সরকারের দশ বছর
রাজস্ব : আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদায়
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৮, ১৯:৪৪
রাজস্ব : আকাঙ্ক্ষাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদায়
মৌসুমী ইসলাম
প্রিন্ট অ-অ+

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করতে দরকার অর্থ। আর জনগণের দেয়া করই সরকারি অর্থায়নের প্রধান উৎস। তাই প্রতিবছর যে বাজেট দেয়া হয়, তা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বর্তমান সরকারের টানা দশ বছরে রাজস্ব আদায় বেড়েছে, কিন্তু তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য দেয়া হয়, আদায় করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তা কাঁটছাট হয়। তাই বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয় সরকার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৭৯,৪৬১ কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্য দিয়ে শুরু হয় পথ চলা, আর চলতি অর্থবছরের লক্ষ্য তিন লাখ ৩৯,২৮০ কোটি টাকা।


তবে, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায় করে বাংলাদেশ। যা নেপালের চাইতেও আমাদের রাজস্ব আয়ের জাতীয় উৎপাদনের আনুপাতিক হার হিসেবে কম। যেখানে নেপালের মাথাপিছু আয় আমাদের দেশের চাইতে কম, যা প্রায় চারভাগের তিন ভাগ, সেখানে রাজস্ব আদায়ের এ নিম্ন হার একটা বড় ব্যর্থতা।


২০০৯-১০ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। তবে, প্রকৃত বাস্তবায়ন হয় ৭৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে সে বছর প্রবৃদ্ধি হয় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।


পরের অর্থবছর ২০১০-১২তে রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয় ৯২ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে তা বাড়িয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ হয় ৯৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। তবে, প্রকৃত আদায় হয় ৯২ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। ওই বছর আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ভালো হয়, যার হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।


২০১১-১২ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ভালো হয়। ওই বছরে প্রবৃদ্ধি হার ছিল ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরে অর্থবছর শুরু হয়, প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে লক্ষ্য কমিয়ে এসে করা হয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যের চেয়ে কিছুটা আদায় কম হয়।


পরের অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেক কমে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। ওইবার রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০ কোটি টাকা, কিন্তু প্রকৃত আদায় হয় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।


এর পরের বছরের চিত্র আরো শোচনীয়। সেবার অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে এসে সংশোধিত লক্ষ্য ধরা হয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়ন হয় ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হয় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।


সরকারের দুই মেয়াদের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ২০১৪-১৫ অর্থবছরেই হয় সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। ওই বছর আদায় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য ধরে যাত্রা শুরু হলেও প্রকৃত আদায় করা সম্ভব হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। যদিও অর্থবছরের মাঝপথে লক্ষ্য কাটঁছাট করে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা নির্ধারণ হলেও তা আদায় করতে পারেনি এনবিআর।


তবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ছিল। কারণ, ওই বছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার লক্ষ্য ধরে বাজেট দেয়া হলেও প্রকৃত আদায় হয় ১ লাখ ৭২ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্য দেয়া হয় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু তা আদায় করা যায়নি। এক্ষেত্রে লক্ষ্য এবং আদায়ের ব্যবধান হয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।


পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় আবার কিছুটা হোঁচট খায়, প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কমে হয় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হলেও পরে সংশোধিত লক্ষ্য কমিয়ে এনে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত আদায় হয় ২ লাখ ১ হাজার ২৩১ কোটি টাকা।


গেল অর্থবছরে মোট রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। তবে, মাঝপথে কাঁটছাট কর তা নির্ধারণ হয় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। ছেঁটে ফেলা হয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য লক্ষ্য ধরা হয়, দুই লাখ ৫ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। তবে, এসময় এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে এই অর্থবছরের এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয় ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ।


ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আদায় বেড়েছে, কিন্তু আশানুরুপ নয়। ট্যাক্স থেকেই আসে ৮০ শতাংশ রাজস্ব। জিডিপির আনুপাতিক হিসেবে ৯-১০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও সেটা লক্ষ্যের চেয়ে কম।


তিনি বলেন, আমাদের করের জাল প্রসার করতে হবে, ব্যাপ্তি বাড়াতে হবে। যারা কর দেবার ক্ষমতা রাখে তাদের করের আওতায় আনতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রে ইসিআর অনেকেই ব্যবহার করছে না। কতো বিক্রি হলো তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ হিসেব নেই।


লক্ষ্য যা নির্ধারণ হয়, তার শতভাগ অর্জন নাও হতে পারে বলে মনে করেন অর্থপ্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, বছরের প্রথমে যে রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণ হয়, তা বাড়িয়েই ধরা হয়। কিন্তু চেষ্টার কমতি থাকে না। রাজস্ব আদায় বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ছে।


তিনি বলেন, আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। তখন রাজস্ব আদায় বাড়বে। তবে, ভ্যাট আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com