
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের ছোট বোন শাহানা হানিফ এবং স্ত্রী ফারহানা সাঈদের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে শাহানা হানিফের নামে থাকা একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন। দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের আদালতে দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, সাঈদ খোকনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার বোন শাহানা হানিফ ও স্ত্রী ফারহানা সাঈদের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে আবেদনের বিস্তারিত অংশে শাহানা হানিফের হিসাব ও লেনদেনের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, তার নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা হিসাবে ঘোষিত পেশা, অর্থের উৎস ও হিসাব খোলার উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রায় ৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার লেনদেন পাওয়া গেছে।
এছাড়া শাহানা হানিফের নামে নগদ ও এফডিআর আকারে মোট ১৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে দুদক। এসব অর্থ মানিলন্ডারিং-সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে এসেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুদকের আবেদনে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের অর্থ শাহানা হানিফ অবৈধ ঘুষ লেনদেন ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এসব কার্যকলাপ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাঈদ খোকনের পরিবারের হিসাব নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধান
দুদকের এবারের আবেদনের কেন্দ্রে শাহানা হানিফের হিসাব থাকলেও অনুসন্ধানের অভিযোগের প্রেক্ষাপট সাঈদ খোকনকে ঘিরে। আদালতের নথিতে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র হিসেবে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে।
এর আগেও সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব নিয়ে আদালতের আদেশ হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাঈদ খোকন, তার বোন শাহানা হানিফ, স্ত্রী ফারহানা সাঈদ এবং পরিবারের সদস্য জাবেদ আহমেদ ও ফাতেমা খাতুনের নামে থাকা মোট ৭৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়।
ওই আবেদনে দুদক দাবি করেছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন রয়েছে এবং এসব হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর বা উত্তোলনের আশঙ্কা রয়েছে। সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তখন আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এসবই ছিল দুদকের অভিযোগ; আদালতের আদেশ ছিল হিসাব অবরুদ্ধ রাখার বিষয়ে।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাঈদ খোকন, তার বোন শাহানা হানিফ, স্ত্রী ফারহানা সাঈদ ও ভাই জাবেদ আহমেদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিলেন আদালত। দুদকের আবেদনে তাদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন এবং সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছিল।
শাহানা হানিফের যেসব হিসাবের তথ্য দিয়েছে দুদক
এবারের আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত বিবরণীতে শাহানা হানিফের নামে ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংক পিএলসি, এক্সিম ব্যাংক পিএলসি এবং ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বিভিন্ন হিসাব।
দুদকের দেওয়া হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, সিটি ব্যাংকের বনানী লেক ভিউ শাখায় শাহানা হানিফের নামে থাকা একটি ইসলামী সেভিংস ডিলাইট হিসাবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ১ কোটি ২১ লাখ ৩১ হাজার ৫৫৪ টাকা ৪১ পয়সা স্থিতি ছিল। একই ব্যাংকের বনানী শাখার আরেকটি সঞ্চয়ী হিসাবে ৮৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯০৯ টাকা এবং বনানী লেক ভিউ শাখার একটি মানারাহ টার্ম ডিপোজিটে ৬ লাখ ১৫ হাজার ৮৬৯ টাকা থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সিটি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা, পল্টনে থাকা একটি হিসাবে ৯ হাজার ৯৮৬ টাকা থাকার তথ্য রয়েছে।
এক্সিম ব্যাংকের বনানী শাখায় শাহানা হানিফের নামে থাকা একাধিক হিসাবও তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ৬ জুলাই খোলা দুটি মানারাহ টার্ম ডিপোজিটে যথাক্রমে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ২৫২ টাকা ও ১৩ লাখ ৮৬ হাজার ২৫২ টাকা থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের একটি টার্ম ডিপোজিট হিসাবও তালিকায় রয়েছে। নথিতে শাহানা হানিফের নামে থাকা এসব হিসাবের খোলার তারিখ, হিসাবের ধরন ও ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক স্থিতির তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে।
অর্থ সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা, হিসাব অবরুদ্ধের আবেদন
দুদকের আবেদনে বলা হয়, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শাহানা হানিফের বিভিন্ন সঞ্চয়ী, চলতি ও এফডিআর হিসাবে থাকা অর্থ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে এসব অস্থাবর সম্পদ স্থানান্তর বা হস্তান্তর হয়ে গেলে অনুসন্ধানের স্বার্থে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ কারণে অভিযোগটি সুষ্ঠুভাবে অনুসন্ধানের স্বার্থে শাহানা হানিফের নিজ নামে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করার জন্য সিটি ব্যাংক পিএলসি ও ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করে দুদক। আদালত শুনানি শেষে সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
ফারহানা সাঈদের বিষয়ে যা আছে
দুদকের অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে শাহানা হানিফের পাশাপাশি ফারহানা সাঈদের নাম রয়েছে। সেখানে তাদের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবসমূহে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে এবং একই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সাঈদ খোকন ও অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে।
ফারহানা সাঈদ সাঈদ খোকনের স্ত্রী। তবে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এই আবেদনের বিস্তারিত অংশে যে ৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার লেনদেন এবং ১৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার নগদ ও এফডিআর-এর হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা শাহানা হানিফের নামে থাকা হিসাব কেন্দ্র করে। তাই ওই অর্থের সঙ্গে ফারহানা সাঈদের সম্পৃক্ততার নির্দিষ্ট তথ্য এই আবেদনে নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের আদেশে সাঈদ খোকন, তার বোন শাহানা হানিফ ও স্ত্রী ফারহানা সাঈদসহ পরিবারের সদস্যদের ৭৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের অক্টোবরে সাঈদ খোকন ও তার স্ত্রী ফারহানা সাঈদের ব্যাংক হিসাব আয়কর-সংক্রান্ত অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেও জব্দ করা হয়েছিল বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]