
চব্বিশের সেপ্টেম্বরে দায়িত্বে আসার পর বই নির্বাচন নীতিমালার সংস্কার করতে চেয়েছিলেন লেখক আফসানা বেগম। যেন অযোগ্য বই সরিয়ে ভালো বই নেওয়া হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে। এজন্য নীতিমালা সংশোধন করে, সচিব ও মন্ত্রী কোটা ২০ শতাংশ তুলে দিয়ে ১০০ শতাংশ বই নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে আনতে চেয়েছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সদ্য অব্যহতি পাওয়া পরিচালক আফসানা। কিন্তু তাতে সম্মতি ছিল না সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর।
আফসানা বেগম বৃহস্পতিবার রাতে চার পর্বের ফেইসবুক পোস্টে উপদেষ্টার সঙ্গে এ বিষয়ক কথোকপথন প্রকাশ করেছেন।
পোস্টে আফসানা বেগম লেখেন, "ফারুকী ভাই কথা বলা শুরু করেন, ‘কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে। এটা ওদের লাগবে।’ আমি চমকে উঠি, ভাই, কী বলেন, কোটা কেন থাকবে, কোটার জন্যেই না…।"
চব্বিশের অভ্যূত্থানের পরে ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় আফসানা বেগমকে। তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের অনুরোধেই তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
গত মঙ্গলবার আফসানা বেগমকে হুট করেই অব্যহতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আফসানা বেগমের স্থলভিষিক্ত হয়েছেন এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহ, যিনি কবি সাখাওয়াত টিপু নামে পরিচিত।
আফসানা বেগম দায়িত্বে যোগ দেওয়ার পর বই নির্বাচন নীতিমালা সংশোধনে হাত দিয়েছিলেন। আফসানা ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে বলেন, তখন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, তাকে বলেছিলেন- "নীতিমালা এমন হবে, যেন ভালো ভালো বই নেয়া যায়। আর অযোগ্য বই প্রত্যাহার করা যায়।"
নীতিমালা শুধুমাত্র অনুমোদনের কাজ বাকি, আর তখনই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা পরিবর্তন হয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দায়িত্বে আসেন।
আফসানা বেগম লেখেন, "নীতিমালার পুরো বিষয়টা উনাকে (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী) বোঝানোর চেষ্টা করি, আসিফ ভাইয়ের (আসিফ নজরুল) মেইলগুলো পাঠাই, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাই না। শেষে অনেক অনুরোধের পরে একদিন একটা বড়ো কমিটি বসে। উপকমিটি সরাসরি নীতিমালা অনুমোদনের কাজ করবে বলে জানায়।
"তখন সমস্যা হয় ওই মন্ত্রী, সচিব ২০% কোটায়। এটা থাকবে কি থাকবে না সে নিয়ে ফারুকী ভাই আমার সাথে বসতে চান। কিন্তু কোনোভাবেই তার সময় পাওয়া যায় না। এ নিয়ে দিনের পর দিন সময় দিয়ে, অফিসে বসিয়ে রেখে উনি মিটিং বাতিল করেন। শেষে একদিন ঘর ভরা লোকের মাঝখানে উনি আমাকে কথা বলতে দেন।
