নানা সমস্যায় সুন্দরবনের একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্র
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৭, ২১:১০
নানা সমস্যায় সুন্দরবনের একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্র
বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্ব ঐতিহ্যের (ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট) ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি। এই বন রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় ৬ বার তার রূপ বদলায়। দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১ ভাগই এ বনের দখলে। সরকারের পদক্ষেপের অভাবে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের এই বনটি থেকে ইতিমধ্যেই বিলুপ্তি হয়েছে মিঠা পানির কুমির ও ঘড়িয়ালসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী।


এ অবস্থায় কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের দুবলারচরে জেলেদের জালে একটি ‘লবণ পানি প্রজাতি’র কুমির ধরা পড়ার পরই কুমিরের বংশ বৃদ্ধির প্রাথমিক কাজ শুরু করে বন বিভাগ। এরপর ২০০২ সালে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজলে ৮ একর বন নিয়ে ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকারিভাবে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন কেন্দ্রেটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। শুরু হয় লবনাক্ত পানির কুমির প্রজননের কাজ। কুমিরটি ৩ বছর পর ২০০৫ সালে বাচ্চা দেয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই কেন্দ্রের ৭৫টি কুমিরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ইতোমধ্যে ৭২টি বড় কুমিরের বাচ্চা সুন্দুরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরো ৫টি কুমির চট্টগ্রামের ডুলহাজরা সাফারি পার্কে ও ৩টি ভোলায় পাঠানো হয়।


করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে বর্তমানে রোমিও নামে ১টি পুরুষ, জুলিয়েট ও পিলপিল নামের ২টি মা কুমির ও ২০৬টি বাচ্চা রয়েছে। রোমিও-জুলিয়েটের বয়স এখন ২৫ বছর। লবণাক্ত পানির এই কুমির ৮০ থেকে ১০০ বছর বেঁচে থাকে। এই প্রজনন কেন্দ্রে জন্ম নেয়া কুমির সুন্দরবনে কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।


বাগেরহাটের মোংলা থেকে ট্রলার বা নৌকায় করে যাওয়ার সবচেয়ে কাছের এবং আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্র। পশুর নদী দিয়ে নৌকা বা ট্রলারে করমজল যেতে যেতে দেখা যায় সুন্দরবনের অপরূপ দৃশ্য। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যাবে সুন্দরবনের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে। কুমিরকে একেবারে কাছ থেকে দেখতে প্রতিদিন এখানে শত-শত দেশি-বিদেশি পর্যটকের অগমন ঘটে। করমজলে দেশি পর্যটকের জন্য প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা, বিদেশি পর্যটদের জন্য ৩০০ টাকা। অপ্রাপ্ত বয়স্ক (১২ বছরের নিচে) ১০ টাকা। দেশি গবেষক ৪০ টাকা, বিদেশি গবেষকদের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা। দেশি পর্যটকের ভিডিও ক্যামেরা ব্যবহারে ক্যামেরা প্রতি ২০০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৩০০ টাকা নেয়া হয়। সব মূল্যের সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাটও প্রযোজ্য।


এই কেন্দ্রের দুটি মা কুমির জুলিয়েট ও পিলপিল মে থেকে জুন মাসের মধ্যে পুকুর পাড়ে উঠে মাটিতে গর্ত করে ডিম দিয়ে থাকে। এসব ডিম কেন্দ্রের কর্মীরা তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ইনকিউবিটরে রেখে বাচ্চা ফুটিয়ে থাকে। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে দুই রাতে এই প্রজনন কেন্দ্রটির শেডের নেট ভেঙ্গে একটি চিতা বিড়াল ৬২টি কুমিরের বাচ্চা খেয়ে ফেলে। পরে ওই চিতা বিড়ালটিকে গুলি করে মেরে ফেলে বনরক্ষীরা। এই ঘটনায় করমজল বন্যপ্রাণি প্রজনন কেন্দ্রে বনকর্মী (লস্কার) মাহাবুব হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত ও জাকির হোসেন নামে এক অস্থায়ী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তবে এবছর এই কেন্দ্র দুটি মা কুমির জুলিয়েট ও পিলপিল ৯১টি ডিম পাড়লেও তা থেকে একটিও বাচ্চা ফোটেনি।


