সরকার কিনছে শুকনো ধান, ভেজা নিয়ে বিপাকে কৃষক
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ১২:০০
সরকার কিনছে শুকনো ধান, ভেজা নিয়ে বিপাকে কৃষক
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার অধিকাংশ হাওরই এখন পানিতে থৈ থৈ করছে। তার নিচে রয়েছে লাখো কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। এপ্রিলের শুরুতে হাওর কিছুটা জলমগ্ন হলেও মাসের তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কৃষকের স্বপ্ন একেবারে ডুবে গেছে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান। ৩ মে থেকে শুরু হওয়া এই ধান সংগ্রহ চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।


কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব জেলার কৃষকের বেশিরভাগ ধান পানির নিচে। কোনও কোনও কৃষক কিছু ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় সেসব ধান শুকাতে বেগ পেতে হচ্ছে। অনেক ধান চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে খলায়। ক্ষতি কমাতে কোনও কোনও জায়গায় কৃষক কাঁচা ধানই সিদ্ধ করছেন। এ অবস্থায় সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও বিক্রির কোনও উপায় নেই।


কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে ধান সংগ্রহ অভিযান


কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান। রবিবার সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলা খাদ্য বিভাগের উদ্যোগে কিশোরগঞ্জে ধান সংগ্রহের এ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।


জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ১৩টি উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে (প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা) মোট ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারবেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কোনও নগদ লেনদেন করা হবে না। ধানের পুরো মূল্য সরাসরি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষক কার্ডধারীদের পাশাপাশি কৃষি অফিসের তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেও ধান সংগ্রহ করা হবে।


কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলা থেকে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আজ থেকে কেজি প্রতি ৩৬ টাকা দরে কেনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে ভেজা বা নিম্নমানের ধান কোনোভাবেই কেনা হবে না।’


হাওরের একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, মানসম্মত ও শুকনো ধান কিনবে সরকার। এমন শর্ত থাকায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় আর্দ্রতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আবার শ্রমিক সংকটের কারণে মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ ধানই ভেজা, বাকিগুলো পানির নিচে। ফলে এখন কোনও শুকনো ধান কৃষকের কাছে নেই। যেগুলো খলায়, তার সবই ভেজা ধান।


কিশোরগঞ্জে গত কয়েকদিন বৃষ্টিপাত থাকলেও আজ ছিল না। তবে রোদ ওঠেনি। উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি স্থির হয়ে আছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, বৃষ্টি ও ঢলে রবিবার বিকাল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের ১০ হাজার ৩৫ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে। এতে অন্তত ৩৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেশি ক্ষতি হয়েছে বিশেষ করে গত দুই দিনে ইটনা উপজেলার হাওরে। সেখানে দুদিনে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। প্রতি পাঁচ হাজার হেক্টরে গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত ধান উৎপাদনের আশা ছিল। প্রায় সব ফসলই পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। হিসাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি।


ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক মিজ্‌ সোহানা নাসরিন হাওরের কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যেসব কৃষক এই মৌসুমে ফসল ঘরে তুলতে পারেননি, তারা যেন কষ্টে না থাকেন সেজন্য সরকার আগামী তিন মাস বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।


অষ্টগ্রাম উপজেলার আবদুল্লাপুর ইউনিয়নের কৃষক ফুল মিয়া বলেন, ‘বেশিরভাগ জমির ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। পানি থেকে কিছু ধান সংগ্রহ করলেও সেগুলো ভেজা। সরকার শুকনো ধান ছাড়া কিনবে না। কিন্তু এখন বৃষ্টিতে ধান শুকানোর অবস্থা নেই। খলায় পড়ে থাকা কিছু কিছু ভেজা ধানে চারা গজাচ্ছে। এত শুকনো ধান আমরা কই পাবো। শুকনো ছাড়া খাদ্য অফিস ধান না কিনলে আমাদের কোনও উপকার হবে না। আধা শুকনো ধান পাইকার যা দেয়, তাতেই বিক্রি করে দিচ্ছি।’


