১০ এপ্রিল, ১৯৭১ : স্বাধীনতার অবিনশ্বর জলতরঙ্গ
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৩৪
১০ এপ্রিল, ১৯৭১ : স্বাধীনতার অবিনশ্বর জলতরঙ্গ
হুসাইন সাদ্দাম
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে মুজিবনগর থেকে প্রচারিত হয় 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র'। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে 'সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র' ঘোষণা করা হয়, সমর্থন ও অনুমোদন দেয়া হয় ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে। এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা মুজিবনগর সরকারের অবস্থান ও যৌক্তিকতাও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা পায়।


আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার ঐতিহাসিক ভিত্তি, আইনি প্রেক্ষাপট, বিপ্লবী ধারাবাহিকতা, জনযুদ্ধের স্বীকৃতি বর্ণনা করে এ ঘোষণায় বলা হয়, "সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।"


বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আইনি ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, ব্যক্ত হয়েছে রাষ্ট্রের অঙ্গীকারগুলোর কথা। এ দলিল তাই মানবসভ্যতার, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার, মানবিকতার, গণতান্ত্রিক অভীপ্সার অনন্য প্রামাণ্য দলিল।


এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই মার্কিন দেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা, যে ঘোষণায় প্রাধান্য পেয়েছে অষ্টাদশ শতকের সাহিত্যের ভাষা। আর বাংলাদেশের ঘোষণায় ছাপ রয়েছে গভীর পাণ্ডিত্য, পরিশীলিত চিন্তা-চেতনা, শাণিত মেধা ও মননশীলতা, দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার আইনি আঙ্গিক।


১৭৭৫ সালে বিপ্লবী যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু' বছর পরে জারি হয় মার্কিন ঘোষণা, বাংলাদেশের সময় লেগেছিল ২৬ মার্চের পরে দুই সপ্তাহ। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় রয়েছে 'মানুষের সমান অধিকার', 'শাসিত জনগণের রায় দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকার', বাংলাদেশের ঘোষণায় রয়েছে 'সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রের অঙ্গীকার'।


যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় কোনো 'একক রাষ্ট্র' বা 'কেন্দ্রীয় সরকার' গঠিত হয়নি, ১৩ টি অঙ্গরাজ্য আলাদাভাবে স্বাধীন হয়, কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'বিপ্লবী ওয়ার কাউন্সিল'। বাংলাদেশের ঘোষণায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমবায়ে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়।


যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডের সৈন্যরা; বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিক্রমায় ৩ ডিসেম্বর গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনী। পার্থক্য রয়েছে দুই দেশের যুদ্ধের সমাপ্তির ধরনেও। পাকিস্তানের পরাজিত সেনাবাহিনীর ঢাকার রেসকোর্সের উন্মুক্ত প্রান্তরে মুক্তিবাহিনী ও জনগণের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধের অবসান হয় ১৭৮৩ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যকার প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা অনন্য। এই ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে কোন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিগণ স্বাধীন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের রুপরেখা কী রকম হবে, স্বাধীনতার ঘোষক কে এবং কখন থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবে।


বাংলাদেশে স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক চালবাজি, জ্ঞানপাপের মহড়া আছে। এর জবাব স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। 'সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার' প্রতিষ্ঠা করাই যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি - এও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১০ এপ্রিল তাই বাংলাদেশ অভিধার জন্য অন্যতম স্মরণীয় দিন, অনুপ্রেরণা ও শক্তির উৎস, স্বপ্নগুলো তাড়িয়ে বেড়ানোর অবিনশ্বর জলতরঙ্গ।


লেখক : আইন বিষয়ক উপ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com