বাজেট ও পিতা-পুত্রের গাধা
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৭, ১৬:৫২
বাজেট ও পিতা-পুত্রের গাধা
প্রিন্ট অ-অ+

গল্পের পিতা-পুত্র তাদের গাধাটি হাটে নিয়ে যাচ্ছিল বিক্রির জন্য। অল্প কিছুদূর যেতেই পথচারীদের সমালোচনা কানে এলো তাদের, “দেখো, কেমন বোকার হদ্দ। গাধাটাকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে, নিজেরাও হাঁটছে। গাধার পিঠে একজন উঠলেই তো পারে।”


সমালোচনা শুনে পিতা-পুত্রের বোধোদয় হলো, পিতা চাপলো গাধার পিঠে। কিছুদূর গিয়ে আবার সমালোচনা, “কেমন বেআক্কেল বাপ! ছেলেটাকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে আর নিজে লাট সাহেবের মতো গাধায় চেপে চলেছে।”


সমালোচনা শুনে পিতা নেমে গিয়ে গাধার পিঠে তুলে দিলো পুত্রকে। এবার আরেক দলের সমালোচনা, “বেদ্দপ পোলা কী রকম দেখো! বুড়ো বাপকে হাঁটিয়ে নিজে যাচ্ছে গাধায় চড়ে!”


গল্পটি এখানেই শেষ নয়, কিন্তু আমাদের যা বলার তা এতেই চলে এসেছে। আমরা বলতে চাই, সব মানুষকে একসঙ্গে সন্তুষ্ট করা কারো পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়। যেমন, বাজেট দিয়েও কোনো অর্থমন্ত্রী কোনো বছর সমালোচনার তীর থেকে রেহাই পাননি। অবশ্য সব সমালোচনা যে অযৌক্তিক, তা-ও নয়।


০১ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা করেছেন ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার এই বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম।


বাজেট ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই নানা শ্রেণী-পেশার বিশিষ্টজনেরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংসদের বাজেট আলোচনায় এসব আলোচনা-সমালোচনা বিশ্লেষিত হয়েই নিশ্চয়ই বাজেট পাস হবে।


আমরা দেখেছি, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর এর সমালোচনাই হয় বেশি। সমালোচনা হবেই। হোক। কিন্তু বাজেটের ভালো দিকগুলোও তো আলোচনায় আসা দরকার। নইলে তা তো কেবলই নিন্দা-মন্দে পর্যবসিত হবে। “সম-অসম আলোচনা” অর্থে “সমালোচনা” হবে কীভাবে?


আমরা তাই প্রস্তাবিত বাজেটের ভালো-মন্দ দু’টোই তুলে ধরতে চাই।


প্রস্তাবিত বাজেটে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে, যা বড় বড় ইস্যুর ডামাঢোলে মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়। যেমন, ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, এবারের বাজেট ব্যবসাবান্ধব। ভ্যাটমুক্ত বার্ষিক লেনদেন সীমা ৩০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ টাকা করা এবং লেনদেন বা টার্নওভার করের সীমা ৮০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় কোটি টাকা করায় ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। এ ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ইতিবাচক দিক।


তারা আরো বলেছেন, পোশাকশিল্পের করপোরেট কর ৫ শতাংশ কমিয়ে ১৫ শতাংশ করাটা ইতিবাচক। পরিবেশবান্ধব কারখানার জন্য করপোরেট কর ১৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ।


প্রস্তাবিত বাজেটে রেফ্রিজারেটর ও এয়ারকন্ডিশনারের মতো দেশীয় খাতকে সুরক্ষা দিতে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


বাজেট বরাদ্দে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক বলে মত প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি গবেষকরা।


এ ছাড়াও আছে অনেকগুলো ছোট ছোট বিষয়, যেগুলো চোখে না-পড়লেও উপেক্ষা করার মতো নয়। যেমন, আগামী তিন বছরের মধ্যে বিড়ি তুলে দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া, শিক্ষার্থীদের বাসে কর ছাড় দেয়া, ফাস্ট ফুড নামের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যে বাড়তি করারোপ ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও এসবের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে আমাদের জীবনে।


এবার আসি বাজেটের যেসব বিষয় নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে, তাতে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, “বছরের যে কোনো সময় ব্যাঙ্ক-হিসাবে এক লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা জমা দিলে বা তুললে ৮০০টাকা আবগারি শুল্ক কেটে রাখা হবে।” এর কেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে সে বিষয়ে সংবাদপত্রে ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, বর্তমানে সুদের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫ থেকে ৬ শতাংশ। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মাশুল। এ ছাড়া মুনাফার ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। হিসাব স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর ফলে আমানতকারীরা ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়বেন। বদলে ছুটবেন তাঁরা শেয়ারবাজার বা সমবায় সমিতিগুলোতে। এতে ছায়া অর্থনীতি আরও বাড়বে।


একজন বিশিষ্ট ব্যাঙ্কার বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশে ব্যাংক হিসাব থেকে এত টাকা কেটে রাখা হয় না। অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাব কার্যকর হলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হবেন।’ তিনি আরও বলেন, এত আবগারি শুল্ক কেটে রাখার পরও আবার কাটা হবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উৎসে কর অর্থাৎ দিন শেষে আমানতকারীদের মাথায় হাত।


আমানতকারীদের মাথায় যাতে হাত পড়তে না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে।


আবারও পিতা-পুত্রের গল্পে ফিরে যাই। আমরা ওই গল্পের নির্যাস পেয়েছি যে, সবার সব অনুরোধ একসঙ্গে রাখা যায় না। তা করতে গেলে যে-গাধার পিঠে চড়ার কথা, সেই গাধাকেই নিজেদের কাঁধে তুলতে হয়।


কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, কোনো মতামতই উপেক্ষা করতে হয় না। সবার মতামত বিবেচনায় নিয়ে, যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই গণতন্ত্র ও প্রজ্ঞা।


আমাদের বিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী এবং মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ সংসদে বাজেট আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং প্রজ্ঞার পরিচয় দেবেন বলেই আমরা আশাবাদী।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com