ঐতিহাসিক তুর পাহাড়ের পাদদেশে
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৭, ১৩:১৪
ঐতিহাসিক তুর পাহাড়ের পাদদেশে
জিয়া হাবীব আহসান
প্রিন্ট অ-অ+

মিসরের বিখ্যাত পর্যটন নগরী শার্ম আল শাইখ থেকে তুরে সিনাই তথা তুর পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছতে আমাদের প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা-পাঁচ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। প্রিয় নবী হযরত মুসা (আঃ) এর পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক তুর পাহাড় দেখার অধীর আগ্রহে আমরা উদ্বেলিত। সকাল ১১.৩০টায় শার্ম-আল-শেইখ এয়ারপোর্ট থেকে যাত্রা শুরু করে দুর্গম মরুভূমি ও পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে আমরা বিকেল ৩টার দিকে সর্বশেষ চেক পোস্টে পৌঁছলাম। সেখানে নেমে ওজু, নামাজ শেষে কিছু হালকা নাস্তা সারলাম। আবার যাত্রা শুরু করে তুর পর্বতের প্রায় দেড়, দুই কিমি আগে বিকেল চারটার দিকে আমাদের গাড়ি থামলো। তুর পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বড় গাড়ি যেতে দেয়া হয় না। ওখান থেকে পায়ে হেঁটে, উঠের পিঠে চড়ে বা পুরানো কিছু প্রাইভেট কারে চড়ে তুর পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছতে হয়। আমাদের সফর সঙ্গীদের মধ্যে যারা নারী ও শিশু তারা গাড়িতে, অন্যরা পায়ে হেঁটে অগ্রসর হচ্ছি। হিম শীতল আবহাওয়ায় হাত পা জমে যাচ্ছিল। চোখের সামনে তুর পাহাড় আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। যতই কাছে যাচ্ছি আবেগে আপ্লুত হচ্ছি। যেন জীবনের একটি চরম স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।


আমার পূর্ব ধারণা ছিল তুর পাহাড় খোদার নূরে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর ওখান থেকে চোখের সুরমা পাওয়া যায়। গানের ভাষায় যা শুনেছি, ‘খোদার নূরে পাহাড় জ্বলে মুছা জ্বলে না।’- বাস্তবে দেখলাম তুর পাহাড় চূর্ণবিচুর্ণ হয়েছিল, পুড়ে যায়নি এবং সেখানে কোন সুরমাও পাওয়া যায় না। কেননা পবিত্র কোরআনে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে এভাবে, ‘যখন মুসা আমার সাক্ষাতের জন্য (নির্ধারিত স্থানে) এসে পৌঁছলো এবং তাঁর মালিক তাঁর সাথে কথা বললেন, তখন সে বললো, হে আমার মালিক আমাকে (তোমার কুদরত) দেখাও, আমি তোমার দিকে তাকাই; তিনি বললেন (না), তুমি কখনো আমাকে দেখতে পাবে না, তুমি বরং (অনতিদূরের) পাহাড়টির দিকে তাকিয়ে দেখো, যদি (আমার নূর দেখার পর) পাহাড়টি স্বস্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে তুমি অবশ্যই (সেখানে) আমায় দেখতে পাবে, অতপর যখন তাঁর মালিক পাহাড়ের উপর (স্বীয়) জ্যোতি নিক্ষেপ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলো, (সাথে সাথেই) মুসা বেহুশ হয়ে গেলো, পরে যখন সে সংজ্ঞা ফিরে পেলো তখন সে বলল, মহা পবিত্রতা তোমার (হে আল্লাহ), আমি তোমার কাছে তাওবা করছি, আর তোমার ওপর ঈমান আনয়নকারীদের মধ্যে আমিই (হতে চাই) প্রথম ।” আমি ও আমার পুত্র জাওয়াদ তুর পাহাড়ের নিকট স্থানীয়দের থেকে কিছু চূর্ণবিচূর্ণ পাথর খণ্ড কিনলাম। হযরত মুসা (আঃ) এর সহিত মহান আল্লাহতালার কথোপকথন যেখানে হয়েছিল যেখানে সেই ঐতিহাসিক তুর পাহাড় কিছু দূরে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আবহাওয়া কাফেলার সবাইকে কাবু করে ফেলেছে। তুর পাহাড়ের কাছাকাছি কয়েকটি পাহাড় আছে। তার মধ্যে একটি পাহাড়ের নাম‘সানত কার্তিন’। এই পাহাড়টি দক্ষিণ সাইনা জেলায় অবস্থিত এবং মিসরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়টি মূসা (আঃ) এর পাহাড়ের সাথে একেবারে লাগানো। খ্রিস্টানরা এটাকে মহা পবিত্র স্থান মনে করে। তাই পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে খ্রিস্টান পর্যটকরা এই পাহাড় পরিদর্শন করতে ছুটে আসে। পাহাড়টি মূলত খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের আবাসস্থল ছিল। বড় বড় ধর্মযাজকরা এখানে এসে বসবাস করত। যার ফলে খ্রিস্টানদের কাছে এটার গুরুত্ব অনেক বেশি। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার। এই পাহাড়টি অনেক সুন্দর দেখতে সোনালি রংয়ের।


