ডায়াবেটিস কেন হয়, ঝুঁকি, উপসর্গ ও প্রতিরোধ
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৫২
ডায়াবেটিস কেন হয়,  ঝুঁকি, উপসর্গ ও প্রতিরোধ
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সারা বিশ্বে বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ কোটিরও বেশি। ৩০ বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা এখন চারগুণ বেশি। এছাড়া ডায়াবেটিসে প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।


শরীর যখন রক্তের সব চিনিকে (গ্লুকোজ) ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তখনই ডায়াবেটিস হয়। এই জটিলতার কারণে মানুষের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, অন্ধ হয়ে যাওয়া, কিডনি নষ্ট হতে পারে কিডনি এবং অনেক সময় শরীরের নিম্নাঙ্গ কেটেও ফেলতে হতে পারে। সারা বিশ্বেই এই সমস্যা বেড়ে চলেছে।


চিকিৎকরা বলেছেন, ডায়াবেটিসের এতো ঝুঁকি থাকার পরেও যতো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত তাদের অর্ধেকেরও বেশি এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন নয়।


ডায়াবেটিস কেন হয়?


আমরা যখন কোনো খাবার খাই তখন আমাদের শরীর সেই খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে চিনিতে রুপান্তরিত করে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের যে হরমোন নিসৃত হয়, সেটা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় চিনিকে গ্রহণ করার জন্যে। এই চিনি কাজ করে শরীরের জ্বালানি বা শক্তি হিসেবে।


শরীরে যখন ইনসুলিন তৈরি হতে না পারে অথবা এটা ঠিকমতো কাজ না করে তখনই ডায়াবেটিস হয় এবং এর ফলে রক্তের মধ্যে চিনি জমা হতে শুরু করে।


ডায়াবেটিস বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে।


টাইপ ওয়ান ডায়বেটিসে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তখন রক্তের প্রবাহে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা এখনো বের করতে পারেননি কী কারণে এরকমটা হয়। তবে তারা বিশ্বাস করেন যে এর পেছনে জিনগত কারণ থাকতে পারে। অথবা অগ্ন্যাশয়ে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো নষ্ট হয়ে গেলেও এমন হতে পারে।


যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ১০ শতাংশ এই টাইপ ওয়ানে আক্রান্ত।


অন্যটি টাইপ টু ডায়াবেটিস। এই ধরনের ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত তাদের অগ্ন্যাশয়ে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না অথবা এই হরমোনটি ঠিক মতো কাজ করে না।


সাধারণত মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ ব্যক্তিরা টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও যাদের ওজন বেশি এবং যাদেরকে বেশিরভাগ সময় বসে বসে কাজ করতে হয় তাদেরও এই ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


বিশেষ কিছু এলাকার লোকেরাও এই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। সন্তানসম্ভবা হলেও অনেক নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে। তাদের দেহ থেকে যখন নিজের এবং সন্তানের জন্যে প্রয়োজনীয় ইনসুলিন যথেষ্ট পরিমানে তৈরি হতে না পারে, তখনই তাদের ডায়াবেটিস হতে পারে।


এক গবেষণায় দেখা গেছে ৬ থেকে ১৬ শতাংশ গর্ভবতী নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে। ডায়েট, শরীর চর্চা অথবা ইনসুলিন নেয়ার মাধ্যমে তাদের শরীরে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা গেলে তাদের টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।


ডায়াবেটিসের উপসর্গ কী


সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে- খুব তৃষ্ণা পাওয়া, স্বাভাবিকের চাইতেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষ করে রাতের বেলায়।


এছাড়া নিয়মিত খাওয়ার পরও ঘন ঘন খিদে, ক্লান্ত বোধ করা, কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, প্রদাহজনিত রোগে বারবার আক্রান্ত হওয়া, হাতে-পায়ে ব্যথা বা মাঝে মাঝে অবশ হয়ে যাওয়া, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া এবং শরীরের কোথাও কেটে গেলে সেটা শুকাতে দেরি হওয়া।


চিকিৎসকরা বলছেন, টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের লক্ষণ শৈশব থেকেই দেখা দিতে পারে এবং বয়স বাড়ার সাথে সেটা আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।


বয়স ৪০ বছরের বেশি হওয়ার পর থেকে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার লোকজনের মধ্যে এই ঝুঁকি তৈরি হয় তাদের ২৫ বছর বয়স হওয়ার পর থেকেই।


যাদের পিতামাতা, ভাইবোনের ডায়াবেটিস আছে, অথবা যাদের অতিরিক্ত ওজন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের মানুষ, আফ্রো-ক্যারিবিয়ান অথবা কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান তাদেরও এই ঝুঁকি বেশি থাকে।


ডায়াবেটিস কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?


আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ডায়াবেটিস এমনই একটি রোগ, যা কখনো সারে না। কিন্তু এই রোগকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শতকরা ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে জীবনাচরণে পরিবর্তন এনেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়।


এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ডায়াবেটিস এখন একটি মহামারি রোগ। এই রোগের অত্যধিক বিস্তারের কারণেই সম্প্রতি এমন ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি।


যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) খাবারের বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে মিষ্টি, লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার কম করে খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। বেছে নিতে হবে চিনিমুক্ত খাবার।


এনএইচএসের পরামর্শগুলো হলো:


১. খেতে হবে তাজা সবজি ও ফল। তবে ফলের জুস খাওয়া যাবে না। ফল চিবিয়ে খেতে হবে। চিবিয়ে খেলে ফলে থাকা কার্বোহাইড্রেট রক্তের সঙ্গে মেশে সহজে। এছাড়া চিবিয়ে খেলে দাঁত ও মুখের পেশিও কাজ করার সুযোগ পায়। এমন প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ফলের যে রস শরীর পায়, সেটি সহজে পরিপাক হয়।


২. কম চর্বিযুক্ত দই খাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে টকদই। শিশুদের জন্য দই খুবই উপকারী। এই দুগ্ধজাত বস্তুতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। হাড় ও দাঁতের জন্য ক্যালসিয়াম খুবই উপকারী।


৩. বেশি ভাজাপোড়া বা বেশি চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। লবণ বুঝে খেতে হবে। যত কম খাওয়া যায়, ততই ভাল।


৪. চিনিযুক্ত পানীয় থেকে দূরে থাকতে হবে। জুস ও স্মুদিতে প্রচুর চিনি ও ক্যালরি থাকে। তাই কতটুকু খাচ্ছেন, তার হিসাব রাখতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত হলেই বিপদ।


৫. একটি বা দুটি সিদ্ধ ডিম খাওয়া যেতেই পারে। একটি বড় ডিমে থাকে প্রায় ৬ গ্রাম আমিষ। ডায়েটে ভিটামিন ডি যোগ করার জন্য ডিম বেছে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


৬. খাবার খেতে হবে ক্যালরি মেপে। কতটুকু খাবারে কতটুকু ক্যালরি ঢুকছে শরীরে, তা মাথায় রাখতে হবে। বুঝেশুনে খেলেই আর বিপদের সম্ভাবনা নেই।


ডায়াবেটিসের কারণে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে?


রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে যদি এই রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন হতে পারে পায়ে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস।


কতো মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত?


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ১৯৮০ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি। ২০১৪ সালে সেটা বেড়ে হয় ৪২ কোটিরও বেশি।


১৯৮০ সালে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম কিন্তু ২০১৪ সালের তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িযেছে ৮.৫ শতাংশ।


ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন বলছে, প্রাপ্ত বয়স্ক যেসব মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের, যেখানে খুব দ্রুত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে।


সংস্থাটি বলছে, ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসের কারণে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।


বৈশ্বিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস। ২০৪০ সালে মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। আর সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। রোগটি এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগের বিষয়।


অসংক্রামক রোগ নিয়ে সরকারের ২০০৬ সালের জরিপে (স্টেপস ২০০৬) বলা হয়েছিল, প্রাপ্তবয়স্কদের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সরকার অতি সম্প্রতি এ বিষয়ে আরো একটি জরিপ (স্টেপস ২০১৮) শেষ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৬ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। এছাড়া আরো কয়েক লাখ শিশু ডায়াবেটিসে (টাইপ-১) আক্রান্ত।


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com