ঠাণ্ডায় বড় ধরনের রোগও আক্রমণ করতে পারে আপনাকে
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:৫৫
ঠাণ্ডায় বড় ধরনের রোগও আক্রমণ করতে পারে আপনাকে
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

কয়দিন থেকে হঠাৎ করেই শীত বেড়েছে। আর হঠাৎই বেড়ে গেছে শরীরে নানান রকম ব্যাথা। কয়েকটি কারণে এই ব্যথা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। শীতে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বায়ুর চাপে পরিবর্তন, ফুলের রেণু, বাতাসের শুষ্কতা ইত্যাদি মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে কখনো কখনো। প্যারাসিটামল, পেইনকিলার খেয়েও ব্যথা কমছে না। এই ব্যথায় না হচ্ছে ভালো ঘুম, না হচ্ছে কোনো কাজ। শেষে না পেরে চিকিৎসকের কাছে যেতেই হয় অনেককে।


এই আবহাওয়ায় শুধু মাথাব্যথা নয়, অন্য আরও অনেক রোগ হতে পারে। আমরা কেবল জানি ঠাণ্ডা থেকে সর্দি, কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু অনেক বড় ধরনের রোগও হঠাৎ করে আক্রমণ করতে পারে আপনাকে।


শুরুতেই বলি মাইগ্রেন প্রসঙ্গে। এই সমস্যাটি অনেকেরই আছে। বলা হয়ে থাকে শুধুমাত্র যার আছে সেই বোঝে। মাইগ্রেন এক বিশেষ ধরনের মাথাব্যথা। মাথার যে কোনো এক পাশ থেকে শুরু হয়ে তা মারাত্মক কষ্টকর হয়ে ওঠে। তাই একে ‘আধ-কপালি’ ব্যথাও বলা হয়ে থাকে। মাইগ্রেনের যন্ত্রণা অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং দীর্ঘস্থায়ী।


ব্রংকাইটিস


কাশি দীর্ঘমেয়াদি হলে আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, ফলে ধীরে ধীরে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। কাশি যত বেশিদিন থাকে, ফুসফুসও ততবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটাই ব্রংকাইটিস। সাধারণত মধ্যবয়স থেকে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। ঠাণ্ডা লাগার পরে তা যদি বসে যায়, সেটা থেকে ব্রংকাইটিসের সমস্যা মাথাচাড়া দেয়।


ব্রেন স্ট্রোক


ব্রেন স্ট্রোক এখনকার দিনে অন্যতম ভয়াবহ রোগ। কার কখন কীভাবে মাথায় মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়, আগে থেকে তা বলা যায়না। হঠাৎ করে ঠাণ্ডা পড়লে বা মাথায় ঠাণ্ডা লাগা থেকে ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা থাকে। ঠাণ্ডায় শরীর এবং মাথার রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ থেকে ব্রেন স্ট্রোকের একটা ভয় থাকেই। তাই শীতের দিনে সাবধান থাকুন, ঠাণ্ডা এড়িয়ে চলুন।


নিউমোনিয়া


ঠাণ্ডায় নিউমোনিয়া একটি প্রচলিত রোগ। শিশু এবং বৃদ্ধরা এই রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। শীতের শুরুতে অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে এই রোগ বেশি দেখায যায়। তাই আপনার বাড়ির শিশু আর বৃদ্ধদের একটু বেশি সাবধানে রাখবেন অবশ্যই।


মেনে চলুন কিছু বিষয়-


১. আশেপাশের ঠাণ্ডায় আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকুন। কাশি কিংবা সর্দি থেকে জীবাণুগুলো বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আর বারবার আপনার হাত দুটো ধুতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠাণ্ডা ছড়ায় পরোক্ষ শারীরিক সংস্পর্শে। অর্থাৎ একজন অসুস্থ ব্যক্তির ঠাণ্ডার জীবাণু নাক ও মুখ থেকে হাতে স্থানান্তরিত হয়।


২. বেশি করে তরল পান করুন। এতে করে আপনার শরীর থেকে জীবাণু চলে যাবে। আবার জীবাণুর কারণে যদি শরীরে পানিস্বল্পতা হয়, সেই সমস্যাও কমে যাবে। এ সময় দিনে কমপক্ষে আট গ্লাস পানি, ফলের রস কিংবা অন্যান্য ক্যাফিনমুক্ত তরল খাওয়া উচিত।


৩. বিছানা ছেড়ে ব্যায়াম করুন। এই ঠাণ্ডার মৌসুমে সপ্তাহে অন্তত তিনবার মুক্ত বাতাসে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হালকা ব্যায়াম করুন। যেমন- হাঁটাহাঁটি, সাইকেল চালানো বা বিভিন্ন ছোটখাট ব্যায়াম শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে।


৪. রান্নাঘরের সামগ্রী জীবাণুমুক্ত রাখুন। রান্নাঘরের বড় শত্রু হলো স্পঞ্জ ও ডিশব্যাগ। এগুলো উষ্ণ ও ভেজা থাকে বলে এখানে ঠাণ্ডার জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করে। এই জীবাণুকে দূর করার ভালো উপায় হলো সপ্তাহে দু’তিনবার ডিশওয়াশার দিয়ে এগুলো পরিষ্কার করুন।


৫. ভিটামিন ই ও সি দুটোই দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। এজন্য এসময়ের তাজা শাকসবজি আর ফলমূল বেশি করে খাবেন। আর বেশি ঠাণ্ডা বলে বাড়ির বাইরে যাবেন না, তা নয়। বারান্দা, ছাদে যান। হাঁটাহাঁটি করুন, গায়ে রোদ লাগান বেশি করে।