তুর পাহাড় দক্ষিণ সাইনা জেলায় অবস্থিত। সাইনার মূল শহরের নাম‘আত তুর’। বড় শহর হলো শারমুশ শাইখ। জনসংখ্যা ১৭৭৯০০। এই পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২৮৫ মিটার। এই পাহাড়কে জাবালে মূসা নামে নামকরণ করা হয়েছে। সাইনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা এবং এই এলাকার নাম কুরআন মাজীদে উল্লেখ হয়েছে। এই পাহাড়ি এলাকায় এক প্রকার গাছ হয় যা থেকে তেল তৈরি হয়। সাইনা নবীদের বরকতময় ভূমি। এই এলাকায় অনেক নবী রাসূলের আগমন ঘটেছে। এখানেই রয়েছে সেই ঐতিহাসিক‘জাবালে মূসা’,অনেক নবীদের কবর,বনী ইসরাঈলের ‘তীহ’ নামক ময়দান । আরো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এই মাটি ও পাহাড় সম্পৃক্ত। সুতরাং এই ভূমির বরকত ও নিয়ামত কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। আগেই বলেছি এ স্থানটি মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইয়াহুদিদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যহ এখানে দেশ বিদেশের মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইয়াহুদি ধর্মের লোকজন এসে যার যার উপাসনালয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে ইবাদাত করছে। কুশল বিনিময় করছে। কারো সাথে কারো সংঘাত নেই, বিরোধ নেই। এলাকাটি মিসরবাসী ওমিসর সরকারের কাছে বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর কাছেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ইসরাঈল সবসময় এটা দখল করতে চায়,যে কোনো মূল্যে। যার ফলে অনেক সময় হামলা করে বসে এবং বিভিন্ন গ্রুপও এই এলাকাটা দখল করার জন্য বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর উপর হামলা করে থাকে। অনেক সেনাও এতে হতাহত হয়।


জবলে মুসার পাদদেশে দাঁড়িয়ে পাহাড় চূড়ার দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলাম আর বার বার শোকর আদায় করছিলাম মহান প্রভুর। পবিত্র উপত্যকার দিকে দৃষ্টি দিতেই মনের গহীনে এক অপার্থিব অনুভূতি ও শিহরণ উদয় হলো। সে অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। আমার সফর সঙ্গীরা বাস থেকে নেমে কেউ হেঁটে, কেউ ভাড়া গাড়িতে এখানে চলে এসেছেন জবলে মুসার পাদদেশে। এ তো সে স্থানে আমি এসে উপস্থিত হয়েছি, যেখানে আমার সব থেকে প্রিয় সত্তা প্রিয় নাম ‘আল্লাহ সুবহানু ওয়াতায়ালা’ সেই দূর অতীতে তাঁর নূরের তাজাল্লি নিক্ষেপ করেছিলেন।


