হাড় ক্ষয়ের জন্য বার্ধক্যই একমাত্র কারণ নয়
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ১৬:৫০
হাড় ক্ষয়ের জন্য বার্ধক্যই একমাত্র কারণ নয়
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সাধারণত চল্লিশের পর অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয়রোগ শুরু হয়। এই রোগের নারীদের বেশি ভুগতে দেখা যায়। নারীদের মেনোপজের পর এই সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। হাড় শক্তিশালী বা মজবুত হলে অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করা যায়।


মানুষ বয়স্ক হলে তার হাড়ে সমস্যা বা হাড় ক্ষয় হতে পারে, কিন্তু হাড় ক্ষয়ের জন্য বার্ধক্যই একমাত্র কারণ নয়, অন্যান্য কারণেও হাড় ক্ষয় হতে পারে বা হাড়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে।


হাড়ে সমস্যার ৯টি লক্ষণ উল্লেখ করা হলো, যা প্রকাশ পেলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।


আপনার নখ ভঙ্গুর


ভাঙা নখ বিরক্তির কারণ। যদি আপনি দেখেন যে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় সময়ই আপনার নখ ভেঙে যাচ্ছে, তাহলে তা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বিষয়। অনেক কারণে আপনার নখ ভঙ্গুরপ্রবণ হতে পারে, কিন্তু সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দুইটি কারণ হচ্ছে, কোলাজেন ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি। কোলাজেন হলো একটি প্রোটিন যা আপনার ত্বক, কানেক্টিভ টিস্যু ও স্কেলিটনকে সাপোর্ট করে। আপনি বেরি, পাতাযুক্ত শাকসবজি, সয়া ও সাইট্রাসের মতো খাবার দিয়ে এটিকে সুস্থ রাখতে পারেন। ক্যালসিয়াম হলো এক প্রকার খনিজ, যা হাড়ের স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ- দুগ্ধজাত খাবারের পাশাপাশি আপনি পাতাযুক্ত শাকসবজি ও সার্ডিনেও এটি পেতে পারেন। যদি আপনার এসব স্কেলিটাল সুপারহিরোর অভাব থাকে, তাহলে আপনি ম্যানিকিউরে নেতিবাচক ফলাফল দেখতে পাবেন।


আপনি ব্যায়াম করেন না


যদি আপনি অধিকাংশ সময় কম্পিউটারের সামনে ও সোফায় বসে কাটান, তাহলে আপনার অস্টিওপোরোসিস ডেভেলপ হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। সার্জন জেনারেলের মতে, ব্যায়াম কেবলমাত্র শক্তিশালী পেশীই গঠন করে না, হাড়কেও শক্তিশালী করে। যখন আপনি ব্যায়াম করেন (বিশেষ করে ওজন উত্তোলন করেন এবং জগিং বা সিঁড়ি আরোহনের মতো ওয়েট-বিয়ারিং কার্ডিও করেন), আপনি আপনার স্কেলিটনকে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করেন। আপনার ডেস্ক থেকে ওঠার চেষ্টা করুন এবং প্রতি ঘন্টায় অন্তত একবার অফিসের আশেপাশে হাঁটুন, কাজ শেষে হাঁটুন বা জগিং করুন। ওজন বহন করতে সকালে জিম করার জন্য সময় বের করুন।


আপনার মাড়ি ক্ষয়ে যাচ্ছে


চোয়ালের হাড়ের শক্তি ও হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণে আপনার মাড়ি ক্ষয়ে যায়। আপনার চোয়ালের হাড় হলো আপনার দাঁতের অ্যানকর, তাই এটি যখন দুর্বল হয়ে যাবে, আপনার মাড়ি দাঁত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। মাড়ি ক্ষয়ের একটি বড় লক্ষণ হচ্ছে দাঁত পড়ে যাওয়া। আপনি বয়স্ক হলে আপনার রুটিন ভিজিটের সময় ডেন্টিস্টকে মাড়ির স্বাস্থ্য চেকআপ করতে বলুন। এমনকি যদি আপনার মাড়ির সমস্যা না থাকে, আপনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, যেমন- নিয়মিত ফ্লসিং ও ব্রাশিং করা। আপনি চুয়িং গাম চিবিয়েও আপনার চোয়ালকে শক্তিশালী করতে পারেন।


