
নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করছিলেন ছেলে, আর সেই সময় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন বাবা-শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে আনা সেই বৃদ্ধের মরদেহই আটকে রইলো বিলের টাকার কাছে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে এক দরিদ্র পরিবার রাতভরমর্গের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখতে পারেনি। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার গঙ্গারামপুর গ্রামের বাসিন্দা সজল বেপারী (৩৬) পেশায় ধূলশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ডিউটিতে থাকা অবস্থায় তিনি খবর পান, তার বাবা আয়নাল বেপারী (৭০) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ছুটি নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে পরিবারের সহযোগিতায় স্থানীয় হাসপাতালে নেন। সেখানকার চিকিৎসকরা ব্রেন স্ট্রোক শনাক্ত করে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাবাকে সাভারে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান তিনি।
নিউরোলজি বিভাগের তত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়, অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আয়নাল বেপারী মারা যান, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় মৃত্যু হয়েছে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে। সময়ের এই অমিলের চেয়েও বড় কষ্ট ছিল-মৃত্যুর আগে কিংবা পরে বাবাকে একবারও দেখতে পারেননি স্বজনরা; বারবার অনুরোধ করেও আইসিইউ বা ওয়ার্ডে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাদের। এরপরই সামনে আসে বিলের হিসাব। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মোট চিকিৎসা ব্যয় ৮৬ হাজার ৬২৫ টাকা, যার মধ্যে পরিবার ইতোমধ্যে ৪৪ হাজার ২১১ টাকা পরিশোধ করেছে। কিছু ছাড় দেখিয়ে আরও ২৮ হাজার টাকা দিতে বলা হয়। কিন্তু দরিদ্র এই পরিবারের কাছে ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা-তাও ধার করা।
সজল বেপারীর কণ্ঠে তখন হতাশা আর অসহায়ত্ব, তিনি বলেন, এই টাকাটুকু জোগাড় করতেই আমরা হিমশিম খেয়েছি। বাকি টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। কিন্তু টাকা না দিলে লাশ দেবে না বলছে। তার অভিযোগ, বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় মরদেহ মর্গে রেখে দেওয়া হয়েছে, এমনকি স্বজনদের ভেতরে গিয়েও দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। মর্গের দরজার সামনে বসে কান্না করছেন বৃদ্ধের স্ত্রী, পাশে মেয়ে আর ছেলেরা-কেউ সান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।
হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার সুলতান বলেন, রোগী আটকে রাখার অভিযোগ সঠিক নয়, এটি একটি বেসরকারি হাসপাতাল, তাই বিল পরিশোধ করেই মরদেহ নিতে হবে; মালিকপক্ষ চাইলে কিছু ছাড় দিতে পারে, তবে তার জন্য পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে পরিবারের প্রশ্ন একটাই- মৃত বাবার লাশ কি টাকার অঙ্কে আটকে থাকবে?
রাত বাড়তে থাকে, হাসপাতালের করিডোর ফাঁকা হয়ে আসে, কিন্তু মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে একটি অসহায় পরিবার। তাদের হাতে নেই টাকা, নেই কোনো প্রভাব-আছে শুধু কান্না আর একটি আকুতি, “বাবার লাশটা অন্তত দিয়ে দেন।”
চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল যখন হয়ে ওঠে বিলের বোঝা, তখন গরীব মানুষের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত যেন শান্তি বয়ে আনে না-এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সেই নির্মম বাস্তবতারই সাক্ষী হয়ে থাকে পুরো রাত।
১৪ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টা এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাসপাতালের মর্গের সামনে লাশের অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনরা।
বিবার্তা/শরিফুল/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]