দেয়ালের ক্যানভাসে জীবন্ত স্বপ্ন: টাঙ্গাইলের ব্যতিক্রমী শিল্পী ‘চাঁনু পাগলা’
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ২০:৪৫
দেয়ালের ক্যানভাসে জীবন্ত স্বপ্ন: টাঙ্গাইলের ব্যতিক্রমী শিল্পী ‘চাঁনু পাগলা’
ইমরুল হাসান বাবু , টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ভোরের আলো ফুটতেই ঘরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। গন্তব্য নির্দিষ্ট নয়, নেই কোনো পরিকল্পিত কর্মসূচিও। সারাদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। হাতে নেই দামি তুলি কিংবা রঙের বাহার। কচুরিপানা, কয়লা ও প্রকৃতি থেকে পাওয়া সাধারণ উপকরণ দিয়েই ধূসর দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন অসাধারণ সব চিত্রকর্ম। তিনি আবু বক্কর সিদ্দিক (৫১), যিনি টাঙ্গাইলবাসীর কাছে অধিক পরিচিত ‘চাঁনু পাগলা’ নামে।


টাঙ্গাইল শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা চাঁনু মিয়া বাবা-মায়ের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সবার ছোট। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা চাঁনু ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করতেন। কাজের ফাঁকে মাটির ওপর কয়লা, কচুরিপানা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে আঁকিবুঁকি করতেন। সেখান থেকেই মূলত তার ছবি আঁকার হাতেখড়ি।


তবে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জীবনে নেমে আসে গভীর শূন্যতা। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা তাকে আরও গুটিয়ে দেয়। সেই সময় থেকেই ছবি আঁকাকেই জীবনের একমাত্র সঙ্গী করে নেন। সময়ের পরিক্রমায় মানসিক ভারসাম্য হারালেও হারাননি সৃজনশীলতা ও শিল্পপ্রতিভা।


চাঁনু মিয়ার আঁকা ছবির অন্যতম আকর্ষণ একটি তরুণ-তরুণীর জুটি। স্থানীয়দের ধারণা, ছবির ছেলেটি স্বয়ং চাঁনু এবং মেয়েটি তার জীবনের কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রেমের প্রতীক। যদিও সেই রহস্যের কোনো উত্তর আজও মেলেনি। প্রেমের পাশাপাশি তার ছবিতে উঠে আসে মসজিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক বার্তা। দেয়ালে দেয়ালে তিনি লিখে রাখেন উপদেশমূলক বাণীও।


পেশাদার শিল্পী না হয়েও তার কাজের গতি ও দক্ষতা বিস্ময়কর। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিটে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রকর্ম এঁকে ফেলতে পারেন তিনি। অস্পষ্ট ভাষায় কথা বলা এই মানুষটির সৃষ্টিশীলতা প্রতিদিনই পথচারীদের মুগ্ধ করে।


সরেজমিনে দেখা যায়, একটি বস্তায় করে কয়লা, কচুরিপানা ও কিছু কাগজের টুকরো নিয়ে শহরের পার্কবাজার মোড়ে একটি দেয়ালে ছবি আঁকছেন চাঁনু মিয়া। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছেন তার শিল্পকর্ম।


স্থানীয় বাসিন্দা রাব্বি ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি চাঁনু মিয়া কচুরিপানা ও কয়লা দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকেন। তার শিল্পকর্ম সত্যিই অসাধারণ। নতুন প্রজন্ম তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারে।


পার্কবাজারের ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস আলী বলেন, বহু বছর ধরে তাকে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ছবি আঁকতে দেখছি। বিশেষ করে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের ছবি প্রায়ই আঁকেন। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের নানা চিত্রও ফুটিয়ে তোলেন। যথাযথ চিকিৎসা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি আরও বড় শিল্পী হতে পারতেন।


ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক সেলিম মিয়া বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাকে ছবি আঁকতে দেখি। যাত্রী না থাকলে দাঁড়িয়ে তার ছবি আঁকা দেখি। অনেক সময় বাড়ির মালিকরা বকাঝকা করলেও তিনি থেমে যান না। তার প্রতিভা সত্যিই অসাধারণ।


টাঙ্গাইলের কবি মাহমুদ কামাল বলেন, চাঁনুর শিল্পকর্মের মধ্যে এক ধরনের গভীর বেদনা ও বিরহের ছাপ রয়েছে। তার আঁকা ছবিগুলো যেন নীরব ভাষায় জীবনের গল্প বলে।


টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র মাহমুদা বেগম জেবু বলেন, চাঁনু মিয়া আমাদের এলাকার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তার মেধা ও সৃজনশীলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অনেকে তাকে পাগল বলে, কিন্তু তিনি আসলে একজন নিভৃতচারী ও মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ। তার যথাযথ পরিচর্যা ও চিকিৎসা প্রয়োজন।


স্থানীয়দের মতে, চাঁনু মিয়া শুধু একজন দেয়ালচিত্র শিল্পী নন, তিনি টাঙ্গাইলের এক জীবন্ত শিল্প-ঐতিহ্য। অবহেলা ও উপেক্ষার আড়ালে থাকা এই অসাধারণ প্রতিভাকে যদি চিকিৎসা, সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যায়, তাহলে তিনি দেশের অন্যতম স্বীকৃত চিত্রশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন।


টাঙ্গাইলবাসীর প্রত্যাশা দেয়ালের ক্যানভাসে স্বপ্ন আঁকা এই মানুষটির পাশে দাঁড়াবে সমাজ ও প্রশাসন, যাতে হারিয়ে না যায় এক অনন্য শিল্পপ্রতিভার গল্প।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com