"আমি বলা শুরু করি, কোটা না থাকলে কার্যকর লাইব্রেরি অনেক বেশি টাকা পাবে। তাদের খুব উপকার হবে। অন্যদিকে খারাপ বইয়ের বোঝা কমবে। কারণ নীতিমালা অনুযায়ী কোটায় কোনো বই নির্বাচন পদ্ধতি (ক্যাটালগ জমা নেয়া, বই বেছে নেয়া) অনুসরণ করা হয় না। আবার কোটায় আসা লাইব্রেরিরও কোনো পরিদর্শন রিপোর্ট লাগে না। যারাই সচিব বা মন্ত্রীকে পটাতে পারেন, তাদেরই লাইব্রেরি নির্বাচিত হয়। সাধারণ তালিকায় হিসাবের নিয়ম থাকলেও কোটার অধীনে যত ইচ্ছা তত কপি বই, যত ইচ্ছা তত টাকা অনুদান যায় লাইব্রেরিতে। অযোগ্য অপাঠ্য বইগুলো তখন সাধারণ লাইব্রেরিকে জোর করে নিতে হয়।"
'আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা’- এক হাজার কপি কিনেছিল গ্রন্থকেন্দ্র
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তো বটেই, বহু সরকারি কর্মকর্তার বই নেওয়া হত বলেও লিখেছেন আফসানা।
তিনি ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, "একজন অতিরিক্ত সচিবের লেখা, ‘আমার স্ত্রীর জন্মদিনে লেখা ৫০ কবিতা’ বইটি, প্রচ্ছদে স্ত্রীর ছবি। এই বই গ্রন্থকেন্দ্র এক হাজার কপি কিনেছিল।"
আগের আওয়ামী আমলের মত একটি পেপার কাটিংসম্বলিত একটি বইয়ের দাম ১৫,০০০টাকা, অনেক চাপ আসার পরেও সেই বই নিতে বাধা দিয়েছেন বলে পোস্টে লিখেছেন আফসানা।
তার ভাষ্য, "আগে হাসিনার লেখা বই একেকটি ৭,০০০-৩০,০০০ টাকায় পর্যন্ত কিনেছে গ্রন্থকেন্দ্র। বিশেষ কোটায়।
“যে কোনো মূল্যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও মানহীন বইয়ের বিপক্ষে আমার অবস্থান ছিল।“
‘কোটা থাকুক, পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে, এটা ওদের লাগবে’
কোটা নিয়ে ফারুকীর বক্তব্য তুলে ধরতে আফসানা বেগম লিখেছেন, “যা হোক, ফারুকী ভাই কথা বলা শুরু করেন, ‘কোটা থাকুক। পরবর্তী সরকার এসে ব্যবহার করবে। এটা ওদের লাগবে।
“আমি চমকে উঠি, ‘ভাই, কী বলেন, কোটা কেন থাকবে, কোটার জন্যেই না. . .’
“আপনি বুঝতে পারছেন না, কোটা না থাকলে পরের সরকার অনুরোধের বইগুলো কীভাবে কিনবে? আর কত লাইব্রেরি অনুরোধ নিয়ে আসে জানেন?’
“ভাই, আমরা কি পরবর্তী সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছি? আমাদের নিজেদের কোনো অ্যাজেন্ডা নাই? এই দেখেন আজকে আমি কীরকম বইগুলো পেয়েছি স্টকে। একটা ভালো সাহিত্য নাই। গবেষণা নাই। এদেশে গত চল্লিশ বছরে কত সাহিত্যিক, কবি, গবেষক গড়ে উঠেছে, তার কোনো ছাপ গ্রন্থকেন্দ্রে নাই। কোটাটা তুওে দেন, ভাই, আসিফ ভাই কিন্তু কোটা...”
‘আহা আপনি এটাকে শুধু শুধু কোটা বলছেন কেন’, ফারুকী ভাই বিরক্ত হন।
‘এটা তো কোটাই। নীতিমালায় তো এটাকে কোটা বলা হয়েছে। এটা হলো গিয়ে তাদের জন্য একটা সুবিধা। এটার থাকার দরকার আছে। আমার কাছে তো অনেক অনুরোধ আসে, আপনার কাছে আসে না?’ ফারুকী ভাই সচিব সাহেবের দিকে তাকান। সচিব সাহেব বলেন, ‘জি স্যার। অনেক অনুরোধ আসে।’ ফারুকী ভাই বলেন, ‘তাহলে? জিনিসটা তো ফ্লেক্সিবল রাখতে হবে। পরের সরকারে যারা আসবে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে। এটা তুলে দিলে তখন আমি কী জবাব দেব?”
আফসানা লিখেছেন, “সেধে এতটা অপমান নেয়ার পরে আর কথা জুটছিল না আমার মুখে। তবে খুব বলতে ইচ্ছা করছিল যে, আপনি আর আমি এখানে কোটা আন্দোলনের পথ ধরে হেঁটে হেঁটে এখানে এসেছি। আর এখন আপনি আমাকে কোটা থাকার যুক্তি বোঝাচ্ছেন?”