আপনি খাটো হয়ে যাচ্ছেন


দুর্ভাগ্যজনক যে বয়স্ক হলে উচ্চতা কমে যাওয়া কোনো মিথ নয়। এটি ঘটে যখন আপনার হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং হাড়ের মধ্যকার কার্টিলেজ বছরের পর বছর ধরে অত্যধিক ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে ড্যামেজ হয়। সেন্টার ফর বেটার বোনসের চিকিৎসক সুসান ই. ব্রাউন বলেন, ‘খাটো হয়ে যাওয়া সবসময় নির্দেশ করে না যে আপনার হাড় সমস্যায় আছে, কিন্তু এটি আপনার মেরুদণ্ডের আশেপাশের পেশীর দুর্বলতা ইঙ্গিত করতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, ‘যেহেতু হাড় ও পেশী এক ইউনিটে কাজ করে এবং সাধারণত একই সময়ে শক্তিশালী ও দুর্বল হয়, তাই পেশীর ক্ষতির সঙ্গে হাড় ক্ষয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।’


আপনার আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা কম


যে কারো ক্ষেত্রে আচারের বয়াম খোলা সহজ কাজ নয়, কিন্তু যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে আপনার আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা সচরাচরের চেয়ে কম, তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। পোস্ট-মেনোপজাল নারীদের ওপর সম্পাদিত একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, সার্বিক হাড়ের খনিজের ঘনত্ব নির্ণয়ে হাতে আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা বিষয়ক পরীক্ষা ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট। আপনার আঁকড়ে ধরার ক্ষমতার সঙ্গে আপনার নিতম্ব, মেরুদণ্ড ও অগ্রবাহুর হাড়ের ঘনত্বের একটি সংযোগ রয়েছে। আপনার হাতের হাড়ের দুর্বলতা অন্য অংশেরও দুর্বলতা নির্দেশ করতে পারে। আপনার হাড়কে রক্ষা এবং আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা বৃদ্ধি করার একটি উপায় হচ্ছে, স্ট্রেংথ ট্রেনিং করা।


আপনার ফ্র্যাকচার হয়েছে, যা হওয়ার কথা ছিল না


হাড়ের দুর্বলতা এবং হাড় ক্ষয়ের একটি বড় লক্ষণ হতে পারে ফ্র্যাকচার। যদি ফ্র্যাকচার হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন কোনো সামান্য ঘটনায় আপনার গোড়ালিতে ফ্র্যাকচার হয়, তাহলে আপনার হাড় পরীক্ষা করার সময় হয়েছে- এটি হাড় ক্ষয়ের রোগ অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।


আপনার ক্র্যাম্পিং, পেশী ব্যথা ও হাড় ব্যথা হয়


আমরা জানি যে, বার্ধক্যের সঙ্গে ব্যথাও আসে। কিন্তু এটি আপনি যে বয়স্ক হচ্ছেন শুধু তা নয়, মারাত্মক কিছুও নির্দেশ করতে পারে। ঘনঘন ব্যথা হলো ভিটামিন ডি ঘাটতির একটি সতর্কীকরণ লক্ষণ, যা হাড় ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। যদি আপনার পেশীতে ঘনঘন ক্র্যাম্পিং হয়, এটি ভিটামিন বা খনিজ ঘাটতির একটি লক্ষণ হতে পারে। ফ্লোরিডার পাম বিচের পোডিয়াট্রিস্ট বিষ্ণু শীচারণ বলেন, ‘বিশেষ করে চরণ ও পায়ে পেশী ক্র্যাম্পিং কমন। রাতে পায়ের ক্র্যাম্পিং প্রায়ক্ষেত্রে নির্দেশ করে যে আপনার ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম বা পটাশিয়ামের ঘাটতি আছে। যদি দীর্ঘসময় ধরে এসব ঘাটতি থাকে, তাহলে তা হাড় ক্ষয়ের কারণ হতে পারে।’