৬. অ্যালকোহল পরিহার করুন একেবারে। ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই ভাবেন অ্যালকোহল বোধহয় শরীর গরম করবে। কিন্তু মোটেই তা নয়। যাদের উচ্চরক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, ডায়বেটিসের সমস্যা আছে, তাদের তো কোনোভাবেই এসময় অ্যালকোহলের নাম নেওয়া উচিৎ নয়।


৭. প্রতি রাতে ভালো করে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। আমাদের অনেকেরই ঘুম নিয়ে সমস্যা রয়েছে। রাতে ভালোভাবে ঘুমালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ কোষগুলোর ক্ষমতা বাড়ে। এতে করে শরীরের জীবাণুগুলো নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। আবার মস্তিস্ক সচল থাকবে, স্ট্রোক বা মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা যাবে না।


৮. গলাব্যথা হলে আরামদায়ক ব্যবস্থা নিন। কারণ এই গলাব্যথা থেকে মামস, টনসিল সৃষ্টি হতে পারে। তাই ঠাণ্ডা পানীয় থেকে দূরে থাকুন। লবণ-গরম পানি দিয়ে গড়গড়া দিতে পারেন। আদা চা ও মধু ভালো কাজ করে। তুলসির রসও সববয়সীদের জন্য উপকারী।


এবার আসি মাইগ্রেন সমস্যায় যা অনেকেরই ঠাণ্ডায় বেড়ে ওঠে। তবে আপনার অজান্তেই কিছু অভ্যাস বাড়িয়ে দিচ্ছে মাইগ্রেনের সমস্যা। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরমের সমস্যা থেকেও মাইগ্রেন হতে পারে। মাথায় ঠাণ্ডা বসলে বা খোলা কান দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ঢুকলে মাথায় তীব্র ব্যথা হয়। এই ব্যথা দীর্ঘদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। তাই মাথায় কখনো ঠাণ্ডা লাগতে দেবেন না। মাফলার, টুপি বা হালকা চাদর পরে নেবেন।


যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তীব্র মাথা যন্ত্রণার পাশাপাশি তাদের বমি বমি ভাব, শরীরে এবং মুখে অস্বস্তিভাব দেখা দিতে পারে। এই ব্যথা টানা বেশ কয়েকদিন থাকে। তাই যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা রয়েছে, তাদের এই ব্যথার জন্য দায়ী কিছু কাজ বা অভ্যাস এড়িয়ে চলাই ভাল। এতে মাইগ্রেনের সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব হতে পারে।


১. পেট খালি রাখা
পেট খালি থাকলে মাইগ্রেনের ব্যথা বা সমস্যা শুরু হতে পারে। এর কারণ হচ্ছে, খালি পেটে থাকলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয় যা মাইগ্রেনের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


২. আবহাওয়া
অতিরিক্ত রোদে ঘোরাঘুরির কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হতে পারে। এ ছাড়াও অতিরিক্ত গরম, অতিরিক্ত আর্দ্রতার তারতম্যে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়ে থাকে।


৩. মানসিক চাপ
যারা অনেক বেশি চাপ নিয়ে একটানা কাজ করে চলেন এবং নিজের ঘুম ও খাওয়া-দাওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে পারেন না, তাদের বেশি মাইগ্রেনে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তাই মানসিক চাপ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। খুব মানসিক চাপে থাকলে এক কাপ লেবু চা খেয়ে নিন। এতে মস্তিষ্ক কিছুটা রিলাক্স হবে।


৪. অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার খাওয়া
আমরা যখন অনেক বেশি মিষ্টি খাবার খেয়ে ফেলি তখন আমাদের রক্তের সুগারের মাত্রা বেড়ে যায় যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত ইনসুলিনের উৎপাদন হতে থাকে। যার ফলে রক্তের সুগারের মাত্রা নেমে যায়। এভাবে হঠাৎ হঠাৎ রক্তে সুগারের মাত্রার তারতম্য হওয়ার কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হতে পারে।


৫. অতিরিক্ত আওয়াজ
অতিরিক্ত আওয়াজ, খুব জোরে গান শোনা ইত্যাদির কারণেও মাইগ্রেনের সমস্যা শুরু হয়ে যেতে পারে। প্রচণ্ড জোরে আওয়াজের কারণে প্রায় দু’দিন টানা মাইগ্রেনের ব্যথা হওয়ার আশংকা থাকে।


৬. অতিরিক্ত ঘুমানো
মাত্র এক দিনের ঘুমের অনিয়মের কারণে শরীরের উপরে খারাপ প্রভাব পড়তে পাড়ে। যেমন, যারা নিয়মিত মোটামুটি ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা করে ঘুমোন, তারা যদি হুট করে একদিন একটু বেশি ঘুমিয়ে ফেলেন, সেক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়ে যায়।


৭. হঠাৎ করে কফি খাওয়া বন্ধ করে দেয়া
সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যারা নিয়মিত ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় খেতে অভ্যস্ত, তারা হঠাৎ করে সেই অভ্যাস ত্যাগ করলে বা বন্ধ করে দিলে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হতে পারে।


এই শীতে নিজেকে সুস্থ-সুন্দর রাখারদায়িত্বটা আপনারই। যেকোনো রোগ থেকে নিজেকে বাঁচাতে আপনার নিজের ভূমিকাই যথেষ্ট।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com