এস এম সুলতান; মাটির মানুষের মহাকাব্য ও অন্তর্নিহিত শক্তির শিল্পী
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২০
এস এম সুলতান; মাটির মানুষের মহাকাব্য ও অন্তর্নিহিত শক্তির শিল্পী
এফ এম শাহীন
প্রিন্ট অঅ-অ+

যে মানুষকে ইতিহাস বারবার প্রান্তে সরিয়ে রাখে, শিল্পের ক্যানভাসে তাঁকেই কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এস এম সুলতান। তাঁর ছবিতে কৃষক শুধু জীবিকার তাগিদে শ্রমরত মানুষ নন; তাঁরা সভ্যতার নির্মাতা, প্রকৃতির সহযোদ্ধা এবং মানবিক মর্যাদার অনন্য প্রতীক।


পৃথিবীর শিল্প-ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা কেবল দৃশ্যমান জগৎকে রং ও রেখায় ধারণ করেন না, বরং পরিচিত বাস্তবতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে আবিষ্কার করেন। তাঁদের শিল্প দর্শকের চোখকে শুধু মুগ্ধ করে না, তার চিন্তা ও বিবেককেও আলোড়িত করে। বাংলাদেশের বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, যিনি মানুষের কাছে লাল মিয়া নামে পরিচিত, ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী শিল্পস্রষ্টা। তাঁর শিল্পের কেন্দ্রে ছিল বাংলার মাটি, প্রকৃতি, কৃষক, শ্রম এবং মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি। তাঁর ক্যানভাসে গ্রামীণ জীবন নিছক জীবনযাপনের ছবি হয়ে ওঠেনি; তা রূপ নিয়েছে মানবসভ্যতার এক বিস্তৃত দার্শনিক ভাষ্যে।


১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলার নড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল স্বাধীনচেতা, বাঁধনহীন এক শিল্পীসত্তা। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নির্ধারিত পথ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের অনুশাসন তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেনি। কলকাতার আর্ট স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি শিল্পের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ সম্পূর্ণ না করেই বৃহত্তর পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়েন।


তাঁর এই যাত্রা ছিল এক অর্থে জীবনকে প্রত্যক্ষ করার যাত্রা। মানুষের মুখ, প্রকৃতির বৈচিত্র্য, সমাজের শ্রেণিবিন্যাস এবং জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পচর্চার অনানুষ্ঠানিক পাঠশালা।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। বিদেশি সৈন্যদের প্রতিকৃতি এঁকে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের নানা রূপ ধারণ করেছেন তাঁর ছবিতে। ১৯৪৬ সালে সিমলায় তাঁর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর পাকিস্তানের করাচি ও লাহোরের শিল্পপরিমণ্ডলেও তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়; পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্পপরিসরেও তাঁর কাজের পরিচিতি বিস্তৃত হয়, সেই সাথে বিশ্বসভায় উচ্চারিত নতুন এক শিল্পীর নাম।


তবে সুলতানের শিল্পীজীবনের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কিংবা শিল্পমহলের স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অনন্যতা নিহিত রয়েছে শিল্পের বিষয় নির্বাচন, মানুষকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রচলিত সৌন্দর্যবোধকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার সাহসের মধ্যে।


এস এম সুলতানের ক্যানভাসে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বাংলার কৃষক-কৃষাণি, শ্রমজীবী মানুষ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু তাঁর আঁকা মানুষ বাস্তবের পরিচিত অবয়বের হুবহু প্রতিলিপি নয়। তাঁদের দেহ বিশাল, পেশিবহুল ও শক্তিশালী। তাঁদের শরীরের গঠন যেন প্রচলিত বাস্তবতার সীমানা অতিক্রম করে এক বৃহত্তর সত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।


প্রশ্ন উঠতে পারে, দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও সামাজিক বঞ্চনায় আক্রান্ত বাংলার কৃষকদের তিনি এত বলিষ্ঠ করে আঁকলেন কেন?


এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সুলতানের শিল্পদর্শনের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। তাঁর কাছে মানুষের বাহ্যিক অবয়বই মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় ছিল না। তিনি দেখতে চেয়েছেন মানুষের ভেতরের শক্তি, তার শ্রমের ক্ষমতা, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য এবং পৃথিবীকে প্রতিদিন নতুন করে সৃষ্টি করার অবদান।


তাঁর শিল্পভাবনার সঙ্গে যুক্ত 'The Inner Strength' বা অন্তর্নিহিত শক্তির ধারণা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বুঝতে সাহায্য করে। কৃষকের শরীরের পেশিতে তিনি শুধু শারীরিক সক্ষমতা দেখেননি; দেখেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস। যে মানুষ মাটিতে বীজ বোনেন, ফসল ফলান, নদীতে মাছ ধরেন কিংবা তাঁতে কাপড় বোনেন, তাঁর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে বৃহত্তর সমাজের অস্তিত্ব।


অথচ সভ্যতার ইতিহাসে এই মানুষেরাই প্রায়শ অবহেলিত। তাঁদের উৎপাদিত সম্পদ সমাজের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণ করে, কিন্তু সেই সমৃদ্ধির বণ্টনে তাঁরা অনেক সময় বঞ্চিত থাকেন। তাঁদের শ্রমকে প্রয়োজনীয় বলে স্বীকার করা হয়, অথচ তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ও অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।


