয়ে সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বেসরকারি চাকুরি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিল্পী, কৃষক, শ্রমিকসহ আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমেই মানুষ জীবীকা নির্বাহ করছে, সেখানে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এতটাই বৃহৎ কিছু কি! বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সমাধান একমাত্র এটি হওয়া বাস্তবতায় অসম্ভব।


কোটা সংষ্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের মুখোশ ইতিমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে।জনগণ জেনেছে তারা সম্মিলিতভাবে জামাত-বিএনপি-বাম দলের এজেন্ট। আর আন্দোলনের গিয়ে ধোঁকা খেয়েছিলো কিছু শিক্ষার্থী যাদেরকে মূলত ব্যবহার করেছে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছেলেগুলো। এখন সাধারণ শিক্ষার্থী কর্তৃক কোটা সংষ্কার আন্দোলনকারীরা বিতাড়িত। কিন্তু সকলের প্রয়োজনীয়তা আছে এই আন্দোলন থেকে কিছু শিক্ষা নেয়ার। এদেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করে বারবার অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা করে ফায়দা নিতে চায় মূলত স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক মহলগুলো। সেক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করে কোনো একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মহলের আবেগ বা ধর্মীয় অনুভূতি।এই কোটা সংষ্কার আন্দোলনকে এখনও যারা বৈধতা দিতে চায় বিভিন্ন যুক্তিতে তারা কারা এবং কেন এ বৈধতা দিতে চায় তা সকলের কাছে সুস্পষ্ট।


লেখক : ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com