সুন্দরবনের নদ-নদী ও খালে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা লবণাক্ত পানির কুমিরও সাধারণত মে থেকে জুন মাসের মধ্যে ডিম দিয়ে থাকে। আগস্ট-সেপ্টম্বরে সুন্দরবনে পানি বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ ডিম নস্ট হয়ে যায় বিধায় তা থেকে আর বাচ্চা ফোটে না। এছাড়া প্রকৃতিগতভাবেই বড় কুমির ছোট কুমিরকে খেয়ে ফেলে। পুরুষ কুমির মা কুমিরের ডিম খেয়ে ফেলার স্বভাবগত আচরণ কুমিরের সংখ্যা কমে যাবার অন্যতম কারণ। তাছাড়া চোরা শিকারি ও মাছ ধরার সময় অনেক জেলেদের জালে কুমির আটকা পড়ে। কুমির মাছ খায় তাই জেলেদের কাছে কুমির শত্রু হিসেবে পরিচিত হওয়ায় জালে কুমির আটকা পড়লে পিটিয়ে মেরে ফেলে তারা।


এই কেন্দ্রটির প্রতিটি প্রাণিকুলের জন্য ২৪ ঘণ্টার জন্য সরকারি খাদ্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৬ টাকারও কম। এই অপর্যাপ্ত খাদ্য বরাদ্দের পাশাপাশি নেই পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা। এমনকি কুমিরগুলো দেখভালের জন্য লোকবলেরও সংকট রয়েছে। পাশাপাশি নেই কোনো প্রশিক্ষিত কুমির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এমনই অবস্থায় খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলছে সরকারিভাবে দেশের একমাত্র হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি। এরপরও করমজল প্রজনন কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এসব প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে।


বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এই সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। যার জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৩ বর্গ কিলোমিটার। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, চোরা শিকারি ও লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে কুমিরসহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী।



সুন্দরবনে কত কুমির আছে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বন বিভাগের কাছে। কয়েক বছর আগেও সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও নদীর তীরে কুমিরের বিচরণ চোখে পড়লেও বর্তমানে সুন্দরবনে ঘুরতে গিয়ে কুমিরের দেখা মেলা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় গোটা সুন্দরবনে কুমিরসহ বন্যপ্রাণীর সংখ্যা জানাতে ইউএসএআইডির অর্থায়ানে গত বছরের শেষার্থে শুরু হয়েছে শুমারীর কাজ।


সুন্দরনের করমজল কুমির প্রজনন কেন্দ্রে গিয়ে কেন্দ্রেটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবিরের কাছ থেকে জানা গেছে এসব তথ্য। এই বন কর্মকর্তা আরো জানান, গবেষণা হচ্ছে বিশ্বের ২৬ প্রজাতির কুমির নিয়ে। এক সময় আমাদের দেশে ৩ প্রজাতির কুমির ছিল। যার মধ্যে মার্শ ক্রোকোডাইল, ঘড়িয়াল কুমির যা পদ্মা নদীতে দেখা যেত। আর লবণাক্ত পানির কুমির। উপরোক্ত দুটি প্রজাতির কুমির ইতোমধ্যেই বিলুপ্তির পথে। তিনি আরো জানান, এই কেন্দ্রে লবণাক্ত পানির পাশাপাশি মিঠা পানির কুমিরের প্রজননের জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। আবকাঠামোসহ রয়েছে বিশাল-বিশাল মিঠা পানির ২টি পুকুর। এক জোড়া মিঠা পানির কুমির সংগ্রহ করা গেলে আবারো বিলুপ্ত মিঠা পানির কুমিরে বংশ বৃদ্ধি করে এই প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।


বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান জানান, সুন্দরবনের লবণাক্ত পানির কুমির বিলুপ্তের হাত থেকে রক্ষা ও বংশ বিস্তারে সুন্দরবন বিভাগের তত্ত্বাবাধানে করমজল প্রজনন কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে এই কেন্দ্রে প্রাণীদের খাদ্য বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। তাছাড়া সরকারিভাবে প্রশিক্ষিত কুমির বিশেষজ্ঞ ও বন্যপ্রাণি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। নেই পর্যাপ্ত ওষুধ ও খাবারের সরকারি বরাদ্দও। লোকবলসহ এসব সংকট দূর হলে কুমির রক্ষায় এই কেন্দ্রটি আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।


বিবার্তা/ইমরুল/সোহাগ/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com