ধরলাপাড়ের ভাঙনকবলিত জমিরন নেছা
‘মুই না খ্যায়া থাকলেও কাইও মোর খোঁজ নেয় না’
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:২৭
‘মুই না খ্যায়া থাকলেও কাইও মোর খোঁজ নেয় না’
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

‘মোর দুখখো কষ্টের শ্যাষ নাই। মোর কপালোত খালি কষ্ট আর কষ্ট। মুই না খ্যায়া থাকলেও কাইও মোর খোঁজ নেয়না।’—কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে ধরলাপাড়ের শতবর্ষী বৃদ্ধা জমিরন নেছার।


কিছুক্ষণ থেমে আবার বলেন, ‘মোর সওয়ামী ম্যালাগুলা ভূই থুইয়া মরি গ্যাইছে। তখন ভালোয় আছলুং। ধরলা নদীই মোর সোককিছু কাড়ি নিছে। এ্যালা মুই ভাতে পাং না।’


ঈদ সামনে এলেও তার জীবনে নেই কোনো উৎসবের রং। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিনোত মুই খাইম তাকো জোগাড় নাই মোর। বেটা-বেটির ঘর কাইও এ্যাকনা নয়া কাপড় দিলে তাক পিনদিম। এবার কাপড় পাং না পাং তার কোন ঠিক নাই। মোর ছওয়াগুলায়ও খুব কষ্টোত থাকে।’


শতবর্ষী এই নারীর ভাগ্যে ভাত জুটলেও প্রায়ই জোটে না তরকারি। প্রতিদিনই তরকারির জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হয় তাকে। আশপাশে ঘুরে শাকপাতা সংগ্রহ করেন। কখনো আলুভর্তা জোটে, আবার অনেক দিনই লবণ-মরিচ দিয়ে ভাত খেতে হয়।


প্রতিদিন মাত্র এক পোয়া চাল রান্না করেন। সেই ভাত দিয়েই সন্ধ্যায় ইফতার করেন, আবার ভোরে সেহরিও সেরে নেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর গত ২৫ বছর ধরে এভাবেই প্রতিদিন সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তিনি।


লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা গ্রামে ধরলা নদীর তীরে অন্যের এক টুকরো জমিতে তার ছোট্ট একটি ঘর। ঘরটি জীর্ণশীর্ণ। চালের টিনে অসংখ্য ছিদ্র। বৃষ্টি নামলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তখন নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় তাকে। সরকারের দেওয়া বয়স্কভাতার মাসিক ৬০০ টাকাই তার একমাত্র আয়ের উৎস। সেই সামান্য টাকাতেই কোনোভাবে দিন কাটছে তার।


প্রায় ২৫ বছর আগে স্বামী দারোগ আলীকে হারান জমিরন। স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যেই নদীভাঙনে স্বামীর রেখে যাওয়া ১২ বিঘা জমি গ্রাস করে নেয় ধরলা নদী।


তার তিন ছেলে—ফরমান আলী (৭১), আব্দুল করিম (৬৮), আজিজুল হক (৫৪) এবং দুই মেয়ে আনিসা বেগম (৫৭) ও আনসা খাতুন (৪৮)—সবাই আলাদা সংসার করছেন। তারাও চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন।
তবু স্বামীর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে ধরলাপাড় ছেড়ে যাননি জমিরন। নদীর পাড়ে একাই বসবাস করছেন। মাঝে মাঝে ধরলার পাড়ে বসে একা একা পুরনো দিনের কথা মনে করে নীরবে চোখের পানি ফেলেন।


জমিরন নেছা বলেন, এখন শরীরে আর শক্তি নেই, তাই কোনো কাজ করতে পারেন না। বয়স্কভাতার ৬০০ টাকাতেই বেঁচে আছেন। ছেলে-মেয়েদের সংসারে দারিদ্র্য থাকায় তাদের কাছেও কোনো আবদার করেন না।


‘মাছ, গোস্ত, ডিম খাওয়ার ইচ্ছা হয়। এইল্যা কোনটে পাইম? কার কাছোত চাইম। এক সময় মোর সওয়ামী সংসারে সোককিছু আছিল। এ্যালা কিচ্ছু নাই। ধরলা নদী সোকগুলাই খ্যায় ফ্যালাইছে’ বলেন তিনি।


জীর্ণ ঘরের দিকে তাকিয়ে কষ্টের কথা বলতে গিয়ে জমিরন বলেন, ‘ঝরি আইসলে ঘরে টুন দিয়া পানি পড়ে। আইতোত নিনবার পাং না। ঝরির পানিত বিছনা ভিজি যায়। এ্যাকনা বাতাস আইসলে মোর ঘরটা উড়ি যাবার পায়। কাই মোক ঘর করি দ্যায়। মোর কষ্টোর শ্যাষ নাই বাপু। ধরলা পাড়োত মুই মইরবার চাং। এটেকোনা মোর সওয়ামী মরছে। সওয়ামীর কবরটা নদীর মাঝোত পড়ি আছে।’


জমিরন নেছার ছেলে আজিজুল হক বলেন, তিনি নিজেও অন্যের জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। অনেকবার মাকে নিজের সংসারে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার মা ধরলাপাড় ছেড়ে যেতে রাজি নন।


স্থানীয় কৃষক শামসুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টি নামলেই জমিরন নেছার ঘরটিতে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। নিজেই রান্না করেন। এখনো হাঁটতে পারেন, কথা বলতে পারেন এবং চোখেও দেখতে পান। তার বয়স ১০০ বছরের কাছাকাছি হবে।


মোগলহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে সরকারি কোনো সহায়তা এলে জমিরন নেছাকে দেওয়া হয়। সরকারি ঘরের বরাদ্দ এলে তাকে একটি ঘর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


বিবার্তা/হাসানুজ্জামান/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com