সেই পবিত্র স্থানে আমরা সুদূর বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছি, যেখানে বিশ্বলোকের প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কথা বলেছিলেন, তাঁরই প্রিয় নবী হযরত মুসার সাথে, কেবল তাঁরাই অনুভব করতে পারে, যাদের দিনরাতের সকল প্রচেষ্টা নিয়োজিত থাকে তাঁকে পাবার আশায়। কেবলমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যারা সকল কর্মে থাকে তৎপর। আমার পক্ষে আর নিজেকে সংবরণ করা সম্ভব হলো না। দু’চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা, দৃষ্টি শক্তি বার বার ঝাপসা করে দিচ্ছে। হযরত মুসা (আঃ) যখন এখানে এসেছিলেন, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে জুতা খুলে এখানে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমরা আদব রক্ষার্থে জুতা খুলে পবিত্র উপত্যকায় প্রবেশ করলাম। গোটা বিশ্বের মহা শক্তিধর সত্তা, প্রতিপালক, যার সাথে তুলনা করার মতো কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। সেই মহান সত্তা এখানে তাঁরই নূরের তাজাল্লি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাঁর নবীর সাথে কথা বলেছিলেন, এ কথা চিন্তা করতেই আমার সমগ্র দেহ মন সেই শক্তিধর সত্তার ভয়ে কেঁপে উঠলো। এটা আমার আকীদা, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি আমাকে অবশ্যই দেখছেন যে, আমি একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির আশায় এখানে এসেছি।



তুর পর্বত বা জবলে মুসার পাদদেশে গোলাকার আকৃতির একটি গাছ রয়েছে, এ গাছের নিচের অংশ পাথর দিয়ে বাঁধানো। কথিত আছে, এটাই সে গাছ যেই গাছ থেকেই হযরত মুসা (আঃ) আলো বিচ্ছুরিত হতে দেখেছিলেন, অনেক মানুষ এ-গাছ দেখতে এখানে আসেন, তবে হাজার বছরের ব্যবধানে সেই গাছ কিনা, এ সম্পর্কে গবেষকদের ও ইসলামী চিন্তাবিদদের ধারণা সাধারণ মানুষের সম্পূর্ণ বিপরীত। হযরত মুসা (আঃ) যেখানে কুঞ্জবনের মধ্যে আগুন লেগেছে বলে দেখেছিলেন সে স্থানটি তূর পাহাড়ের পাদদেশে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম খ্রিস্টান বাদশাহ কনস্টানটাইন ৩৬৫ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে ঠিক যে জায়গায় ও ঘটনাটি ঘটেছিল সেখানে একটি গীর্জা নির্মাণ করেন। পূর্বে নির্মিত কনস্টান্টাইনের গীর্জাকে এই আশ্রমের মধ্যে শামিল করা হয়েছে। সে আশ্রম ও গীর্জা বর্তমানেও আছে এবং এটি গ্রীক অর্থোডক্স চার্চের অধীনে রয়েছে। নিজের স্ত্রী ও সন্তান এবং সাথের অন্যদের পথিমধ্যে রেখে হযরত মূসা (আঃ) সম্মুখে আলো দেখে আগুনের সন্ধানে চললেন। বেশ কিছুটা যাবার পরে তিনি যখন সেই বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটার মুখোমুখি হলেন, তখন সেই আলো থেকেই যেন আওয়াজ এলো- ‘হে মূসা ! আমিই আল্লাহ- তোমার রব। তুমি এখন পবিত্র উপত্যকায় রয়েছো, সুতরাং জুতা খুলে এখানে এসো ।’ এই ঘটনা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের বেশ কয়েকটি সূরায় বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। আল্লাহতা’য়ালা পবিত্র কোরআনে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘সেখানে পৌঁছলে তাঁকে ডেকে বলা হলো, ‘হে মূসা! আমিই তোমার রব, জুতো খুলে ফেলো, তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় আছো। আমিই আল্লাহ, তোমাকে বাছাই করে নিয়েছি, শোনো যা কিছু ওহী করা হয়। আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ্‌ নেই, সুতরাং তুমি আমারই দাসত্ব করো এবং আমাকে স্মরণ করার জন্য নামাজ কায়েম করো।’ (সূরা ত্ব-হা ১১-১৪)। উপত্যকায় ডান কিনারায় পবিত্র ভূখণ্ডে একটি বৃক্ষ থেকে আহবান এল, ‘হে মূসা! আমিই আল্লাহ সমগ্র বিশ্বের অধিপতি।’ (সূরা আল কাসাস-৩০)। সেখানে পৌঁছানোর পর আওয়াজ এলো, ‘ধন্য সে সত্তা যে এ আগুনের মধ্যে এবং এর চারপাশে রয়েছে, পাক পবিত্র আল্লাহ সকল বিশ্ববাসীর প্রতিপালক। হে মুসা! আমিই আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা নাম্‌ল ৭-৮)।