এই পর্যায়ে এসে ফারুকীর কথা তুলে ধরে আফসানা বলেন, “যা হোক, ফারুকী ভাই একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘এক কাজ করেন, কোটা শব্দটা তুলে দেন। এটা তো ভালোর জন্য, ওটাকে অন্যভাবে বলেন।
“ঘরের মানুষগুলো তখন একটু নড়েচড়ে উঠলেন। ওটাকে কীভাবে বলা যেতে পারে এ নিয়ে আইডিয়া জেনারেশন শুরু হলো। ফারুকী ভাই বললেন, ‘মনে করেন সংরক্ষিত বা এরকম কিছু? কিন্তু এটা রাখতে হবে।”
আফসানা বেগম চার পর্বের ধারাবাহিক লেখায় গ্রন্থকেন্দ্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং তাকে অব্যহতি দেওয়ার নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। তার দীর্ঘ লেখায় ওঠে এসেছে মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, গ্রন্থকেন্দ্রের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের অবহেলার নানা চিত্র।
‘গ্রন্থকেন্দ্রের একেকটা ফাইল দুই থেকে আড়াই মাস করে মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকত’ বলেও অভিযোগ করেন আফসানা বেগম।
তিনি লিখেছেন, "দুঃখজনক হলো উপদেষ্টা বা সচিব কখনো আমাদের ডেকে জানতে চাননি যে, গ্রন্থকেন্দ্রের আসলে কাজটা কী বলেন তো? গ্রন্থকেন্দ্র নিয়ে কী কী করা যেতে পারে? কীভাবে এই প্রতিষ্ঠান মানুষের উপকারে আসতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা অফিসে বসে বহুবার আলাপে আলাপে মুখস্ত করেছি, কিন্তু কেউ কোনোদিন আমাদের জিজ্ঞেস করেননি। হয়ত তারা আমাদের কাছে কেবল রুটিন কাজই চাইতেন।"
'চুরি করা ভারতীয় বই'
আফসানা বেগম লেখেন, "১৯৯৫ সালের আইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে যে কাজের পরিধি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা বিপুল, ব্যাপক। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের, প্রকাশক-লেখকদের এবং সাধারণ মানুষের গ্রন্থকেন্দ্র সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি হলো 'গ্রন্থকেন্দ্র বই কেনে'। মন্ত্রণালয় ভাবে 'বছরে বই কেনার আর বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়াই গ্রন্থকেন্দ্রের একমাত্র কাজ'।"
প্রকাশকদের সমালোচনা করে আফসানা বেগম লেখেন, "ভারতীয় বইকে ফটোকপি করে প্রকাশ করছেন, চিরায়ত বলে নিম্নমানের মুদ্রণ করছেন, একই বই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশনার নামে প্রকাশ করে গ্রন্থকেন্দ্রে বিক্রির উদ্দেশ্যে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটালগ জমা দিচ্ছেন, কিন্তু প্রকাশ্য-চাতুরিতে গলাবাজি থামাচ্ছেন না।"
"এইটুকু দেশে প্রকাশনা শিল্পের বেহাল দশার মধ্যে সাড়ে পাঁচশ প্রকাশক কী করে গজায় তার বিস্তারিত ডিসপ্লে দেখলাম গ্রন্থকেন্দ্রে গিয়ে। আগাগোড়া ফটোকপি বই, প্রকাশনা করতে একটি টাকা বিনিয়োগ নেই, কিন্তু তার বই গ্রন্থকেন্দ্রকে কিনতেই হবে। মুখে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধ ফেনা, আর হাতে চুরি করা ভারতীয় বই।"
অনুবাদের অবস্থাকে 'সবচেয়ে আশঙ্কাজনক' বলেও মন্তব্য করেন আফসানা বেগম। তিনি লেখেন, "যে বই ইউরোপে-আমেরিকায়-ভারতে বেস্ট সেলার হচ্ছে, সেই বই অনুবাদ হয়ে চলে এসেছে। 'আবোল তাবোল' ভাষার এআই দিয়ে করা অনুবাদ, কিন্তু সেসব বই কিনতে হবে, সাহিত্যের বদলে গাট্টি গাট্টি মোটিভেশনাল বই কিনতে হবে।"
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে কেমন করে সম্পাদনার প্রশিক্ষণ, প্রকাশনার উন্নয়ন, কপিরাইটের প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক বইমেলা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করা যায়, এসব নিয়ে কখনো সাধারণ প্রকাশকদের কোনো আগ্রহ দেখেননি বলেও জানান আফসানা বেগম।
'উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে আপনার কিন্তু একটা গ্যাপ আছে'
আফসানা বেগম লেখেন, "জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র যেহেতু সংস্কারের জন্য কোনো মনোযোগ পায়নি। তাই আমরা নিজেই একটা সংস্কার প্রস্তাব লিখেছিলাম...।"
"সংস্কার প্রস্তাব দুবার প্রিন্ট করে দিয়ে এসেছি। কারণ তারিখ দেয়ার পরে সেই তারিখে গেলে দেখা যায় সচিব মহোদয় তাঁর টেবিলের উপরে এদিকওদিক সংস্কার প্রস্তাবটা খুঁজছেন। খুঁজে পাচ্ছেন না, পিএসকে জিজ্ঞেস করছেন। তাই বরাবর হাতে প্রিন্ট করেই নিয়ে যেতাম।
“একবার বোর্ড মিটিংয়ের পরে রিডিং পড়ে শুনিয়ে সচিব মহোদয়ের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি আমি। উনি শুনছেন কি শুনছেন না বোঝা যায় না, অবহেলাভরে জয়েন্ট সেক্রেটারি শাখাপ্রধানকে বলেন, ‘এগুলো থেকে মূল বিষয়টা বের করে আনো তো।’ উনি যখনই একটা তারিখ দিতেন, সেই তারিখে গিয়ে আবারো একই অনুরোধ করতাম আমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার নিয়ে বসুন অনুগ্রহ করে। উনি আবারো তারিখ দিতেন। শেষ তারিখ দিয়েছিলেন গত ১৫ জানুয়ারি।"