আপনার বডি ফ্রেম ছোট


ছোট বডি ফ্রেমের লোকদের অস্টিওপোরোসিস ডেভেলপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কারণ ক্ষয় হওয়ার জন্য তাদের হাড়ের ঘনত্ব কম। যদি আপনি এই ক্যাটাগরিতে পড়েন, তাহলে আপনাকে আপনার স্কেলিটন রক্ষার ব্যাপারে অধিক সতর্ক থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার দিয়ে ডায়েট পূর্ণ করুন। বার্ষিক শারীরিক চেকআপের সময়আপনার হাড় পরীক্ষা করার কথা বিবেচনা করুন।


আপনার ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কম


যখন এই গুরুত্বপূর্ণ হরমোন কমে যেতে শুরু করবে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেনোপজের সময়), তখন আপনার হাড় সাফার করতে পারে। আর্থ্রাইটিস রিসার্চ অ্যান্ড থেরাপিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, একটি সমাধান রয়েছে: কয়েকটি গবেষণার উপাত্ত থেকে পাওয়া যায় যে মেনোপজের পর নারীদের দ্রুত হাড় ক্ষয় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দিয়ে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। যদি আপনার হরমোনের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত না থাকেন, তাহলে কোনো এন্ডোক্রিনোলজিস্ট দ্বারা পরীক্ষা করুন অথবা অন্য কোনো স্পেশালিস্টের কাছে যান, যিনি আপনাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করতে পারবেন। যদি আপনার নিম্ন ইস্ট্রোজেন মাত্রা থাকে, তাহলে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করে, নিয়মিত ব্যায়াম করে এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ সুষম ডায়েট মেনে চলে আপনার হাড়ের ক্ষয় ধীর করতে পারেন।


হাড় ক্ষয় প্রতিরোধ করবে খাবার


১. দই


দই ভিটামিন-ডি’র ভালো উৎস। প্রতিদিন এক কাপ দই শরীরের ক্যালসিয়ামের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে; হাড়কে শক্তিশালী করে। নিয়মিত দই খেলে অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ হয়।


২. দুধ


ক্যালসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস দুধ। নিয়মিত দুধ খেলে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা কমে। দুধ খেলে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের চাহিদার অনেকটাই পূরণ হয়।


৩. কাঠবাদাম


প্রতিদিন আধা কাপ কাঠবাদাম খেলে দৈনিক ক্যালসিয়ামের ১৮ ভাগ পূরণ করে। এটি কেবল হাড় মজবুতই করে না, এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং হার্টকে ভালোও রাখে।


৪. ব্রকলি


ব্রকলির মধ্যে উচ্চ পরিমাণ ভিটামিন-কে ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। এটি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ব্রকলি রাখলে হাড় ক্ষয় প্রতিরোধ করা যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।


৫. কমলার রস


কমলার মধ্যে রয়েছে ভিটামিন-সি। এতে হাড় শক্তিশালী করার উপাদান ক্যালসিয়ামও রয়েছে। এটি হাড়ের গঠনে কাজ করে। দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদার ৬ ভাগ পূরণ করতে পারে একটি কমলা।


চিকিৎসা


চিকিৎসানির্ভর করে হাড়ের পরিমাণ হ্রাস, হাড়ের দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও হাড় ভাঙার ওপর। নিয়মিত নির্দেশিত ব্যায়াম করতে হবে। দৈনিক পরিমিত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ডি, মিনারেলস এবং বিসফোসফোনেট জাতীয় ওষুধ (যেমন—এলেনড্রোনেট, ইটিড্রোনেট ও রাইসড্রোনেট) চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে হবে। ব্যথা নিরাময়ের জন্য এনালজেসিক ওষুধ ও ফিজিক্যাল থেরাপি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। হাড় ভাঙার জন্য কনজারভেটিভ বা সার্জিক্যাল চিকিত্সার প্রয়োজন হয়।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com