মাছ সংকটে ম্লান পলো বাওয়া উৎসব, হতাশ শিকারিরা
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:০৪
মাছ সংকটে ম্লান পলো বাওয়া উৎসব, হতাশ শিকারিরা
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অঅ-অ+

ভোরে পলো, হুসা ও জাল নিয়ে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদুড়িয়া বিলে নেমেছিলেন শত শত মানুষ। সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মাছ শিকারি ও দর্শনার্থীদের সমাগমে বিলপাড় উৎসবমুখর হলেও আশানুরূপ মাছ না পেয়ে হতাশ হয়েছেন অনেকে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় হুমকিতে পড়েছে গ্রামবাংলার এই লোকজ ঐতিহ্য।


বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে আয়োজিত এ উৎসবে চতুল, ধুলপুকুরিয়া, দুর্গাপুর, তেলজুড়ি, নিধিপুর, পোয়াইল, শেখর, রাজাপুর, কলারণ, ছোলনা, গুনবহা, কুশাডাঙ্গাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ অংশ নেন। কেউ পলো দিয়ে, কেউ হুসা বা জাল নিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেন। মাছ শিকারের পাশাপাশি বহুদিন পর পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা হওয়া ও একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দেও মেতে ওঠেন তারা।


পলো বাওয়া গ্রামবাংলার পুরোনো লোকজ আয়োজন। নির্দিষ্ট সময়ে দল বেঁধে বিলে নেমে মাছ ধরার এই রীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এটি শুধু মাছ শিকারের আয়োজন নয়, গ্রামীণ মানুষের সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। তবে দাদুড়িয়া বিলে এবার মাছের স্বল্পতা সেই আনন্দে ভাটা ফেলেছে।


স্থানীয় মাছ শিকারিদের ভাষ্য, একসময় এ বিলে শিং, মাগুর, কই, বাইন, শোল, টাকি, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ মিলছে না। তাঁদের ধারণা, অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের মধ্যে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর তৈরি এবং কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মাছ কমে থাকতে পারে। তবে এসব কারণের প্রভাব নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক জরিপের তথ্য নেই।


গুনবহা গ্রামের বাসিন্দা মিকাইল জানান, বাবা-দাদার সময়ের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো ও হুসা নিয়ে বিলে এসেছেন। কিন্তু আশানুরূপ মাছ পাননি। তাঁর অভিযোগ, চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পলো বাওয়া উৎসবের এই দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে।


আলফাডাঙ্গা থেকে আসা মাছ শিকারি আজিজুল ফকিরের ভাষ্য, অনেক আশা নিয়ে বিলে এসেছিলেন কিন্তু মাছ কম থাকায় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। শাহাবুল নামের আরেক মাছ শিকারি জানান, পলো দিয়ে মাছ না পেয়ে অনেকে বাঁশের কাঠামোয় মশারির কাপড় লাগানো বিশেষ ধরনের হুসা দিয়ে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করেছেন। তাতেও তেমন মাছ মেলেনি।


কুশাডাঙ্গা গ্রামের ইমরান শেখের ভাষ্য, পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখতেই তাঁরা এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। কেউ কিছু মাছ পেয়েছেন, আবার কেউ খালি হাতে ফিরেছেন। দেশীয় মাছ ও পলো বাওয়ার ঐতিহ্য রক্ষায় চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।


বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস জানান, দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অনেক মাছের ডিম থেকে পোনা তৈরি হওয়ার পর সেগুলো সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে আটকা পড়লে বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে।


তাঁর ভাষ্য, জনবলসংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করতে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়তে হয়। কিছু ব্যবসায়ী গোপনে এসব জাল বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিক্রেতাদের শনাক্ত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নজরদারির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।


দাদুড়িয়া বিলে এবারও মানুষের সমাগমে পলো বাওয়া উৎসব প্রাণ পেয়েছে, কিন্তু মাছের স্বল্পতা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য একদিন বাস্তব আয়োজনের বদলে স্মৃতিতে ঠাঁই নিতে পারে।


বিবার্তা/মিলু/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com