সেদিন সংস্কার প্রস্তাবের কথা বলতেই উনি আমাকে জানালেন যে, ‘হয়েছে কী, উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে আপনার কিন্তু একটা গ্যাপ আছে।’ আমি বললাম, ‘সেটা আমার জানা নেই, তিনি বলতে পারবেন।’
উনি বললেন আমি পাঠাগারের অনুদানের ফান্ডের কোটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি সেটা তাঁর ভালো লাগেনি।"
তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে অনুষ্ঠানে 'নাখোশ'
গ্রন্থকেন্দ্র থেকে তাজউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী পালন করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সচিব 'নাখোশ' ছিলেন বলেও জানান আফসানা বেগম।
ফেইসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, "মনে আছে জন্মদিন পালনের পরের দিন সচিব সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যাবলী উনার সামনে খোলা ছিল। উনি উচ্চারণ করে পড়ছিলেন। আমি ব্যাখ্যা করেছিলাম মন্ত্রণালয় যখন মঈদুল হাসানকে একুশে পদক দিয়েছিল, যিনি তাজউদ্দীনকে নিয়ে লিখতে ও পড়তেই পছন্দ করেন, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি প্রস্তাব দেয়াতে আমারো মনে হয়েছিল শিক্ষার্থীদের তাজউদ্দীনের কথা জানানো উচিত। আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবকে কাল্ট বানানোর নেশায় তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, কিন্তু দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বা যুদ্ধকালীন উপস্থিত নায়কের কথা শিক্ষার্থীদের জানার অধিকার আছে বলে আমি মনে করেছিলাম।"
তিনি বলেন, "পাঠ কার্যক্রমের সময়ে দেখি সারা দেশের কলেজের শিক্ষার্থীরাও তাজউদ্দীনকে চেনে না। মঈদুল হাসান সেই অনুষ্ঠানে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ থেকে পচাত্তর অবধি দুঃশাসশনের কথা বলে যান। মনে আছে অনুষ্ঠানের পরের দিন এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমাকে জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছিল। কেন খবর দিইনি। আমি চিঠি দেখিয়েছি। ফেসবুকে প্রচার করেছি, সেটাও দেখিয়েছি।
"অনুষ্ঠানের বিষয়ে লেখক মঈদুল হাসানের কথা বলাতে তিনি হেসে বিষয়টা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে তো সরকার অনেক কাজ দিয়েছে দেখি!'
নির্বাচনের কয়েকদিন আগে কী কারণে বহিষ্কার?
গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ও প্রতিষ্ঠানের সংষ্কার ভাবনাকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা হিসেবে তাকে অব্যহতি দেওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিন মানুষের মনে থাকবে বলে মনে করেন আফসানা বেগম।
তিনি লেখেন, "এক মুখে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের কথা ও পরমুহূর্তেই সেই স্পিরিটের বিপক্ষে কাজ করার দ্বিচারিতা হিসেবে এই ঘটনা উল্লেখ করা হবে। মানুষের সৎ প্রচেষ্টা যে দলগত নির্বুদ্ধিতা ও অসততার কাছে জিম্মি তার প্রমাণ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উত্থানকে ঠেকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা। একে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে দেয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া।
"ভালো বই লাইব্রেরিতে যাবে না, কোটায় নিম্নমানের বই কেনা হবে। আমাকে যেমন দিনের একটা সময়ে আগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত কুৎসিত বইগুলো বেছে আলাদা করতে হতো, পরের অনেক পরিচালককে সেটাই করতে হবে। একের পর এক আমল আসবে-যাবে, কিন্তু গ্রন্থকেন্দ্র মানুষের করের টাকায় ভালো সাহিত্যের জায়গায় অপ্রয়োজনীয় বইয়ের স্তূপ লাইব্রেরিতে পাঠাবে। আমল গেলেই আবারো তা উপরের কোনো ঘরে লুকিয়ে রাখতে হবে। কোটায় কাগজের লাইব্রেরিকে লাখ লাখ টাকা দেয়া হবে। এটাই ভবিতব্য।"
কী কারণে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অন্য ব্যস্ততা ফেলে জরুরি ভিত্তিতে বহিষ্কার করা হলো, সেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে আফসানা বেগম লেখেন, "তবুও আমাকে বলতে হবে যে, জ্ঞানত আমি এমন কিছু করিনি যাতে গ্রন্থকেন্দ্রের তথা সরকারের কোনো ক্ষতি হয়...।"
গ্রন্থকেন্দ্রের সহকর্মীদের কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, "শুধু খারাপ লাগে অফিসের প্রিয়জনদের জন্য, যারা আত্মার খুব কাছের হয়ে উঠেছিলেন, আমার কারণে তাঁরা প্রতিষ্ঠান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, জান দিয়ে সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটছিলেন। আমার কারণে যে তাদের সেই স্বপ্নে হতাশা এল, এই বেদনা ভয়াবহ। তাঁরা যেন আমাকে ক্ষমা করেন। হুট করে টিকেট কেটে আমাকে যখন এয়ারপোর্টে দিতে এসেছিলেন তখন পরিণত বয়সের এতগুলো মানুষ অঝোরে কাঁদছিলেন, দেখে আমি দ্রুত এয়ার পোর্টের ভিতরে ঢুকে গেছি।"
সংস্কার কি হবে?
