
আধুনিক জীবযাপনের এই যুগে দিনের দীর্ঘ একটি সময় স্মার্টফোন নিয়ে পড়ে থাকা হয় আমাদের। কারণে-অকারণে ফোন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, যা কিছুতে বুঝতেই পারা যায় না। কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা বা নিউজফিডে রিঅ্যাকশন ও কমেন্ট করা, কখনো রিলস বা শর্টস দেখা হয়, পডকাস্ট শোনা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে কথাও বলা হয়।
ফোনের এই ব্যবহার বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে স্বাভাবিক মনে হলেও বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে ভয়াবহ জৈবিক সংকট রয়েছে। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম চোখের শুধু ক্ষতিই করে না। একইসঙ্গে মস্তিষ্কের বয়সও বাড়াচ্ছে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধমূলক যাবতীয় ক্ষমতা ধ্বংস করছে।
হাতে থাকা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের এলইডি স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো শরীরের মেলানিন হরমোন উৎপাদনে বাধা প্রদান করেন। মেলানিন মস্তিষ্ককে ঘুমের সংকেত পাঠিয়ে থাকে। এলইডি স্ক্রিনের নীল আলো নিউরনের ডেনড্রাইটিক স্পাইন (স্মৃতি সংরক্ষণের জায়গা) শুকিয়ে ফেলে। এতে শেখার ও মনে রাখার মতো কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়।
আবার রাতে স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বৃদ্ধি পায়, যা বিষণ্নতা ও মেজাজ খিটখিটে করে তোলার অন্যতম কারণ।
২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিচমন্ড ইন্টিগ্রেটিভ অ্যান্ড ফাংশনাল মেডিসিনের গবেষক আরন হার্টম্যান ও আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিট কলেজ, কর্কের পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের প্রতি আসক্তির কারণে মানবদেহের পাকস্থলীর উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োম ধ্বংস হয়। শরীরের ৯০ শতাংশ সেরোটোনিন বা হ্যাপি হরমোন এই পাকস্থলীতে তৈরি হয়ে থাকে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে পাকস্থলীর ভারসাম্য ক্রমশ নষ্ট হতে থাকলে তা সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। আর এই অবস্থাকে ডিজিটাল ওবেসিটি বলে অভিহিত করেছেন বিজ্ঞানী জন লা পুমা। তিনি জানান, মস্তিষ্ক এখন অতিরিক্ত তথ্যে ভারাক্রান্ত হলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি বা বিশ্রাম থেকে কিন্তু বঞ্চিত। ক্রমশ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং স্ক্রিন স্ট্রিস মস্তিষ্কে একধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। এটিকে প্রদাহজনিক বার্ধক্যও বলা যায়।
এদিকে ভার্চ্যুয়াল লাইট বা কৃত্রিম আলো থেকে পাকস্থলীর দেয়াল পাতলা হয়। এতে ক্ষতিকর প্রোটিন রক্তে মিশে গিয়ে মস্তিস্কে পৌঁছায়। যা ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারসের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। এছাড়া ফোনের নোটিফিকিশেন ডোমিনের ছোট্ট ডোজ দিয়ে থাকে মস্তিষ্ককে। ফলে মস্তিষ্ক এর ওপর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে অধিকতর উদ্দীপনা খোঁজে, যা মাদক নেশার মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর।
তবে সুখবর হচ্ছে, এসব ক্ষতিকর দিকগুলোও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন। বলা হয়েছে, লাইফস্টাইলে কিছু পরিবর্তন আনা গেলে সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি পুনরায় আগের মতো কাজ শুরু করে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুমের সময় কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। বেলা গড়ানো শুরু করলে বা তিনটার পর চা-কফি বা ক্যাফেইন-জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। সঙ্গে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো অভ্যাস করা গেলেই উল্লেখিত সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]