‘শিক্ষকদের গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোয় অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক’
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৮:৪৮
‘শিক্ষকদের গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোয় অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক’
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। আমার মতে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠেছে ‍উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এগুলোকে আমরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে পারিনি। বলা হয়ে থাকে, শিক্ষা গবেষণায় তহবিল দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমরা তহবিল দিয়েছি কিসে? একজন শিক্ষক দেশের বাইরে পিএইচডি করতে যাবেন, মাস্টার্স করতে যাবেন, কোনো বিষয়ে গবেষণা করতে যাবেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের সে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় না।যেটা পরিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেয়া কথা। তাদের পাওয়ার কথা। একথা ঠিক যে, প্রধানমন্ত্রী গবেষণার জন্য তহবিল দিয়েছেন। কিন্তু সেই তহবিলের ব্যবহার কারা করছে? বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়া সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।’


সম্প্রতি জনপ্রিয় নিউজ পোর্টাল বিবার্তা২৪ডটনেটের সাথে একান্ত আলাপকালে এসব কথা বলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান। আলাপে উঠে এসেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সঙ্কটের বিভিন্ন দিক। দীর্ঘ আলাপের বিষয়গুলো বিবার্তার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবার্তা প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাসেল।


বিবার্তা : প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কম হয়ে থাকে। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?


অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান: বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না এ কথাটার সাথে আমি একমত নই। আমি যদি বলি, যারা গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন করে তারা কি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত গবেষণা পড়ছে কিংবা দেখেছে? আমাদের শিক্ষকরা যেসব আর্টিকেল দেশ ও বিদেশের জার্নালে লিখছে তারা সেগুলোর কয়টি পাঠ করেছে? যারা এসব নিয়ে প্রশ্ন করে তারা কি আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশ ও বিদেশে প্রকাশিত যেসব থিসিস, জার্নাল আছে সেগুলো কি আদৌ পড়েছে কিনা? যদি না পড়ে থাকে তাহলে তাদের গবেষণা নিয়ে কথা বলার কোন যৌক্তিকতা আছে কিনা সেটা ভাববার বিষয়! আবার দেখা যায় গবেষণার মধ্যে চুরি, জালিয়াতি হলে আমরা নিউজের মাধ্যমে সেগুলো দেখছি কিন্তু যেগুলো আসল গবেষণা সেগুলো তো এভাবে প্রকাশতি হয় না। এগুলোর কথা জানানো পত্রিকা, সাংবাদিকের কাজ না। গবেষকরা তাদের গবেষণা করবে। এটাই তাদের কাজ। প্রচার হলো কি হলো না সেটা তাদের কাজ নয়।


এভাবে বলা ঠিক না, তারপরেও বলতে হচ্ছে শুধু গবেষণা না, নানা প্রকল্পে নানাভাবে সরকারি আমলা কতবার বিদেশ সফর করে রাষ্ট্রীয় টাকায়। আর একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আদৌ সরকারি টাকায় বিদেশ সফর করে কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। একজন সরকারি কর্মকর্তা তার যোগদান থেকে শুরু করে রিটার্য়ার হওয়ার আগে প্রকল্প পরিদর্শন থেকে শুরু করে হাঁস চাষ, মাছ চাষ, গরু চাষসহ নানাভাবে মোট কতবার বিদেশ যায়? আর একজন গবেষক বা একজন লেখক বা একজন অধ্যাপক কতবার রাষ্ট্রীয় টাকায় ভালো গবেষণার সুযোগ পেয়ে দেশে গবেষণা করে বা বিদেশ যায়?


আমার জানা মতে, আমাদের অনেক প্রবীণ, তরুণ শিক্ষকদের অনেক ভালো ভালো জার্নালে আর্টিকেল আছে। তাহলে কি সেগুলোকে গবেষণা বলবো না? আমাদের যারা বাহিরে পিএইচডি করতে যায় তাদের প্রত্যেকের কমবেশি গবেষণা আছে।


আমি মনে করি, গবেষণাকে কাজে লাগানোর জন্য পলিসিতে নেয়া হচ্ছে কিনা? সেটা ভাববার বিষয়। বহু বিষয়ে বহু সাজেশন আছে। এই বিষয়ে এই এই করেন। এখন যারা পলিসি মেকার তারা এগুলো করেও। কিন্তু প্রজেক্টগুলো যখন করা হয় সে প্রজেক্টগুলো বাস্তবায়নের বেলায় গবেষণার সহায়তা নিতে হবে।


বিবার্তা : গবেষণার প্রভাব নিয়ে সমালোচকদের উদ্দেশে কী বলবেন?


অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান: সমালোচকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, দেশে যখন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয় কিংবা লুটপাট করা হয় তখন সেটা নিয়ে তো আপনারা ভাবছেন না। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে না সেটা কি গবেষণার কারণে হচ্ছে না, নাকি দুর্নীতির কারণে হচ্ছে না? প্রবলেমটা কোথায়? প্রবলেমটা কি গবেষণা প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে? না, সেখানে নয়। বরং যদি এদেশের উন্নয়ন যদি কিছুটা হলেও হয়, সেটাতে কৃষিতে বলেন, শিল্পে বলেন, মৎস্যে বলেন, গার্মেন্টেসে বলেন অর্থাৎ যে যে উন্নয়ন হচ্ছে তা গবেষণার কারণেই হচ্ছে।


কৃষিতে আজ যা হয়েছে গবেষণার কারণে হয়েছে, শিল্পে যা হয়েছে গবেষণার কারণে হয়েছে। উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা গবেষণা না। যতটুকু গবেষণা আছে, সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। গবেষণা যতটুকু হচ্ছে তা দিয়ে তো কনট্রিবিউট হচ্ছে। তাহলে ফার্মাসিউটিক্যাল চলছে কিভাবে? যদি আমাদের ইউনিভার্সিটির ফার্মেসিক্যাল ডিপার্টমেন্টগুলো গবেষণা না করে তাহলে আপনি প্রডাক্ট কোথায় পাচ্ছেন? সব প্রডাক্টের হাই অফিসিয়াল কি বিদেশি? নাকি আমাদের দেশের বিভিন্ন দফতরের তৈরি। এটা করছে কারা? নিশ্চয়, গবেষকরা। তাহলে আমরা যে গবেষণা নিয়ে বলি কিসের ভিত্তিতে বলি?


বিবার্তা : দেশে যতটুকু গবেষণা হচ্ছে সেটা কী যথেষ্ট?


অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তারপরেও যেটা গবেষণা হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। আর হ্যাঁ, এখনকার সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গবেষণার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী। সে কারণে তিনি কতগুলো তহবিল ইতোমধ্যে দিয়েছেন এবং তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে নামে একটি বৃত্তি প্রকল্প অনেক আগে চালু করেছেন। আর সে প্রকল্পের অর্থ অনেকাংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেয়েছে। পাশাপাশি ইদানিং অনেকক্ষেত্রে সরকারি আমলারা পাচ্ছে। আমি তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক না। তারপরেও আমি মনে করি, এক্ষেত্রে প্রায়োরিটি যদি পায় সেক্ষেত্রে শিক্ষক ও গবেষকদের পাওয়া উচিত।


বিবার্তা : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্কটের বিষয়ে জানতে চাই।


অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান: দুর্ভাগ্যবশত যে আইনটি প্রণিত হয়েছে অর্থাৎ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তহবিল আছে সেখান থেকে আমরা সরকারি তহবিলে ৭০০ কোটি টাকা জমা দিয়েছি। এখন অর্থ মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে এক হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে যেহেতু এটা সরকারি আইন সে কারণে আইনকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে ৭০০ কোটি টাকা দিয়েছি। আমার একটা আবেদন থাকবে সরকার সবকিছুতে অর্থায়ন করে, শিক্ষকদের বেতন দেয়। সরকারকেও ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে টাকা নেয়া কোভিডের এই কঠিন সময়ে আমাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা স্বীকার করছি যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। আমি মনে করি, এই আইনকে পুনর্বিবেচনা করা অথবা টাকা আর না নেয়ায়টায় শ্রেয় হবে।


বিবার্তা : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে চাই।


অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে সরকারের আন্তরিকতার কমতি নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতা আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কলেজ এডুকেশন ডেভেলফমেন্ট প্রজেক্ট আছে। এডিপি নামে আমরা যে প্রজেক্ট করছি যেখানে আমাদের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে, মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং দিচ্ছে। সে কাজগুলোতে একটা প্রজেক্টে আমাদের এক হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। আমরা বাইডিজি দিচ্ছি, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ চলছে। আর এসবের একটা প্রজক্টে এক হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে। আমি উদাহরণটা এ কারণে দিলাম এরকম একটা প্রজেক্টে আমাদের যদি এক হাজার কোটি টাকা লাগছে, সেহেতু আমরা যদি লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসসহ আরো দুই-একটা প্রজেক্ট চালু করতে চায় তাহলে সেখানে তো আমাদের অনেক খরচ হবে।


এসব বিষয় জানা সত্ত্বেও আমাদের পলিসি মেকাররা কেন জানি মনে করছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যা আছে তা যেন অলস অবস্থায় পড়ে আছে। আসলে কি তাই? বরং আমি মনে করি, সরকারকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ জানানো উচিত। এটা এজন্য যে, অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানে অর্থ অপচয় হলেও আমরা অর্থ অপচয় না করে স্থায়ী আমানতে রাখতে পেরেছি। এটা একটা বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগের মধ্যে দিয়ে যতটুকু মুনাফা হয় সেটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে লাগছে।


আমার মনে হয় সরকারের এ ব্যাপারে ভাববার আবকাশ রয়েছে। সরকার নিশ্চয় আমাদের সাহায্য করবে। আমরা ইতোমধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ৭০০ কোটি টাকা জমাও দিয়েছি। এখন সরকারকে এ ব্যাপারে ভাবা উচিত। যাতে এই টাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেয়ার যে বিধান আছে সেটি রোধ করা অথবা নতুন ডিরেকশনে ব্যাপারটি যেন পুনর্বিবেচনা করা।


বিবার্তা/রাসেল/গমেজ/শাহিন/এমও

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com