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সংস্কার, সম্ভাবনা ও পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে একটা সেমিনার করার কথা ছিল আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি। এর জন্য সিডাপ মিলনায়তনে বুকিংও দেয়া হয়। আফসানা বেগম কক্সবাজারে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের নিয়ে ডিনারের পরে যখন এ নিয়ে মিটিং করছিলেন, তখনই তিনি জানতে পারেন, তাকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। মিটিং পণ্ড হয়। পরদিন একাই ঢাকায় ফেরেন আফসানা বেগম।
অব্যহতি পাওয়ার পর ফেইসবুক পোস্টের শেষ পর্বে তিনি কি কি কাজ করেছেন৷ আরো কী কী করা যেত, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণও তুলে ধরেন। এই সংস্কার হবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
আফসানা লেখেন, "বাংলাদশে অন্তত ৭০টি শতবর্ষী ও প্রাচীন পাঠাগার আছে, কোনোটা ধুকে ধুকে টিকে আছে, কোনোটা অকার্যকর। পাঠাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহায়তার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। সাহায্যকল্পে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে ইতোমধ্যে তাদের বিচিত্র প্রয়োজনের তথ্য সংগ্রহ করেছে। সরকার চাইলেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে শতবর্ষী পাঠাগারগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে তাদের মডেল পাঠাগার হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে। এতে করে নতুন পাঠাগার গড়ে তোলার চেয়ে অতি অল্প ব্যয়ে দেশ বিশাল ও সমৃদ্ধ বহু পাঠাগার পেয়ে যেতে পারে, যা চৌকষ সরকারের অবদান হিসেবে স্মরিত হবে।"
"লোকবল সন্নিবেশ ও নানান প্রশাসনিক জটিলতায় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আন্তর্জাতিক বইমেলা ও পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম স্থগিত হয়ে আছে। এই দুই কর্মযজ্ঞ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সুনামের নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।"
আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা ও এজেন্টদের প্রণোদনা দিয়ে দেশের প্রখ্যাত গ্রন্থ অনুবাদের ও বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশের সুযোগ গ্রহণ করা জরুরি বলেও মনে করেন আফসানা বেগম।
তিনি লেখেন, "আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন, পাঠাগার সংক্রান্ত গবেষণা, পাঠাগারের ডিজিটাইজেশন এ ধরনের বহু সম্ভাবনাময় কাজ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে করা সম্ভব।"
সরকারী উদ্যোগে গ্রন্থনীতির একটি বাস্তবায়নযোগ্য খসড়া প্রস্তুত করা আছে জানিয়ে আফসানার লেখেন, "সেটির বিষয়ে বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মনোযোগী হতে পারে। যেহেতু সংস্কৃতি নীতি সংস্কারের কাজ চলছে, তার অংশ বলেই, গ্রন্থনীতির অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ছাড়া সংস্কৃতি নীতি অপূর্ণ থেকে যাবে। আর কেবলমাত্র গ্রন্থনীতির বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিলেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র তথা পাঠক সমাজের জন্য যা প্রয়োজন তা-ই করা হবে।"
আফসানার অভিযোগের বিষয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সংস্কৃতি সচিব মফিদুর রহমানের বক্তব্য চেষ্টা করেও জানা সম্ভব হয়নি। সূত্র-বিডি নিউজ
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]