মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর আজ
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর আজ
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অঅ-অ+

রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ৩৫ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিন জন শিক্ষক, তিন জন অভিভাবক ও বিমানের একজন পাইলট। আহত ১৭৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ৬৩ জন। আহতরা দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই এখনো স্বাভাবিকে ফিরে আসতে পারেনি।


ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থী যারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, আজও তাদের বুকের ভিতর শূন্যতা আর হাহাকার। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ থামলেও দগদগে বিষাদের সেই ক্ষণ, আকাশ থেকে নেমে আসা আগুনের লেলিহান শিখা, আর্তনাদ, বন্ধুদের হারানোর শোকসহ চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীকে। অভিভাবকরা বলেন, আহত শিক্ষার্থীরা সবকিছুতেই এখন বিরক্ত দেখায়, হঠাত্ রেগে যায়। আকাশে বিমানের আওয়াজ শুনলে এখনো অনেকে আতঙ্কে শিউরে ওঠে ও কান চেপে ধরে। বেশির ভাগই ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, আবার কেউ মাঝ রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর শিশুদের মনে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, যা তারা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কেবল শারীরিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং সেবা শিশুদের স্বাভাবিক শৈশবে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের জন্য এখনো কাঁদেন স্বজন, সহপাঠী ও শিক্ষকরা। আর যারা সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন, তাদের জীবন চলছে এক অজানা আতঙ্কে।


উল্লেখ্য: ২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার সকালটা ছিল একদমই সাধারণ। কলেজের প্রজেক্ট-২ ভবনের প্রতিটি কক্ষে তখন চলছিল পাঠদান। তৃতীয় শ্রেণির ক্লাসরুমে বসে ছিল শিশু শিক্ষার্থীরা। পরনে ইউনিফর্ম আর বইভরা ব্যাগ। এক হাতে খাতা, অন্য হাতে কলম। দুপুর ১টায় ছুটি হয়। বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীর-উত্তম এ কে খন্দকার থেকে বেলা ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়ন করে। ১টা ১৮ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এক মুহূর্তে পালটে যায় সব কিছু। হতবিহ্বল ও দিশাহারা হয়ে শিক্ষার্থীদের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি, চিত্কার, কান্না, ধোঁয়া, ধুলোয় ভরে যায় স্কুল। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এর মধ্য থেকে একের পর এক দগ্ধ শিক্ষার্থী বের করে আনা হয়। বিধ্বস্ত প্লেনটি ছিটকে প্রাইমারি শিক্ষার্থীদের ভবনের সিঁড়ির সামনে চলে যায়। বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটির ‘নাক’ ঢুকে যায় ভবনের সিঁড়ির অংশে, আর এর দুই পাখার আঘাতে পুড়ে ছাই হয় শিশুদের দুটি ক্লাসরুম।


বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাত্ দেখি আগুন ধরা প্লেনটা আমাদের বিল্ডিংয়ে আঘাত করছে। আমার এক বন্ধুই আমার চোখের সামনে মারা গেছে। এই দৃশ্য ভুলতে পারছি না।’ ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের শিক্ষার্থী হাসবিয়া রহমান আঝরা জানান, ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার সময় তারা ক্লাসে ছিল। চারপাশ কেঁপে ওঠা বিকট শব্দ, আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ আর বাচ্চাদের করুণ আর্তনাদ—এই সবই তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। এখন বিমানের শব্দ শুনলে সেই ভয়াবহ স্মৃতি তার মনে পড়ে যায়।


ট্রমা কাটাতে বিশেষ পুনর্বাসনের উদ্যোগ: শিক্ষার্থীদের এই গভীর মানসিক ক্ষত ও ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা এবং ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের পুবাইলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ‘মেন্টাল হিলিং’ বা মানসিক নিরাময় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম পরিবেশ থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তারা দিনভর মেডিটেশন, ছবি আঁঁকা, ফুটবল খেলা এবং উন্মুক্ত কাউন্সেলিং সেশনে অংশ নেয়। নিহত সহপাঠীদের স্মরণে এবং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে এই নিরাময় অনুষ্ঠানে চারাগাছ রোপণ করা হয়।


নিহতদের স্মরণ, আহতদের সুস্থতা কামনা: মাইলস্ট্রোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের সুস্থতা কামনায় দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে এই দোয়া ও স্মরণসভা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কলেজটির অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের স্মরণ করতে এখানে হাজির হয়েছে। তারা নিহত সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। শিক্ষার্থীসহ যারা এ ঘটনায় আহত হয়েছেন, তাদের সুস্থতা কামনা করছে।


দুর্ঘটনাস্থলটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে আজ: এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ এবং আহত ব্যক্তিদের প্রতি সংহতি জানাতে দুই দিনের কর্মসূচি নিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এর অংশ হিসেবে দুর্ঘটনাস্থলটি আজ মঙ্গলবার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে বলে জানান অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার দেবেন। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। স্মৃতিচারণার আয়োজন থাকবে। পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও বিভিন্ন বার্তা প্রদর্শন করা হবে। আজকের আয়োজনে অভিভাবকেরাও উপস্থিত থাকবেন।


বিবার্তা/এমবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)

১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected] ​, [email protected]

© 2026 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com