স্মৃতিতে টেক্সটাইল ইন্ডিয়া ২০১৭
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৮, ১৬:২৯
স্মৃতিতে টেক্সটাইল ইন্ডিয়া ২০১৭
শামীমা দোলা
প্রিন্ট অ-অ+

“ভারত কি ইতিহাস মে আগার কিসি এক ইন্ডাস্ট্রি কো মাহাত্ম্য হ্যায় সদিয়ো সে রাহা হ্যায় তো ও হ্যায় টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি। হাজার বরস পূর্ব আগার হাম হামারে পূরাণে শাস্ত্র কো দেখে তো ভারত কে শাস্ত্র মে বস্ত্রকো মাহিলা কা জিকর হোতা রাহা হ্যায়।"


টেক্সটাইল ইন্ডিয়া-২০১৭ এর উদ্বোধনী বক্তৃতায় এভাবেই টেক্সটাইল-বন্দনা করছিলেন ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী। দেড় শ' কোটি লোকের দেশ ভারতের ইতিহাস ও অর্থনীতিতে টেক্সটাইল খাতের অবদানের কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি।


ভারতের গুজরাট প্রদেশের আহমেদাবাদের গান্ধীনগরে মহাত্মা মন্দিরে আয়োজন করা হয় এই টেক্সটাইল এক্সপো'র।


প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর বক্তব্যে বলছিলেন, ''টেক্সটাইল শুধু টেক্সটাইল নয় , এটি ভারতের সংস্কৃতি। প্রতিটি রাষ্ট্রে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন টেক্সটাইল...'' বলেই অনর্গল নাম বলে যাচ্ছিলেন বাংলা প্রসিদ্ধ মসলিনের জন্যে, কাঞ্জিভরম... কোন প্রদেশ কোন টেক্সটাইলের জন্যে খ্যাত। আমি মুগ্ধ,অভিভূত। আমার মতো অভিভূত এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া প্রতিটি মানুষ। তন্ময় হয়ে সবাই শুনছিলেন এই ভারতপতির বক্তব্য।



২০১৭ সালের রোজার ঈদের পরদিনই টেক্সটাইল ইন্ডিয়া-২০১৭এর নিউজ কাভার করতে রওনা হয়েছিলাম ভারতের গুজরাট প্রদেশের আহমেদাবাদের উদ্দেশ্যে। এই সেই গুজরাট, যেখানে ২০০২ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ভারতের আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার ভূমিকার জন্যে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। তখনকার আঞ্চলিক বিজেপি নেতা মোদীই ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে একবারেই অন্য চেহারা।


এই টেক্সটাইল এক্সপো কাভারেজে তাই আমার বাড়তি আগ্রহ ছিল। নরেন্দ্র মোদীর বাগ্মিতার কথা আগে অনেক শুনেছি। টেলিভিশনের পর্দায় তার বক্তৃতা শুনেছি। আজ শুনতে বসেছি একেবারে সামনে বসে।


২৯ জুন আহমেদাবাদ পৌছেছিলাম বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের প্রতিনিধিদের সাথে। বিকেএমইএ, বিজেএমইএ, বিটিএ’র প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন এই এক্সপোতে নিজেদের পণ্য প্রদর্শন করতে। ৩০ জুন উদ্বোধন মহাত্মা মন্দিরে। বাংলাদেশের একাত্তর টেলিভিশন থেকে আমরা দুজন (আমি আর ক্যামেরাপারসন) সাংবাদিক এসেছি। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) আমাদের যাবতীয় খরচ বহন করে নিয়ে এসেছে নিউজ কাভারেজের জন্যে। তবে বিকেএমইএ থেকে যারা কোঅর্ডিনেশনের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তারা তেমন দক্ষ না হবার ফলে বেশ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছিল আমাদের সবার। যেমন, আমাদের মেলায় অংশ নেবার এক্রেডিটেশন কার্ড পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। উপরন্তু তারা জানেনই না উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কোথায় হবে।


যাহোক, অনেক কষ্টে আমরা মূল উদ্বোধনী জায়গায় পৌছাতে পারলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, বিদেশী সংবাদকর্মী হিসেবে আমাদের ক্যামেরা ইউনিটের অনুমতি ছিল না। গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের বিদেশী সাংবাদিকদের জন্যে বিশেষ গেট অর্থাৎ ছয় নাম্বার গেট দিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু আমি তো জানি ছয় নাম্বার গেট দিয়ে গেলে আমরা অনুমতিপত্র দেখাতে পারব না। আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে নিরাপত্তা কর্মকর্তার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরে বললাম, “উই আর ফ্রম একাত্তর।'‘ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ''একাত্তর'' বলতে কী বুঝলেন কে জানে, তবে আমি বুঝতে পেলাম, ভদ্রলোক আমার গলার টোন শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়েছেন । তাতেই তড়িঘড়ি করে বললেন, ওকে ওকে, ইউ মে গো।


বিকেল ৩টায় শুরু হলো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মেলা প্রাঙ্গন ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ঘিয়ে রঙ্গের পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামায় একেবারে সাদাসিধে গেটআপে তাঁকে দারুণ দেখাচ্ছে।


এই এক্সপোতে ১০৬ দেশ থেকে আড়াই হাজার বিদেশী ক্রেতা আর প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। বিশ্বখ্যাত অনেক ব্র্যান্ড অংশ নিয়েছে মেলায়। ভারতের ১৫ শ' উদ্যেক্তা তাদের পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন।


মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে মূল মঞ্চের দিকে এগোলেন নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী। নমস্কার জানাতে জানাতে মঞ্চে উঠলেন তিনি। মঞ্চে ছিলেন ভারতের টেক্সটাইল মন্ত্রী ,ভারতীয় টেলিভিশন সিরিয়ালে একসময়ে অসম্ভব জনপ্রিয় অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানী, ছিলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলী, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানী, বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড পোলোর কর্ণধার, ভারতীয় সিমেন্ট কম্পানি বিড়লা গ্রুপের কর্ণধারসহ প্রথিতযশা লোকজন।



উদ্বোধনী অনুষ্ঠানিকতা শেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আমার মতো অনেকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারতপতি শুরু করলেন তার বক্তব্য। বললেন, ''ভারতের ইতিহাসে টেক্সটাইল, ভারতের সংস্কৃতিতে টেক্সটাইল। একেকটি রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন টেক্সটাইল।'' একে একে সব টেক্সটাইলের নাম বলতে লাগলেন। কোথায় কোন টেক্সটাইল, কোন সুতা, কোন কাঁচামাল পাওয়া যায় সব বলে গেলেন অনর্গল। বললেন প্রাচীণকাল থেকেই টেক্সটাইল ইতিহাসকে প্রভাবিত করে আসছে। ভারতের টেক্সটাইল যুগ যুগ ধরে যেন চলার চিহ্ন ফেলে পথ চলেছে, যে পথ দিয়ে বিদেশে রপ্তানী হয়েছে সেই পথের নামও হয়েছে তার নামে - সিল্ক রুট।


মোদী তার দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিলেন। পরিকল্পনা জানালেন কতদূর যেতে চান। তার উন্নয়নমন্ত্র অনেক সহজ আর সাবলীর ভাষায় বলে গেলেন। কিছু অত্যুক্তি মনে হচ্ছে না। ওই বছরের জুলাই থেকে ভারতের সকল প্রদেশে ২৮% অভিন্ন কর জিএসটি চালু হবে সেকথাও বললেন। বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের টেক্সটাইল খাতকে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে নেবার প্রত্যয় ঘোষণা করলেন। ভারতের রপ্তানী আয় ৮৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানী আয়কে আট বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৫ সালেই ১৬০ বিলিয়নে নিতে চান মোদী।


মোদীর ভাষণ শুনে আমার মনেই হয়েছে এটি সম্ভব, খুবই সম্ভব। এমন ভিশনারী নেতার পক্ষে অসম্ভব না। হিন্দি ও ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলছিলেন। কখনও সিরিয়াস মুডে, আবার সেখান থেকেই আবার হাস্যরসে চলে যা্চ্ছেন খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে। মোদীর বাচন যেমন খুব সহজ তেমনি আবার পরিমিত। ঠিক জানেন কতটুকু যেতে হবে আর কোথায় থামতে হবে।


তিনি বললেন, কৃষির পরেই ভারতে টেক্সটাইল খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়। এ খাতে কেউ ১০০ লোককে ১৫০ দিন বেতন দেয় তাকে দেয়া হবে করছাড়। আবার টেক্সটাইল খাতে খণ্ডকালীন শ্রমিকদের দেয়া হবে স্থায়ী শ্রমিকের সুবিধা । সেক্ষেত্রে সরকার কম্পানির মালিককে প্রণোদনা দেবে।


আমি বিস্মিত তার বক্তব্যে। এই মানুষটি নাকি তার প্রথম জীবনে চা বিক্রেতা ছিলেন। কী পরিমাণ গ্রুমিং হয়েছে তার, ভেবেই আমি দিশেহারা। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগের আহবান জানালেন। ইজ অফ ডুইং বিজনেস-এর জন্যে মোদী আড়াই বছরে সাত হাজার আইনী সংস্কারের করার কথা জানালেন। বললেন, এমনও এক এক দিন গেছে আমি একদিনে একের অধিক আইন বাতিল করে দিয়েছি।


ক্রমঅগ্রসরমান দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হলে এমন সাহসী আর ভিশনারী নেতাই তো চাই।


উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে আমরা ফিরলাম বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নে। বাংলাদেশের পোশাক ব্যবসায়ীরা বললেন ভারতের নিজস্ব কাঁচামাল আছে। ব্যাকইয়ার্ড লিংকেজ এত্ত স্ট্রং । আর তাদের পোশাক খাত নিয়ে সরকার যেসব প্রণোদনা দিলেন তাদের পক্ষেই সম্ভব টেক্সটাইলে বিশ্বে নাম্বার ওয়ান হওয়া।


ভারতের বেশ কয়েকটি স্টল আর প্যাভিলিয়নে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা হলো। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে বলল, ওহহ ,তোমরা তো রেডিমেড গার্মেন্টস এক্সপোর্টে ওয়ার্ল্ড সেকেন্ড পজিশনে! তাদের কথায় আক্ষেপ ছিল, রেডিমেড গার্মেন্টস এক্সপোর্টে সেকেন্ড হতে না পারার। ছিল প্রত্যয় বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাবার। তাদের ব্যবসায়ীদের মাঝে শুধু ব্যবসায়ীবোধ না, জাতীয়তাবোধও দেখতে পেয়েছি।


লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, একাত্তর টিভি এবং সদস্য,বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


বিবার্তা/হুমায়ুন/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com