আমাদের ভিজিটরস টিমের সম্মানিত গাইড প্রফেসর ড. বিএম মফিজুর রহমান আল আজাহারী মিশরের ঐতিহাসিক আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন পবিত্র তুর পাহাড়ে যাওয়ার দুর্লভ সুযোগটা হয়েছিল, শোনালেন তিনি আমাদের সবাইকে সেই দুঃসাহসিক স্মৃতিময় কথন। এখানে উঠতে হলে পুরো রাত চলে যাবে। সফর সঙ্গীদের মধ্যে নারী ও শিশু থাকায় এবং সকলের মধ্যে তখন ততটুকু শক্তি সামর্থ্য ও সময়ের অভাব থাকায় তুর পাহাড়ে উঠা সম্ভব হলো না; আফসোস থেকে গেলো। আমরা প্রচণ্ড শীতল আবহাওয়াকে মোকাবেলা করে ফিরে আসতে শুরু করলাম। সকলে বাসে উঠে নিকটবর্তী একটি রেস্টুরেন্ট গিয়ে মাগরিবের নামাজ ও বুফে খাবার খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করলাম।


আমাদের ফিরে যেতে হবে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে শার্ম-আল-শেইখ নগরীতে। যুগ যুগ ধরে সিনাইয়েরভৌগোলিক অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা এশিয়া মহাদেশ ও আফ্রিকা মহাদেশের একমাত্র স্থলভাগ যেখানে দুটি মহাদেশ পাশাপাশি মিলিত হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই মিসর ও গোটা আফ্রিকার মানুষ হিজায,প্রাচীন রোম ও পারস্যের সাথে স্থল যোগাযোগের জন্য সিনাই উপত্যকা ব্যবহার করত। আকাশ ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ সহজ হওয়ার আগে এই সাইনাই ছিল গোটা আফ্রিকা ও এশিয়ার বাণিজ্যিক,কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ পথ। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আমর-বিন-আছ (রা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীও এই সিনাই হয়েই মিসরে আসে এবং ওখানেই বাইজেন্টাইনদের প্রতিরোধের মোকাবেলা করে। দ্বাদশ শতকের ক্রুসেড বাহিনীর সাথেও মিসরের আইয়ুবীদের সাথে অনেক যুদ্ধ হয় এই সাইনাতে।