সুলতানের শিল্প এই বৈপরীত্যকে নীরবে প্রশ্ন করে। তিনি কৃষককে ক্যানভাসের কেন্দ্রে বসিয়ে প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষকে। তাঁর ছবিতে কৃষকের বিশাল অবয়ব তাই কেবল শৈল্পিক কল্পনা নয়; তা মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি নান্দনিক ও দার্শনিক অবস্থান।


ইতিহাস সাধারণত রাজা, শাসক, বিজেতা এবং ক্ষমতাবানদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বর্ণিত হয়। কিন্তু কোনো সভ্যতার অস্তিত্ব কি কেবল শাসকের সিদ্ধান্তে টিকে থাকে? ইতিহাসের দৃশ্যমান মঞ্চের বাইরে যে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন শ্রম দিয়ে জীবনকে সচল রাখেন, তাঁদের অবদান ছাড়া কি মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব?


এস এম সুলতানের শিল্প এই প্রশ্নগুলোর সামনে আমাদের দাঁড় করায়।


তাঁর কৃষক কোনো সাম্রাজ্য জয় করেন না, কোনো সিংহাসন দখল করেন না, কোনো বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন না। অথচ তাঁদের হাতেই উৎপাদিত হয় মানুষের খাদ্য, তাঁদের শ্রমে টিকে থাকে গ্রামীণ অর্থনীতি, তাঁদের জীবনসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলে সভ্যতা। এই অর্থে সুলতানের কৃষকেরা এক বিকল্প মহাকাব্যের নায়ক—যাঁদের বীরত্বের মাপকাঠি যুদ্ধজয় নয়, বরং জীবনকে ধারণ ও পুনর্নির্মাণের ক্ষমতা।


তাঁর শিল্পের মহাকাব্যিকতা এখানেই যে, তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে অসাধারণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে মানুষকে সমাজ প্রায়ই প্রান্তিক করে রাখে, তাঁকেই তিনি শিল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। যে শ্রমকে অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে দেখা হয়, তার মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করেছেন সৌন্দর্য, শক্তি ও মানবিক মহত্ত্ব।


এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়; এটি বিশ্বজনীন। পৃথিবীর যেকোনো সমাজে শ্রমজীবী মানুষের অবদান, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে সুলতানের শিল্প নতুন করে ভাবতে শেখায়।


সুলতানের চিত্রজগতে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়। প্রকৃতি তাঁর কাছে নিছক পটভূমি নয়, বরং মানুষের জীবন, শ্রম ও অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাটি, জল, ফসল, বৃক্ষ এবং মানুষের দেহ সেখানে পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ।


এই সম্পর্কের মধ্যে নিহিত রয়েছে তাঁর শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মাত্রা। আধুনিক সভ্যতা যখন প্রকৃতিকে প্রায়শ উৎপাদন ও ভোগের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করে, তখন সুলতানের চিত্রভুবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারকারী একমাত্র শক্তি নয়; মানুষ নিজেও প্রকৃতির বৃহত্তর জীবপ্রবাহের অংশ।


কৃষকের শক্তি তাই প্রকৃতিকে পরাজিত করার শক্তি নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে জীবন সৃষ্টির শক্তি। এই উপলব্ধি বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের আলোচনাতেও তাৎপর্য বহন করে।


একজন শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির অর্থ কখনো চূড়ান্তভাবে স্থির হয়ে যায় না। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শিল্প নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়। এস এম সুলতানের শিল্পও তেমনই এক অনবরত পাঠের বিষয়।


তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করা। আমরা কি তাঁদের শুধু উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে দেখি, নাকি সমাজ ও সভ্যতার নির্মাতা হিসেবে তাঁদের যথাযথ মর্যাদা দিই? আমরা কি সৌন্দর্যকে কেবল অভিজাত জীবনের পরিসরে খুঁজি, নাকি মাটির মানুষের ঘাম, সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীলতার মধ্যেও তার সন্ধান করি?


এস এম সুলতানের শিল্প এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আমাদের সহায়তা করে। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক মাথা উঁচু করে দাঁড়ান, শ্রমজীবী মানুষের শরীর ধারণ করে ইতিহাসের শক্তি, আর বাংলার মাটি হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার এক বিস্তৃত উপাখ্যান।


তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই অসামান্য শিল্পীকে। তাঁর শিল্প আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব ক্ষমতার আসনে নয়, সৃষ্টির ক্ষমতায়; বাহ্যিক জৌলুশে নয়, অন্তর্নিহিত শক্তিতে; আর সভ্যতার প্রকৃত গৌরব কেবল তার অর্জনে নয়, সেই অর্জনের পেছনে থাকা মানুষের প্রতি তার সম্মানেও।


এস এম সুলতান ছিলেন মাটির মানুষের শিল্পী। তাঁর তুলিতে কৃষক পেয়েছেন মহাকাব্যের নায়কের মর্যাদা, শ্রম পেয়েছে সৌন্দর্যের ভাষা, আর শিল্প পেয়েছে মানবিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য ব্যাখ্যা।


তিনি আজ আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর ক্যানভাসে মানুষের যে অমর শক্তি প্রকাশিত হয়েছে, তা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে বেঁচে থাকবে।


মহান শিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।


লেখক: এফ এম শাহীন ( লেখক সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা )

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com