
গত এক দশকে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় গমের চাষ ও উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে, কারণ কৃষকরা ক্রমশ ভুট্টার মতো বেশি লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। একসময় এ অঞ্চলে গম চাষে বিপুলসংখ্যক কৃষক জড়িত ছিলেন এবং গম চাষকে লাভজনক করেছিলেন। বর্তমানে গম চাষে আশানুরূপ লাভ করতে পারছেন না। অনেক সময় গম চাষ করে কৃষকদের পুঁজি উঠাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গম উৎপাদনের এই প্রবণতা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, কারণ বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই গম উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তা বলছে, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৮৫ লাখ টন গমের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ১১ লাখ টনের নিচে নেমেছে যা জাতীয় চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। গেল বছর গম চাষ হয়েছিল ১৭ হাজার ১৬৭ হেক্টর জমিতে। ২০২৪ গম চাষ হয়েছিল ১৮ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে। ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছিল। ২০১০ সালে গম চাষ হয়েছিল ৬৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। চলতি বছরে সারাদেশে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টন।
কৃষকরা জানায়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম লাভই গম চাষ থেকে সরে আসার প্রধান কারণ। বর্তমানে এক বিঘা জমিতে গম চাষ করতে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয় এবং উৎপাদন হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ। স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি( গম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়—যা কৃষকদের জন্য খুবই সীমিত লাভ রেখে যায়। সরকার প্রতিকেজি গম ৩৬ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে কিন্তু এই দর ৪০ টাকা করা হলে কৃষকরা গম চাষে লাভবান হতেন এবং আগামীতে গম চাষে আগ্রহী হতেন।
গম চাষ এখন আর আমাদের জন্য লাভজনক নয়,বলেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর চর গোকুন্ডা গ্রামের কৃষক মোস্তাক আলী। “গত কয়েক বছরে আমাদের গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষক গম চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি একসময় ১৫-১৬ বিঘা জমিতে গমচাষ করতাম। এবছর গমচাষ করেছি মাত্র এক বিঘা জমিতে। গেল বছর জমির পরিমাণ ছিলো দুই বিঘা। হয়তো আগামীতে আমিও গম চাষ ছেড়ে দিব।
হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক আফজাল হোসেন। তিনি এবছর গমচাষ করেছেন চার বিঘা জমিতে কিন্তু গেল বছর জমির পরিমাণ ছিল ২ বিঘা। এর আগের বছরগুলোতে গমচাষ করেছিলেন ৫-৭ বিঘা জমিতে। সম্প্রতি বছরগুলোতে তেমন গমের চাষ হচ্ছে না। অনেক কৃষক শুধু ভালোবাসার খাতিরে গমচাষ ধরে রেথেছেন তবে পরিমানে তা খুবই কম। এর পরিবর্তে কৃষকরা ভুট্টার মতো ফসলে ঝুঁকছেন, যা ভালো ফলন ও বেশি বাজারমূল্য নিশ্চিত করে। ’সরকার যদি প্রতিকেজি গমের বাজারদর ৪০ টাকা নির্ধারন করতো তাহলে কৃষকরা গমচাষে লাভ করতে পারতেন এবং গম চাষে আগ্রহ হারাতেন না।
রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার চর ইচলি গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, অন্যান্য ফসল বিশেষ করে ভূট্টা তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে বেশি লাভ নিশ্চিত করায় গম ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। আমি গেল বছর গম চাষ করেছিলাম ৩ বিঘা জমিতে আর এ বছর করেছি দুই বিঘা জমিতে। আগামীতে হয়তো গম চাষ ছেড়ে দিব। ‘আমার দৃষ্টিতে আগামী কয়েক বছর গমচাষ একবারেই হারিয়ে যাবে। আমাদের চর এলাকায় অনেক ফসল ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। যে ফসলে লাভবান হতে পারব। আমরা কৃষকরা সে ফসলের দিকে ঝুঁকবো। আমাদেরকে তো বাঁচতে হবে।
তবে কৃষি কর্মকর্তারা উন্নত জাতের গম এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রচারের মাধ্যমে এই প্রবণতা উলটো দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, উন্নত বীজ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত গম উৎপাদন সম্ভব। “গম চাষকে আরও লাভজনক করতে আমরা কৃষকদের উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করছি।
তবে এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি বলেন, গম চাষ অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক না হলে এই পতনের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে—যা বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]