হাকিমপুরে দিগন্ত জোড়া মাঠে সরিষার ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষিরা
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪১
হাকিমপুরে দিগন্ত জোড়া মাঠে সরিষার ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌচাষিরা
হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর হিলিতে প্রতি বারের মতো সরিষার খেত থেকে মধু সংগ্রহ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌচাষিরা। উপজেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন তারা।


মৌচাষিরা জানান, সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহে আর্থিকভাবে তারা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি বেকারত্বও দূর হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছেন, একদিকে মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে যেমন আয় করছেন, অন্যদিকে খেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলন ও প্রায় ১০ গুন বারে।


সরিষা ফুল মধু সংগ্রহকারীরা জানান, তারা সরিষা ক্ষেতের পাশে খোলা জায়গায় চাক ভরা বাক্স ফেলে রাখেন। একেকটি বাক্সে মোম দিয়ে তৈরি ছয় থেকে সাতটি মৌচাকের ফ্রেম রাখা হয়। বাক্সের ভেতর রাখা হয় একটি রানি মৌমাছি। রানি মৌমাছি থাকায় অন্য মৌমাছিরা আসতে থাকে ওই বাক্সে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মৌচাষিরা এসব মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করেন। এতে তারা একদিকে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের দূর হচ্ছে বেকারত্ব। এসব মধু স্থানীয়ভাবে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন মৌচাষিরা।


হাকিমপুর হিলি পৌর শহর থেকে হিলি-বগুড়া মেইন রোডে মাত্র তিন কি: মি: দূরে ছাতনী গ্রামের সড়কের পাশে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে এসেছেন দাতিনাখালি, বুড়িগোয়ালিনী, শ্যামনগর সাতক্ষীরা থেকে মেসার্স ভাই ভাই মৌ খামার এর স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন।


তিনি সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন, মধু সংগ্রহের জন্য স্টিল ও কাঠ দিয়ে বিশেষভাবে বাক্স তৈরি করা হয়। বাক্সে উপরের অংশটা কালো রঙের পলিথিন ও চট দিয়ে মোড়ানো থাকে। ভেতরে কাঠের তৈরি ৭টি ফ্রেমের সঙ্গে মোম দিয়ে বানানো বিশেষ কায়দায় এক ধরনের সিট লাগানো থাকে। বাক্সগুলো সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। ভেতরে দেওয়া হয় রানি মৌমাছি। যাকে ঘিরে আনাগোনা করে হাজারো পুরুষ মৌমাছির দল। রানি মৌমাছির আকর্ষণে সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে পুরুষ মৌমাছিরা। একটি রানি মৌঁমাছির বিপরীতে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজারের মতো পুরুষ মৌঁমাছি থাকে একেকটি বাক্সে।


মধু সংগ্রহকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা সরিষা খেত থেকে বছরে চার মাস মধু সংগ্রহ করে থাকি। বাকি আট মাস কৃত্রিম পদ্ধতিতে চিনি খাইয়ে মৌমাছিদের পুষিয়ে রাখতে হয়। ডিসেম্বর মাস থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষা খেত থেকে মধু সংগ্রহ করার উপযুক্ত সময়।


তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ কেজি মধু পাওয়া যায়। আমি এই মাঠে ৮০টি বাক্স ফেলে রেখেছি। প্রতি কেজি মধু বিক্রি করছি ৪০০ টাকা দরে। এই পর্যন্ত এক থেকে দেড় মন মধু সংগ্রহ করেছি। আবহাওয়া ভালো আরও বেশি মধু সংগ্রহ করা সম্ভব বলে জানান তিনি।


সরিষার খেত থেকে সংগ্রহ করা মধু কিনতে আসা এমদাদুল হক জানান, আমি হিলি মাদ্রাসায় খতমে বুখারী অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। দেখতে পেলাম রাস্তার পাশে সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। ৪০০ টাকা কেজি মধু বিক্রি হচ্ছে। আমি নেওয়ার উদ্দেশ্য এসেছি। আপনারা ও খাঁটি মধু এখানে চলে আসতে পারেন। আসল মধুর যে একটা স্বাদ আছে সেটা সরিষা ফুল থেকে সংগ্রহ করা মধুতে পেলাম এবং মৌচাষিদের সরিষার হলুদ ফুল থেকে মধু সংগ্রহ পদ্ধতিটা আমার কাছে খুব ভালো লেগেছে।


হাকিমপুর পৌরসভার বাসিন্দা সোহরাব হোসেন জানান, আমি ব্যক্তিগত কাজে মোটরসাইকেল যোগে হিলি শহরে যাচ্ছিলাম হাঠাৎ রাস্তার পাশে সরিষার হলুদ ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা দেখতে পেয়ে নেমে আসলাম। তাদের মধু সংগ্রহ বিষয়টি নিজ চোখে দেখলাম। দুই ধরনের মধু খেয়ে দেখলাম একটা জমাট বাঁধা ও একটা তরল। আসলেই অরিজিনাল মধুর যে স্বাদ তা এই মধুতে আছে, তাই ৪০০ টাকা দিয়ে এক কেজি কিনে নিলাম।


হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. আরজেনা বেগম জানান, এবার হাকিমপুর উপজেলায় সরিষার আবাদ বেড়েছে। রবি মৌসুমে এবারে হাকিমপুর উপজেলায় ৩৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ৩৭০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সরিষা চাষের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ১৪০০ জন কৃষককে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ফলে চাষিরা সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ১ টি পৌরসভাসহ ৩টি ইউনিয়নে ৩৭০০'শ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তা ও মাঠ কর্মীরা সরিষা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির চাষ হলে সরিষার ফলন ১০ গুণ বেড়ে যায়। এতে সরিষার ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সরিষা খেত থেকে বিনা খরচে মধু সংগ্রহও একটা লাভজনক ব্যাবসা। এর ফলে একদিকে মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে যেমন লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সরিয়া খেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলনও বাড়ছে।


বিবার্তা/রববানী/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com