
স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পর শক্তি হারালেও ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টির জেরে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু বাড়িঘর। ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ পরিষেবা, সড়ক, রেল ও বিমান চলাচল।
এখন পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েও একজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে নিহতদের পরিবার প্রতি পাঁচ লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু।
ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল, ডাল, চিনি, আলু ও পাম তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সিদ্ধান্তও নিয়েছে রাজ্য সরকার।
নিহতদের মধ্যে বিশাখাপত্তনম জেলার ওল্ড গোশালা এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে বিন্দু নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। একই জেলার বালাজিনগরে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে মারা গেছেন কে. মাধবী নামে আরেক নারী। রাজ্যের পশ্চিম গোদাবরী জেলার ভীমাভারমে গাছ পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৬ বছর বয়সী চোক্কা কিশোরের। ওই জেলার বোন্দাদাভারিভীধি এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে মারা গেছেন ৩৪ বছর বয়সী রামবাবু।
কোনাসিমা জেলার সখিনেটিপল্লি মণ্ডলের অন্তরবেদির প্রকাশপুরমে ঝোড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যে একটি ঝুপড়ি ধসে এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আনাকাপল্লি জেলার ইলামানচিলি শহরে বাড়ির পাশে পানিতে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন ৫৫ বছর বয়সী ভাগ্যলক্ষ্মী।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশ-ইয়ানাম উপকূল দিয়ে স্থলভাগে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ২টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে স্থলভাগে আছড়ে পড়ার প্রক্রিয়া। এ সময় অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশার উপকূলীয় এলাকায় প্রবল বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের সৃষ্টি হয়।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বুধবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের বুলেটিন অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপকূল অতিক্রমের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অর্ণব। এর আগে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের পর্যায়ে থাকা অর্ণব দুর্বল হয়ে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। ইয়ানামের দক্ষিণ-পশ্চিমে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রমের সময় ঘূর্ণিঝড়টির একটানা সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। উপকূল অতিক্রমের পর ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র পুরোপুরি স্থলভাগে চলে আসে।
ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের খুঁটিও ভেঙে পড়েছে। ফলে বহু জায়গায় রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয়। এর প্রভাব পড়ে রেল ও বিমান চলাচলেও। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় আগেই একাধিক রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। বাতিল করা হয় বেশ কয়েকটি ফ্লাইটও।
জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) মহাপরিদর্শক নরেন্দ্র সিং বুন্দেলার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। রাজ্যটির ৭১৪টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩০টি বাড়ি ক্ষতির মুখে পড়েছে। দুর্গত এলাকা থেকে প্রায় ৫৭ হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে ত্রাণশিবিরে নেওয়া হয়েছিল।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, পুদুচেরি, তেলঙ্গানা এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় এনডিআরএফের মোট ৩৯টি দল মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় ওড়িশায় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বুধবারও রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। এদিন রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় ঝড়বৃষ্টির প্রভাব দেখা গেছে।
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের বড় ধরনের প্রত্যক্ষ প্রভাব এখনো পড়েনি পশ্চিমবঙ্গে। যদিও উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের জলস্তর বেড়েছে এবং কোথাও কোথাও উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখা গেছে। মঙ্গলবার রাত থেকে রাজ্যের কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিও হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহু ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সরাসরি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে বড় আকারে না পড়লেও বিমান পরিষেবায় এর পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে।
বিবার্তা/এমবি
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]