একই অবস্থা সুনামগঞ্জ জেলার কৃষকদেরও


সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো ধান সংগ্রহ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। রবিবার সদর উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁওয়ের কৃষক আছদ্দর আলীর ৫০ মণ ধান নেওয়ার মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জেরিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা বিএম মুশফিকুর রহমান, সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শাহীনূর রেজা, খাদ্য পরিদর্শক মো. রাকিবুল হাসান, খাদ্য পরিদর্শক কামনা রঞ্জন দাস, যুবদল নেতা রাকিবুল হাসান দিলু।


জেলা খাদ্য বিভাগ জানায়, এ বছর জেলায় ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা দামে কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান সংগ্রহ করা হবে। ভেজা ধান কেনা হবে না।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১২ উপজেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে বিস্তীর্ণ হাওর এখন পানিতে নিমজ্জিত। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জেলার বিভিন্ন হাওরে ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব জমি থেকে অন্তত ৭৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ধান উৎপাদনের আশা ছিল। প্রায় সব ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকার বেশি। প্রতি হেক্টরে পাঁচ জন করে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। সবমিলিয়ে ১৬ হাজার হেক্টরে ৮০ হাজার কৃষক ফসল হারিয়েছেন।


জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনা হাওরের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী বলেন, কষ্ট করে আবাদ করা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কিছু জমিতে কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছি, বাকিটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংসার চালানো, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তবে ধান বিক্রি করতে পারবো না, কারণ সব ধানই খলায় ভেজা অবস্থায় আছে। কোনও রোদ নেই। ভেজা ধানের উল্টো চারা গজাচ্ছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি ও রোদ না থাকায় ধান শুকাতে না পারায় কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।’


নেত্রকোনায় ৭০ হাজার কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি


নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলসহ ১০ উপজেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক হিসাবে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জরিপে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।


স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে জেলার কলমাকান্দায় ১৪ হাজার ৬৭৫টি পরিবারের ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর, খালিয়াজুরীতে ১৫ হাজার ১৩৩টি পরিবারের ৬ হাজার ২০০ হেক্টর, মদনে ৮ হাজার ৪৭০টি পরিবারের ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর, সদরের ৩ হাজার ৯৬৫টি পরিবারের ৪৯৫ হেক্টর, বারহাট্টায় ৩ হাজার ৩৬৫টি পরিবারের ৫৮২ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৯ হাজার ৩৪০ পরিবারের ১ হাজার ৩১০ হেক্টর, আটপাড়ায় ৭ হাজার ৫৫০ পরিবারের ১ হাজার ৬০০ হেক্টর, মোহনগঞ্জে ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের ৪৩৪.৫ হেক্টর, পূর্বধলায় ১ হাজার ২৫০ পরিবারের ৩০০ হেক্টর ও দুর্গাপুরে ২ হাজার ৪৫০ পরিবারের ৩২৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা।


তবে স্থানীয়রা জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি। রবিবার বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। প্রতিমন্ত্রী বলেন, পূর্বে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ধান-চাল সংগ্রহ করা হলেও এবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কৃষকদের কাছ থেকে তারা যত পরিমাণ ধান দিতে পারবেন, তা সংগ্রহ করা হবে। প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান ও চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোয়েতাছেমুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে নেত্রকোনায় ২ হাজার ৪১৫ মেট্রিক টন ধান এবং ৫৫ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভেজা ধান কেনা হবে না।


জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওড়াঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। সরকারি হিসেবে হাওড়ে ৬২ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। আর অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতি হয়েছে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ধান।


জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন রবিবার জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে আছে। আর ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।


জেলার একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, তাদের বেশিরভাগ ধান পানিতে তলিয়ে পচে গেছে। যেগুলো শুরুতে কেটেছেন, রোদ না থাকায় সেগুলোতে চারা গজিয়ে গেছে। ফলে ধান সংগ্রহ শুরু হলেও বিক্রির উপযোগী নেই।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com