১১৮৭ সালে যে ঐতিহাসিক হিট্টিনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নেতৃত্বে মুসলিমবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের পরাজয় ঘটে,সে হিট্টিনও ঐতিহাসিক সিনাই-এর অংশ,যা বর্তমানে ফিলিস্তিনের অংশ। ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি ১২৬০ সালে মিসরের মামলুকি আমলে তাতারিদের সাথে যে ঐতিহাসিক আইন জালুত যুদ্ধ হয় তাও এই সিনাইতে। এভাবে সব যুগের সাম্রারাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি থাকত এই সিনাই-এর দিকে। এখানে অধিকার বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক যুদ্ধ হয়েছে। আধুনিককালের অন্যতম যুদ্ধ হল মিসর-ইসরাঈল যুদ্ধ। ১৯৬৭ সালে সুয়েজখাল পর্যন্ত গোটা সিনাই অঞ্চল মিসর থেকে ইসরাঈল ছিনিয়ে নিয়েছিল। পরে ১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মিশর তা পুনরুদ্ধার করে। আর আধুনিককালে সাইনা উপদ্বীপের বুক চিরে সুয়েজখাল খনন করে ভুমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝে সংযোগ ঘটানোর ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র যোগাযোগে যে গতি এসেছে তাও ভৌগোলিক দিক থেকে সিনাইয়ের গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সিনাই হলো ইসলাম ও প্রাগ-ইসলামিক যুগ থেকেই মিসর ও আফ্রিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।


মিসরের উত্তর–পূর্বাংশে তুর পাহাড় বা সিনাই উপত্যকা প্রায় ৬১,০০০ বর্গ কিঃমিঃ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত। এর আয়তন শুধু মিশরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়– মুসলিম বিশ্বের বিষফোঁড়া ইসরাইলেও স্পর্শ করেছে। অসমতল ত্রিভুজ আকৃতির সিনাই পর্বতের দক্ষিণে লোহিত সাগর, দক্ষিণ পূর্বে আকাবা এবং পশ্চিমে ইসরাইলের নেগেভ মরুভূমি এবং সুয়াজ খাল। সিনাই পর্বতের দুই দিকের মধ্যে দক্ষিণে জবলে মুসা বা মিসার পর্বত ও উত্তর দিকে ফিলিস্তিনের গাজা শহর– যেখানে ইসরাইলীদের দুর্দান্ত প্রতিপক্ষ হামাসের ঘাঁটি। জবলে মূসার উচ্চতা প্রায় ১৬৭৩ মিটার এবং এটাই তুরে সিনাই ও মিসরের সর্বোচ্চ ভূমি। সিনাই পর্বত এলাকা আফ্রিকার মহাদেশের মধ্যে ভূমিসেতু হিসেবে বিদ্যমান।


ইতিহাস ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা আমাদের দীর্ঘ পথ চলাকে অনেক সুগম করে দিয়েছে। ভিজিটরস টিমের সকলেই জ্ঞানী গুণী ও বোদ্ধা হওয়ায় এ কাফেলায় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ছিল অবারিত। সিনাই শহর থেকে Amwaj Resort– এ পৌঁছলাম রাত তখন সাড়ে ৯ টা । ৪ তারকা হোটেলের নৈসর্গিক পরিবেশ দেখে উৎফুল্ল সবাই– বিশাল লন, চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি, সুমিংপুল- সব কিছু মিলিয়ে অনন্য এক আয়োজন, খাবার দাবার, বিনোদন যেন কোন কিছুরই অভাব নেই। দেশী বিদেশী পর্যটকে ভরপুর এ হোটেলের লন, ওয়েটিং ডিনার রুম, হলরুম- বলরুম সব জায়গায় প্রাণ চঞ্চল। হজ্বে বায়তুল্লাহ ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস লিমিটেডের পরিচালক প্রফেসর আল্লামা গিয়াসুদ্দিন তালুকদারকে আন্তরিক ধন্যবাদ এ রকম একটি মনোজ্ঞ রিসোর্ট এ থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। হোটেলটির ম্যানেজমেন্টে থাকা, খাওয়া দাওয়া, আতিথেয়তা, পরিবেশ সব মিলে চমৎকার ভালো লেগেছে সফর সঙ্গীদের। পরদিন সকালে আমরা ফিরে যাবো। কায়রোর উদ্দেশ্যে শার্ম- আল- শেইখ এয়ারপোর্ট। পরের দিনের কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় আরো আলোচনার আশা রাখি।


লেখক: আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com